ডাকসুতে জোট বেঁধে ভোটে নামছে সংগঠনগুলো

ডাকসুতে জোট বেঁধে ভোটে নামছে সংগঠনগুলো

0

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম ২ ফেব্রুয়ারি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ ছাত্র সংগঠন জোট বেঁধে মাঠে নামছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণে সমমনাদের নিয়ে সংগঠনগুলো জোট বাঁধবে। সেক্ষেত্রে এবার নির্বাচনের মাঠে একাধিক জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।

ছাত্রলীগ ১৪ দলভুক্ত শরিকদের ছাত্র সংগঠনগুলো নিয়ে জোট করতে পারে। সেক্ষেত্রে এ জোট ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে প্রার্থী দেবে। ছাত্রদলও জোটবদ্ধ নির্বাচনের কথা ভাবছে। ক্রিয়াশীল বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্রঐক্য মিলে জোট বেঁধে প্যানেল দিতে পারে।

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদও থাকবে নির্বাচনে। তারাও জোটবদ্ধ নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এর বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা মিলে একটি প্যানেল করবে।

একমাত্র ইসলামী ছাত্র সংগঠন হিসেবে প্যানেল গঠনে কাজ করছে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন। টিএসসির সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ভাবছে। নির্বাচনের বিষয়ে সরব হয়েছে জাতীয় ছাত্রসমাজ।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সবকিছু চূড়ান্ত করে চলতি মাসের মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে। নির্বাচন পেছানোর কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই বলেও জানান তিনি।

নির্বাচনে প্রার্থিতার যোগ্যতা নির্ধারণ হওয়ার পর বিষয়গুলো নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেছে ছাত্র সংগঠনের নেতারা। সমমনা ছাত্র সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গেও আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে তাদের। সর্বত্র এখন আলোচনা প্রার্থিতা নিয়ে। কারা আসছেন দেশের ‘দ্বিতীয় পার্লামেন্ট’ খ্যাত ডাকসুর নেতৃত্বে, তা নিয়ে কৌতূহল যেন কাটছেই না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, দীর্ঘ ২৮ বছর পর হচ্ছে ডাকসু নির্বাচন। ইতিমধ্যে সারা দেশে এ নির্বাচন আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। ফলে ছাত্র সংগঠনগুলোর পাশাপাশি তাদের মূল সংগঠনগুলোরও নির্বাচনকেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনা রয়েছে।

সবদিক বিবেচনায় রেখেই তাদের প্যানেল নির্ধারণের কাজ করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে শক্ত জোট হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে সমমনা সংগঠনকে কাছে টানার চেষ্টা করছেন তারা। পাশাপাশি ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ক্যাম্পাসে পরিচিত, মেধাবী ও সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে- এমন শিক্ষার্থীদের প্যানেলে রাখার কথা ভাবছেন তারা।

সংগঠনগুলোর বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবারের ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ৫ থেকে ৭টি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ১৪ দলভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের জোট ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে প্রার্থী দেবে। তাদের সঙ্গে রয়েছে- ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র আন্দোলন, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ (বিসিএল) ও ছাত্র সমিতি।

ছাত্রদলও জোটবদ্ধ নির্বাচনের কথা ভাবছে। তবে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এককভাবে নির্বাচন করার সম্ভাবনার বিষয়টিও এড়িয়ে যায়নি তারা।

এছাড়া ক্রিয়াশীল বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও সাম্র্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্রঐক্য মিলে প্যানেল দিতে পারে। প্রগতিশীল ছাত্রজোটে রয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রফ্রন্টসহ ৬টি সংগঠন। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্রঐক্যে রয়েছে পাঁচটি ছাত্র সংগঠন।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস বলেন, আমরা জোটগতভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে আমাদের জোট হবে। এর সঙ্গে কিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও যোগ হতে পারে।

প্যানেলের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কথাবার্তা চলছে। প্যানেল নির্ধারণে একটি বোর্ড গঠিত হবে। তারাই চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী বলেন, আমরা প্যানেলের বিষয়ে হোমওয়ার্ক করছি। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল শাখার নেতাদের নিয়ে বসেছি। সময়ের প্রয়োজনে জোটগতভাবে নির্বাচনে যাওয়ার চিন্তা আমাদের রয়েছে। তবে এককভাবেও নির্বাচনের প্রস্তুতি আমাদের আছে।

প্রগতিশীল ছাত্রজোট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সমন্বয়ক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাবি শাখার সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, আমরা জোটগতভাবে নির্বাচনে যাব। এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। ছাত্রলীগের বাইরে যেসব সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যারা ছাত্রলীগের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়, তাদের এক করার চেষ্টা করছি। কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। এভাবে একটি বৃহৎ ঐক্য গড়ে নির্বাচনে যাওয়ার চিন্তা আমাদের রয়েছে। এছাড়া হলের বাইরে ভোট কেন্দ্র ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে রোববার ভিসিকে স্মারকলিপি দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, আমরা নির্বাচনে অংশ নেব এটা নিশ্চিত। তবে এখন পর্যন্ত এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত আমাদের রয়েছে। পরবর্তীতে পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় জোটগতভাবেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারি।

ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির (ডিইউডিএস) সভাপতি এসএম রাকিব সিরাজী বলেন, ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। প্যানেল দেখে আমরা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানাব। তবে এটা নিশ্চিত- আমাদের অবস্থান হবে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির সঙ্গে।

১১ মার্চের নির্বাচনকে সামনে রেখে পুরোদমে কাজ চলছে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে। মঙ্গলবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সভায় ডাকসু ও হল সংসদের গঠনতন্ত্র এবং নির্বাচনের আরণবিধি চূড়ান্ত হওয়ার পর কাজের গতিতে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। হলগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত যোগ্যতা অনুযায়ী চূড়ান্ত ভোটার তালিকা তৈরিতে দিন-রাত কাজ করছে।

এক্ষেত্রে তাদের খেয়াল রাখতে হচ্ছে- শিক্ষার্থী ভোটার অনার্স, মাস্টার্স এবং এমফিল পর্যায়ে অধ্যয়নরত কিনা, অধ্যয়নরত হলে তার বয়স ত্রিশের মধ্যে আছে কিনা। পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হচ্ছে শিক্ষার্থী সান্ধ্যকালীন, পেশাদারি অথবা বিশেষ মাস্টার্স, ডিপ্লোমা ও বিভিন্ন কোর্সের শিক্ষার্থী কিনা। কারণ এরা প্রার্থী বা ভোটার হতে পারবেন না।

সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৮ বছর পর নির্বাচন হচ্ছে বিধায় তাদের ভোটার তালিকা প্রস্তুতসহ সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। তবে চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে ডাকসুর প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা এসএম মাহফুজুর রহমান বলেন, এর আগে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এখন হলগুলো সেটি আপডেট করার কাজ করছে। এ কাজ শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নোটিশ দেয়া হবে। সেখানে যদি কোনো অসঙ্গতি অথবা আপত্তি থাকে, সেগুলো সংশোধন-সংযোজনের জন্য সময় দেয়া হবে। এরপর তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। দীর্ঘদিন পর ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে বিধায় কাজগুলো একটু জটিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সবকিছু চূড়ান্ত করে চলতি মাসের মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে। নির্বাচন পেছানের কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই বলেও জানান তিনি।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

কোন কমেন্ট নেই

উত্তর দিন