নিরুদ্দেশ ওসি মোয়াজ্জেমের পরিবারের সদস্যরা ‘বিব্রত’

নিরুদ্দেশ ওসি মোয়াজ্জেমের পরিবারের সদস্যরা ‘বিব্রত’

0

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম ১২ জুন : সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের পরিবারের সদস্যরা বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে দিন পার করছেন। ওসি মোয়াজ্জেমকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও আর মিডিয়ার চাপে এ অবস্থা পরিবারটির। তবে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর পরিবার থেকেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন ওসি মোয়াজ্জেম। পুলিশও তাকে খুঁজে পাচ্ছে না।

যশোর শহরের চাঁচড়া ডালমিল এলাকায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের পৈতৃক বাড়ি। ছোট দুই ভাই ও একমাত্র বিবাহিত বোনসহ মায়ের সঙ্গে বসবাস যৌথ পরিবারটির। মোয়াজ্জেমের স্ত্রী-সন্তানেরা থাকেন কুমিল্লার ভাড়া বাসায়। সেখানে সন্তানেরা লেখাপড়া করে। মঙ্গলবার সকালে বাড়িতে গেলে স্বজনরা জানান, আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই।

ওসি মোয়াজ্জেমের বাবা খন্দকার আনসার আলী দেড় বছর আগে মারা গেছেন। পাঁচ ভাই এক বোনের মধ্যে মোয়াজ্জেম বড়। তার এক ভাই আমেরিকা ও আরেক ভাই সৌদি আরব প্রবাসী। তাদের আদি বাড়ি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বৈডাঙ্গা গ্রামে। বাবার চাকরি সুবাদে তারা দীর্ঘদিন যশোর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

১৯৯৭ সালে উপ-পরিদর্শক পদে পুলিশে যোগদান করেন মোয়াজ্জেম হোসেন। ২০১০-১১ সালের দিকে পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। প্রায় দেড় বছর সোনাগাজী থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করেছেন।

ওসি মোয়াজ্জেমের পরিবার যা বলছে: ওসি মোয়াজ্জেমের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে জীবনে কোনো অন্যায় কাজ করেনি। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। আমার ছেলে নিরাপদে ফিরে আসুক, এটাই আমার দাবি। নুসরাত হত্যার বিচার হোক। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। আমার ছেলের জন্যই নুসরাত হত্যাকারীরা ধরা পড়েছে। আমার ছেলেই তাদের গ্রেফতার করেছে।’

ওসি মোয়াজ্জেমের ভাই আরিফুজ্জামান খন্দকার বলেন, ‘নুসরাত হত্যার মূল মামলা বাদ দিয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা সাইবার ক্রাইম মামলা নিয়ে বেশি তোড়জোড় শুরু হয়েছে। মূল আসামিদের অনেকে এখনও গ্রেফতার হয়নি। প্রকৃতপক্ষে মূল আসামিদের আড়াল করতে ‘মোয়াজ্জেম মামলাকে’ সামনে আনা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ভাইয়ের সাথে আগে নিয়মিত কথা হতো। এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন জানি না!’

ভাই আরিফুজ্জামান খন্দকার বলেন, ‘নুসরাতের যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে, সেটি ভাই প্রকাশ করেননি। অন্য একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়েছে। এই অপরাধে সাইবার ক্রাইমের মামলা দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই ভিডিওটিই নুসরাতের দেওয়া বড় সাক্ষ্য প্রমাণ। যার ভিত্তিতে ভাই অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে গ্রেফতার করেছিলেন। এজন্য ভাইকে পুরস্কৃত না করে উল্টো মামলা দিয়ে হয়রানী করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এলাকার মানুষের কাছে খোঁজ নিয়ে দেখেন, আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। কর্মজীবনেও কোনো অপরাধের তথ্য নেই। সাধারণ জীবনযাপন করেন। এই ঘটনার পর নানা কথা শুনতে হচ্ছে।’

ওসি মোয়াজ্জেমের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী উম্মে হানি দাবি করে বলেন, ‘নুসরাতের শ্লীলতাহানির ঘটনায় জড়িতদের আটক করা সহজ ছিল না। ভাই সেটি করতে পেরেছিলেন নুসরাতের বক্তব্যের ভিডিওর ভিত্তিতে। আমাদের ধারণা তিনি সেফটি ডকুমেন্ট হিসেবে ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন। তবে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেননি। টেবিলের ওপর ফোন রেখে বাথরুমে গিয়েছিলেন। এই ফাঁকে তার মোবাইল থেকে ভিডিওটি হস্তান্তর হয়েছিল।’

যে কারণে নিরুদ্দেশ ওসি মোয়াজ্জেম : নুসরাত যখন চিকিৎসাধীন, তখনও আসামিদের গ্রেফতার না করে মামলা দায়ের বিলম্বিত করার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে। ৮ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনায় কোনো আসামি ছাড় পাবে না ঘোষণা দিলে ওসি মোয়াজ্জেমের ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ সামনে চলে আসে। এরপর গত ১৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা দায়ের করেন। ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-কে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত।

একপর্যায়ে ফেনীর সোনাগাজী থানা থেকে তাকে প্রত্যাহার করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং রংপুর রেঞ্জে তাকে সংযুক্ত করা হয়। রংপুর রেঞ্জে যোগ দিলেও ঈদের পর তাকে আর খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। গত ২৬ মে ঢাকার সাইবার ট্রাইবুন্যালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামস জগলুল হোসেন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। ১৭ জুন পরোয়ানা তামিল সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

ওসির ধারণকৃত নুসরাতের ভিডিও যেভাবে ভাইরাল : পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোয়াজ্জেম হোসেন ওসি হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও নিয়ম বর্হিভূতভাবে নুসরাতের বক্তব্যের ভিডিও ধারণ ও প্রচার করে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের তিনটি ধারায় (২৬, ২৯ ও ৩১) ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পেয়েছে পিবিআই।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভিকটিম নুসরাতকে ওসির কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার দুই বান্ধবী নাসরিন সুলতানা, নিশাত সুলতানা এবং সোনাগাজি পৌরসভার মেয়র অ্যাড. রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। ভিকটিমের পরিবারের সদস্যরা পাশের কক্ষে বসা ছিলেন। ভিকটিমের দুই বান্ধবীর বক্তব্য অনুযায়ী ভিডিও ধারণ করার পূর্বে ওসি মোয়াজ্জেম মুখের নেকাব খুলতে নুসরাতকে বাধ্য এবং দফায় দফায় বিব্রতকর প্রশ্ন করেন।

আপত্তি জানালে ওসি তাকে আশ্বাস্ত করে বলেন, এই ভিডিওটি সম্পর্কে কেউ জানবে না। যৌন নিপীড়নের শিকার একজন ভিকটিমের সঙ্গে ওসির এরকম অমানবিক আচরণ অপেশাদারিত্বের পরিচয় বহন করে। ওসির এ পেশাগত অদক্ষ আচরণের ফলে নুসরাতকে আগুন দিয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ এবং পুলিশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম জানান, মোবাইলটি অফিসের টেবিলে রেখে অজু করতে যান। এ সময় তার অজ্ঞাতে একটি বেসরকারি টিভির ফেনী প্রতিনিধি (সাংবাদিক) ‘শেয়ারইট’ অ্যাপসের মাধ্যমে নিজের মোবাইলে নিয়ে নেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে বলেছেন, ওসির এই বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। ওসি নিজেই স্বেচ্ছায় তার ব্যক্তিগত মোবাইল হতে ওই ভিডিও ক্লিপটি তার মোবাইলে পাঠান। এছাড়া ওসির হোয়াটসঅ্যাপ আইডি থেকে অন্য একটি আইডিতেও ভিডিওটি প্রেরণ করা হয়।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

কোন কমেন্ট নেই

উত্তর দিন