রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিথ্যাচার করছে মিয়ানমার

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিথ্যাচার করছে মিয়ানমার

0

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম ১৩ জুন : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ‘মিথ্যাচার’ করছে বলে অভিযোগ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন।

বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় এ বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিবিদদের ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার বলেছে- বাংলাদেশের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দেরি হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এ বিষয়ে এক পায়ে খাঁড়া।’

রোহিঙ্গা সংকটের সর্বশেষ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে কূটনীতিকদের সহায়তা চেয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ; যাতে তারা (মিয়ানমার) রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে।’

বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও দাতা সংস্থা। এ ইস্যুতে যেকোনো সহযোগিতা করতে বাংলাদেশকে সমর্থন করে যাবে বলে জানান তারা। মে মাসের শেষদিকে জাপানে অনুষ্ঠিত ‘ফিউচার অব এশিয়া সম্মেলনের একটি সেশনে মিয়ানমারের একজন মন্ত্রী অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের অসহযোগিতায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

এই প্রেক্ষাপটেই বুধবার বিদেশি কূটনীতিকদের ডেকে সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, কানাডা, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন।

ব্রিফিং শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাক, এটাই আমরা চেয়েছি। কিন্তু মিয়ানমার বারবার কথা দিয়েও কথা রাখছে না। আমরা তাদের সঙ্গে অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছি। গত বছরের জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন শুরু হওয়ার কথা ছিল। দুই বছরের মধ্যে এটা শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা হয়নি। তারপর বলা হল- ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রক্রিয়া শুরু করবে। সেটাও হয়নি। কিছুদিন আগে মিয়ানমারে চতুর্থ যৌথ সম্মেলনে গেলাম, তখন আমরা খুব আশাবাদী ছিলাম। বোধ হয় প্রক্রিয়াটা শুরু হল; কিন্তু সেটাও হয়নি।’

তিনি বলেন, এ ইস্যুতে মিয়ানমার ‘ডাহা মিথ্যা’ কথা বলছে। প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে তাদের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু ৮০০ গ্রামের মধ্যে মাত্র দুটির পরিস্থিতি তারা ভালো দেখিয়ে বলছে, সেখানে কোনো সমস্যা নেই। তারা ‘কথা রাখেনি’।

মিয়ানমার এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে ‘মিস ইনফরমেশন’ ছড়িয়েছে অভিযোগ করে মন্ত্রী বলেন, তারা আমাদের প্রতিবেশী। আমরা এর শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।

এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি তুলে ধরেছি। এ বিষয়ে তারা কী করবে, সেটা তাদের সিদ্ধান্ত। তবে আমরা তাদের সহায়তা চেয়েছি। তারা (বিদেশি কূটনীতিক) আমাদের বলেছেন যে, তারা আমাদের সঙ্গে আছেন। আমরা তাদের বলেছি, মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ বৃদ্ধি করুন, যাতে তারা সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং প্রায় সবাই এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন।’

সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়টি উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইদানীং রোহিঙ্গাদের মধ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমরা অনেক দিন ধরেই আঁচ করেছিলাম যে, এ বিরাট সংখ্যক লোক যদি পড়ে থাকে, তাহলে তাদের সন্ত্রাসী তৎপরতায় জড়ানোর আশঙ্কা আছে। উগ্রবাদে জড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য মিয়ানমারকে আবার জোর দিয়ে বলব, তোমরা তোমাদের কথা রাখ। লোকগুলোকে নিয়ে যাও। এছাড়া তাদের (মিয়ানমারের) বন্ধুপ্রতীম দেশ যারা, তাদেরও আমরা সম্প্রতি বলেছি এবং বলব- ‘তোমাদের বন্ধুকে (মিয়ানমার) বল, ওদের (রোহিঙ্গা) নিয়ে যেতে। এখানে মুসলমানরা নয়, মানবতা লাঞ্ছিত হচ্ছে। আপনাদের যদি মানবতার প্রতি দরদ থাকে তাহলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।’

চীনের বিষয়ে আবদুল মোমেন বলেন, ‘সামনের মাসে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যাবেন। সেখানে রোহিঙ্গা ইস্যু বড় করে তুলে ধরা হবে। চীনকে আমরা বলব, এখানে যদি শান্তি না থাকে, স্থিতিশীলতা না থাকে, তবে তাদের (চীনের) স্বার্থ বিঘ্নিত হবে। এখানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাড়লে তারা যে বিনিয়োগ করেছে বা করবে বলে আশা করছে, সেটি ব্যর্থ হবে।’

বৈঠক শেষে বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। আমরা বলেছি, আমরা বাংলাদেশের পাশে আছি।’

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেন্সজে তেরিংক বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্মেলন হয়েছে। তিনি আমাদের রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে সর্বশেষ নানা তথ্য দিয়েছেন। আমি বলেছি, আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আছি। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করে যাব।’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে চাপ দেয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা এক্ষেত্রে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা বিভিন্ন ক্যাম্পে কাজ করছি। এছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়েছে। তিনি কক্সবাজার এসেছিলেন। বর্তমানে তিনি মিয়ানমার আছেন সেখানকার সরকারপ্রধানের সঙ্গে সংলাপের জন্য। আশা করা যাচ্ছে, এটিই এখন ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবে।

নরওয়ের রাষ্ট্রদূত সিডসেল ব্লেকেন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা বাংলাদেশের পক্ষে আছি। সমর্থন করছি এবং একই সঙ্গে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বসবাসযোগ্য পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করছি। মিয়ানমারের পক্ষ থেকেও এক্ষেত্রে সমানভাবে এগিয়ে আশা উচিত বলে আমরা মনে করি।’

নগরকন্ঠ.কম/এআর

কোন কমেন্ট নেই

উত্তর দিন