শুল্ক কাঠামো লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অন্যতম সমস্যা

শুল্ক কাঠামো লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অন্যতম সমস্যা

0

অর্থনীতি ডেস্ক, নগরকন্ঠ.কম : শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বলেছেন, বাংলাদেশে হালকা প্রকৌশল (লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং) খাত এ দেশেই আরও অনেক বেশি উৎপাদন করতে সক্ষম। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে এ খাতটি মোটেও অগ্রসর হতে পারছে না। পুঁজির স্বল্পতা, অবকাঠামোর অভাবসহ অন্যান্য সমস্যার মধ্যে অন্যতম হল বাংলাদেশর শুল্ক বা কর কাঠামো। শুল্ক কাঠামো স্থানীয় ভাবে উৎপাদনের চেয়ে আমদানিকে উৎসাহিত করছে। যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মারাত্মক অশনি সংকেত।

শনিবার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের ভূমিকা, সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নির্ধারণ বিষয়ক এক গোলটেবিল বৈঠকে (ভার্চুয়াল প্লাটফর্ম) প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দৈনিক যুগান্তর, বিটাক ও এটুআইয়ের সমন্বিত উদ্যোগে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়।

কামাল আহমেদ মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের হালকা প্রকৌশল খাতের বাজারের পরিমাণ বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে দেশীয়ভাবে প্রায় আট থেকে নয় হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকার যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং সেবার মাধ্যমে জিডিপিতে অবদান রেখে চলেছে। সারা পৃথিবীর বাজারের পরিমাণ প্রায় আট ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এ খাতের গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী ২০২০ সালকে হালকা প্রকৌশল পণ্যবর্ষ ঘোষণা করেছেন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত হালকা প্রকৌশল পণ্য বর্ষ ২০২০ সফল করার লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রীকে অনতিবিলম্বে একটি কমিশন গঠন করে সমস্ত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের উপর বিদ্যমান শুল্ক বা কর বৈষম্য নিরসনের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে হালকা প্রকৌশল খাতের পণ্য ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বা কর হারের যৌক্তিক সংস্কার অতি জরুরি।

মূল্য সংযোজন কর (মূসক) সংক্রান্ত বৈষম্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে কার্যকর নিয়ম অনুসারে মূলধনী যন্ত্র আমদানি করলে মুসক দিতে হবে না। আর স্থানীয়ভাবে তা উৎপাদন করলে মুসক দিতে হবে। এতে করে দেশীয় হালকা প্রকৌশল শিল্প মূসকের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে। আমদানি ও উৎপাদন- উভয় ক্ষেত্রেই মুসক একই থাকা যৌক্তিক।

অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধুমাত্র রাজস্ব আদায়কে বড় করে না দেখে দেশে উৎপাদন সম্ভব- এমন পণ্য আমদানিকে অধিকতর সুযোগ না দিয়ে বরং স্থানীয়ভাবে উৎপাদনকে উৎসাহিত করা উচিত। তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং নানাভাবে রাজস্ব আহরিত হবে।

অনুষ্ঠানের সভাপতি যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, বিটাক এবং যুগান্তরের উদ্যোগে এক বছর আগে আমরা একটা সেমিনার করেছিলাম। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০২০ সালকে দেশীয় পণ্যের বছর ঘোষণা করেন। এছাড়া বেশ কিছু পদক্ষেপও ঘোষণা করেছে সরকার। কিন্তু করোনার কারণে এর সুফল আমরা পাইনি। আজকের সেমিনারের ক্ষুদ্র শিল্পকে রক্ষা করতে এবং একে আরও এগিয়ে নেয়ার জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান এবং যেসব সংস্থার প্রয়োজন হয়, সেগুলোর প্রতিনিধিরা সবাই উপস্থিত ছিলেন। কাজেই আশা করছি, সকলে মিলে একটি গ্রহনযোগ্য যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ণ এবং সমন্বিত কর্মকৌশলের মধ্য দিয়ে বর্তমান চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করে এ খাতটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো।

সাইফুল আলম আরও বলেন, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পে বিনিয়োগের যে পরিকল্পনা সরকার করছে, তার প্রাথমিক স্তর ভিত্তিই হলো ক্ষুদ্র শিল্প। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র শিল্পের যেমন সমস্যা রয়েছে, তেমনি সম্ভাবনাও রয়েছে। আর সেই সম্ভাবনাকেই আমাদের কাজে লাগাতে হবে। শিল্পে কর বৈষম্য দূর করে আমাদের দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষামূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং ব্যক্তি উদ্যোক্তার প্রসার ঘটবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আলী আজম বলেন, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত মাদার অব ইন্ডাস্ট্রি। এটা বলা যথার্থ। আমাদের উদ্যোক্তারা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। মেধাবী, দক্ষ ও কর্মক্ষম লোকবল নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এ সেক্টরের জন্য পৃথক নীতিমালা তৈরি করতে হবে। ইতিমধ্যেই নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ সেক্টরের সমৃদ্ধির জন্য আমারা কাজ করে যাচ্ছি। এই শিল্প বিকাশে আমরা শিল্পপার্ক করার চিন্তা করছি। এই কাজের অগ্রগতিতে আমাদের কাছে বিসিক ইতিমধ্যে নয়টি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আমরা যাচাই বাছাই করে যতদূর সম্ভব অনুমোদন করার চেষ্টা করবো।

বিটাক পরিচালক ড. সৈয়দ মো. ইহসানুল করিম বলেন, লাইট ইঞ্জিনিয়ারি সেক্টরকে নিয়ে একটা সুনিদিষ্ট পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। এই সেক্টরে অনেকগুলো বিষয় জড়িত আছে। এর মধ্যে কমার্শিয়াল ও টেকনিক্যাল সাইড আছে। তরুণদের মেধার ক্ষেত্রে অন্য দেশের তুলনায় আমরা সুবিধাজনক অবস্থানে আছি। শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণদের বিদেশমুখী থেকে ফিরিয়ে দেশে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের উন্নতি প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে।

বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, এই মাদার সেক্টরকে আধুনিক করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই সেক্টরের অভিভাবক শিল্প মন্ত্রণালয়। আর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাজেটের আগে এনবিআরে কিছু সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল। যা বিবেচনায় আনা হয়নি। দেশের শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রাংশ যদি লোকাল যোগান দেয়া হয় তাহলে কেন আমাদের সুবিধা দেয়া হবে না? হয়তো কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। এ সেক্টরে অনেক সমস্যা রয়েছে। তবে সম্ভাবনাও বিশাল। এ সেক্টেরের উন্নয়নের মধ্যদিয়ে দেশের আরও উন্নয়ন হবে।

বিটাকের মহাপরিচালক ড. মো. মফিজুর রহমানের পরিচালনা ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিকুল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রথম সচিব কাজী ফরিদ উদ্দিন, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সদস্য শাহ মো. আবু রায়হান আলবেরুনী, প্রফেসর মো. নুরুল আমিন, প্রফেসর মো. কামাল উদ্দিন (অব.) প্রমুখ।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

কোন কমেন্ট নেই

উত্তর দিন