বুধবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২১, ০১:০০ পূর্বাহ্ন

বাঁশির জাদুতে মুগ্ধ মানুষ, জীবন সংসারে বিধ্বস্ত মোহন সরকার

মোহন সরকার। বয়স  ৬০। জন্ম থেকেই তিনি দুই চোখে দেখতে পান না। পথের ধারে, বাসে, হাট বাজারে গান গেয়ে সংসার চালান মোহন সরকার আর বাঁশির জাদুতে মুগ্ধ করেন পথের মানুষকে। তবে তিন ছেলে মেয়ের লেখাপড়া আর সংসার চালানোর খরচ জোটানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে তার।
মোহন সরকারের গ্রামের বাড়ি শেরপুর সদরের নন্দির বাজার এলাকায়। প্রথমে তিনি ওই এলাকায় বাসে ও বাজারে ঘুরে ঘুরে গান শুনাতেন। পরবর্তীতে তিনি ছেলের লেখাপড়ার কারনে চলে আসানে গাজীপুরে। বর্তমানে তিনি গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক স্কাউট প্রশিক্ষন কেন্দ্রের পাশে আয়েস মার্কেট এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। গাজীপুর, চান্দনা চৌরাস্তা, মৌচাক, সফিপুর, কালিয়াকৈরসহ আশপাশেও গান করেন।
গত সোমবার দুপুরে কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর বাজারে মর্ডান হাসপাতালের সামেনে দাঁড়িয়ে গান গাইছিলেন মোহন সরকার।  সেখানেই কথা হয় তার সঙ্গে। গান শুনতে চাইলে তিনি বলেন, কি গান শুনতে চান? উপস্থিত দর্শক বললেন আপনার পছন্দ মতোই গান। আর দেরি নয় সঙ্গে সঙ্গে দুতারা হাতে তুলে নিয়ে গাইতে শুরু করলেন,‘সত্য সুপথ না চিনিলে পাবিনে মানুষের দর্শন,  ওরে আমার মন। সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন।’
এরপর দুইতারা রেখেই হাতে নিলেন বাঁশের বাঁশি। বাঁশিতেও যেন জাদু আছে, মানুষ তার বাঁশির শুর শুনে মুদ্ধ হয়ে যান। যেন কোন গানই বাঁশিতে দারুন শুর দিতে পারেন মোহন সরকার।
মোহন সরকারের এক মেয়ে দুই ছেলে।  মেয়ে দিলরুবা আক্তার দেড় বছর আগে চট্টগ্রাম মহিলা পলিটেকনিক্যাল থেকে ইলেকট্রনিকস এ ডিপ্লোমা শেষ করে এখন নিজ বাড়িতেই বসে আছেন। কাজের সন্ধান করেও কোন কাজ পাচ্ছে না। সে চট্টগ্রাম রেলওয়েতে ইন্টার্নিও করেছে বলে জানান। মোহন সরকার টাকার অভাবে মেয়েকে বিএসসিতে ভর্তি করাতে পারেননি। মোহন সরকারের এক ছেলে এইচএসসি পর্যন্ত পড়েছেন। ছোট ছেলে দ্রুব সরকার কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক স্কাউট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিবে। বড় ছেলে রতন সরকার টাইলস মিস্ত্রির কাজ করে।
মোহন সরকার বললেন,  মেয়েডা দুই বছর হইছে ডিপ্লোমা শেষ করছে কিন্তু কোন চাকরি হইতাছে না। মেয়েডার যদি একটা চাকরি হইতো তাইলে আমি পরিবারটা নিয়া দাড়ইতে পারতাম। তিনটা ছেলেমেয়ের মধ্যে একটারও যদি চাকরি হইতো তাইলে ভালোভালে থাকতে পারতাম। মেয়ে চাকরির জন্য কত জায়গায় আবেদন করছে, কিন্তু কেউ চাকরি দেয় না। পরিবারটা নিয়া আমি পড়ছি বিপদে।
মোহন সরকার বললেন, ছোট বেলা থেকেই আমার ছেলে-মেয়েরা স্কুলে ভালো ফলাফল করেছে। আমার দিনে কখনো ২০০ কখনো ৫০০ টাকা আয় হয়। আয়ডাও হয় গান গাইয়া। মানুষ গান শুইন্যা যা দেয় তাই দিয়াই সংসারডা কোন রহমে চলতাছে। আপনারা যদি আমারে ছেলেমেয়েদের একটা চাকরি দিয়া গতি কইরা দিতে পারতেন তাইলে খুবই উপকার হইতো। ছেলেডার স্কুলের খরচ, ভাড়ি ভাড়া দিয়ে কোন রহমে খাইয়া না খাইয়া বাইচা আছি।
সেই ছোট বয়সে মোহন সরকারের মা মারা যান। ঘরে সৎমা আসার পর মোহন সরকারের জীবনটাই পাল্টে যায়। একে চোখে দেখেন না, তার ওপর সৎমায়ের অত্যাচার। বড় ভাই ছোট ভাইয়েরা ধরে মারধোর করতো। সারা দিন সংসারের কাজ করাতেন সৎমা। গরু ছাগল দেখা থেকে শুরু করে বাড়ির কাজের লোকদের দেখভালও করতে হতো মোহন সরকারকে। ঢেঁকিতে ধান থেকে চাল বের করতে হতো। তবে মোহন সরকারের গানের নেশা ছিল ছোট বেলা থেকেই। একটু অবসর পেলেই গ্রামের চাঁন মিয়ার কাছে গিয়ে বাঁশি বাজাতে শিখতেন। স্কুলের মাঠে বসে গান গাইলে বা বাঁশি বাজালে ছাত্ররা টিফিন খাওয়াতো। শিক্ষকেরা আদর করতেন। মোহন তখন থেকেই বুঝতে পারেন গানের সম্মান আছে।
মোহন সরকার বললেন, ছোট বেলা থাইক্যাই দুঃখে কষ্টে মানুষ হইছি। কোন সুখের মুখ দেখতে পারমু কিনা জানি না। তবে ছেলেমেয়েদের একটা গতি করতে পারলে হইতো আমার সাংসারটা বাচাইতে পারতাম। মেয়েডাও বড় হইছে বিয়া দেয়াও দরকার। তিনি সকলের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com