বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২, ০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
জুনে এসএসসি, আগস্টে এইচএসসি নিতে চায় বোর্ড দেশে বুস্টার ডোজ পেয়েছেন প্রায় সাড়ে সাত লাখ অনশন ও আন্দোলন ভিন্ন ব্যাপার: জাফর ইকবাল বাংলাদেশ যখন উন্নত দেশ হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে : সরকারি দল বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যা মামলা : মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত ১৭ আসামির জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বললেন পেরেরা ফ্রান্সে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের নতুন রেকর্ড নেদারল্যান্ডসকে হোয়াইটওয়াশ করলো আফগানিস্তান টিকা আবিষ্কার ও ব্যবহারের অনুমতির আগেই সরকার টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় : প্রধানমন্ত্রী রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা নেই : ওবায়দুল কাদের

প্রয়াণ দিবসে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ

যুগ যুগ ধরে বাংলা নাটকের চলমান ধারা বদলে দেওয়া একমাত্র নাট্যকার ড. সেলিম আল দীন। বাংলা নাটকের শিকড়সন্ধানী এই মহাপুরুষ, চিত্রকলা, নৃত্যকলা, অভিনয়কলা ও সংগীতের সমন্বয়ে বাংলা নাটকে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। বাংলা নাটকের শিকড় সন্ধানে তিনি নাটকের আঙ্গিক ও ভাষার ওপর চালিয়েছেন হাজারও নিরীক্ষা, করেছেন গবেষণা। তাই নাট্যাঙ্গনে তিনি নাট্যাচার্য হিসেবেই অধিক পরিচিত।

ঔপনিবেশিক সাহিত্যধারার বিপরীতে গিয়ে বাংলা নাটককে আবহমান বাংলার গতিধারায় ফিরিয়ে এনেছিলেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। তিনি ঔপনিবেশিকতার অবলেশ থেকে মুক্তি দিয়েছেন বাংলা নাটককে। বাংলা নাট্যমঞ্চে অনুবাদনির্ভর নাট্যচর্চার যে রীতি গড়ে উঠেছিল সেখানে তিনি প্রতিস্থাপন করেন বাংলা ভাষার মৌলিক নাটককে। নাটকে বিষয়, আঙ্গিক আর ভাষা নিয়ে গবেষণা ও নাটকে তার প্রতিফলন তুলে ধরেছিলেন। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে বাংলা নাটকের যে আন্দোলন, তার পেছনেও রয়েছে সেলিম আল দীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের শিকড়ের সন্ধানে মগ্ন ছিলেন।

শুক্রবার (১৪ জানুয়ারি) ত্রয়োদশ প্রয়াণ দিবসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও কালোত্তীর্ণ এই নাট্যকারকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করা হয়েছে। প্রতিবছর দিবসকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজন থাকলেও এ বছর করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় স্বাস্থ্যবিধি মেনেই প্রয়াণ দিবসের আয়োজন ছিল সীমিত পরিসরে।

দিবসটি উপলক্ষে ‘এই মুখ তোমার মুখ, একাকার একাকার’ স্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করে। দিনের কর্মসূচির শুরুতেই অমর একুশ ভাস্কর্যের চত্বর থেকে সকাল সাড়ে ১০টায় একটি স্মরণযাত্রা নিয়ে সেলিম আল দীনের সমাধিস্থলে গিয়ে শেষ হয়। এতে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ইস্রাফিল আহমেদ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভিন্ন নাট্য সংগঠন, দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গ, সেলিম আল দীনের আত্মীয়-স্বজন প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।

এ সময় তাঁর সমাধিতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের পক্ষে সকাল ১১টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর এবং নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. ইস্রাফিল আহমেদ এবং বিভাগীয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. হারুন অর রশীদ খান, ড. সোমা মুমতাজ, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের অতিরিক্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. জেবউননেছা প্রমুখ শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন।

এরপর একে একে সেলিম আল দীনের সমাধিতে আরাে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে বাংলাদেশ গ্রামথিয়েটার, ঢাকা থিয়েটার, সেলিম আল দীন ফাউন্ডেশন, তালুকনগর থিয়েটার, স্বপ্নদল ঢাকা, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার, বাংলাদেশের পুতুল নাট্য গবেষণা কেন্দ্র, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, নাটক সংসদ, ভোর হোল, শহীদ টিটু থিয়েটারসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পী ও কলাকুশলীবৃন্দ। শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের পর সেলিম আল দীনের সমাধি চত্বরে অনুষ্ঠিত এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে জাতীয় মনন ও বিশ্বইতিহাস-ঐতিহ্যের সন্ধানে সেলিম আল দীনের নাট্যচর্চা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

দুপুর অনলাইনে ‘টেলিভিশন মাধ্যমে সেলিম আল দীন : কর্মপরিধি ও আধেয় পার্যলোচনা’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ড. ইসলাম শফিক। আলোচক হিসেবে ছিলেন, খ ম হারুন, অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জহির রায়হান মিলনায়তনের থিয়েটার ল্যাব-৩-এ ইউসুফ হাসান অর্কের নির্দেশনায় এবং সৈয়দ শামসুল হক রচিত নাটক ‘জলপলকের গান, স্বাস্থবিধি  মেনে সীমিত সংখ্যক দর্শকের সামনে পরিবেশিত হবে। এ ছাড়া সাবেক কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ‘উজ্জ্বল মুখ’-এর আয়োজন কভিড পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তীতে আয়োজন করা হবে।

প্রসঙ্গত, সেলিম আল দীনের জন্ম ফেনীতে হলেও বাবার চাকরির সূত্রে ফেনী, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রংপুরের বিভিন্ন স্থানে তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি  নেয়ার পর কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন শিক্ষকতাকে। ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এর পর থেকেই তার কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত হতে থাকে। একদিকে সৃজনশীলতার ভুবন আলোকিত করে রাখেন তার নতুন নতুন ভিন্নমাত্রিক রচনা সম্ভার দিয়ে, অন্যদিকে শিল্পের একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির জন্য কাজ করে যান সমান্তরালে। ১৯৮৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর উদ্যোগেই খোলা হয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এই বিভাগকে তিনি অধিষ্ঠিত করেন মর্যাদার আসনে। শিক্ষকতার পাশাপাশি সারাদেশে নাট্য আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে ১৯৮১-৮২ সালে গড়ে তোলেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। এর আগেই শিল্পসঙ্গী নাট্যনির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে নাটক নিয়ে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর সম্পাদনায় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকেই প্রকাশিত হতো নাটকবিষয়ক পত্রিকা ‘থিয়েটার স্টাডিজ’।

নাটক রচনার পাশাপাশি নাটক নিয়ে তিনি গবেষণা চালিয়ে গেছেন আজীবন। বাংলা ভাষার একমাত্র নাট্যবিষয়ক কোষগ্রন্থ ‘বাংলা নাট্যকোষ’ সংগ্রহ, সংকলন, প্রণয়ন ও সম্পাদনা করেছেন তিনি নিজেই। তাঁর রচিত ‘হরগজ’ নাটকটি সুয়েডীয় ভাষায় অনূদিত হয় এবং এ নাটকটি ভারতের রঙ্গকর্মী নাট্যদল হিন্দি ভাষায় মঞ্চায়ন করেছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকেন্দ্রিক এথনিক থিয়েটারেরও উদ্ভাবনকারী তিনিই।

সেলিম আল দীনের লেখা নাটকের মধ্যে ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’, ‘শকুন্তলা’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘চাকা’, ‘হরগজ’, ‘প্রাচ্য’, ‘হাতহদাই’, ‘নিমজ্জন’, ‘ধাবমান’, ‘পুত্র’, ‘বনপাংশুল’ উল্লেখযোগ্য। ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে তাঁর গবেষণাধর্মী নির্দেশনা ‘মহুয়া’ ও ‘দেওয়ানা মদিনা’। তাঁর রচিত ‘চাকা’ ও ‘কীত্তনখোলা’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

একুশে পদক, বাংলা একাডেমি ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্করপ্রাপ্ত ড. সেলিম আল দীন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com