রবিবার, ১৬ Jun ২০২৪, ০৯:২৩ অপরাহ্ন

বদলে যাওয়া ওষুধ শিল্পের কারিগর ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যার মধ্যে কোনো প্রকার লোভ ছিলনা। ৭১ মুক্তিযোদ্ধের সময় জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন তেমন সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করে বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ করে গেছেন। বিশেষ নিজের প্রচেষ্টা বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পকে অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

বর্তমানে দেশে যে কয়টি শিল্প অত্যন্ত শক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে অন্যতম ওষুধ শিল্প। আর এই অবস্থানের পেছনের কারিগর ডা, জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

বর্তমানে পোশাক শিল্পের সাফল্যের পর ওষুধ শিল্পকে দেশের অন্যতম প্রধান রফতানি পণ্য হিসেবে দেখছে।

জানা যায়, অতি প্রয়োজনীয় এ পণ্যের মোট চাহিদার শতকরা ৯৮ শতাংশ পূরণ হয় আমাদের দেশিও প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। আর একই সঙ্গে পৃথিবীল অন্তত ১৪৮টিরও অধিক দেশ রফতানি করা হয় দেশে উৎপাদিত ওষুধ। আর এর ভিত গড়ে উঠে ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতির মাধ্যমে। যা প্রনোয়ণ করেছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

জানা যায়, ১৯৮২ সালে দেশে যখন প্রথমবারের মতো এই জাতীয় ঔষধ নীতি প্রণয়ণ করা হয়, তখন এর সাফল্য নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করেযারা ওষুদ শিল্পের সঙ্গে জড়িত তাদের মধ্যে। কেননা দেশে এর আগে ওষুধ উৎপাদন এবং এর ব্যবহারের বিষয়ে কোনো ধরনের নীতিমালা ছিল না। যার প্রেক্ষিতে ওষুধ শিল্প বিকশীত হচ্ছিল না। নতুন ওষুধ নীতি প্রণয়নের পর দেশে বিদেশি ওষুধের প্রবেশ বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং আমাদের দেশেই ওষুধ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠ উৎসাহিত হয়। এবং পরবর্তীতে অনেকেই এই শিল্পে বিনিযোগ করতে শুরু করে। আর এর প্রধান রূপকার ছিলেন অনুতভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিকিৎসক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

তিনি বদলে দেন ওষুধের বাজার ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত ওষুধ নীতি প্রণয়নের আগে দেশে মাত্র ১৬ শতাংশ ওষুধ উৎপাদিত হতো। মাত্র একটি নীতিমালায় বদলে যায় দেশে ওষুধ শিল্পের বাজার। তখন ৮৪ শতাংশ ওষুধ আমদানি করা হতো। আর বর্তমানে সেই ওষুধ বিশ্বের রফতানি করা হচ্ছে। এর জন্য জাফরুল্লাহ চৌধুরীর কাছে চিরদিন ঋণি থাকবে বাংলাদেশ।

জানা যায়, ১৯৮২ সালে ওষুধের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত ৮টি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। পরে সেই বিদেশি বেশ কয়েকটি কোম্পানির এ দেশে কোনো কারখানা ছিল না। তারা অন্য কোম্পানির কারখানায় ওষুধ বানিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ড লাগিয়ে বাজারজাত করত। এতে দেশে নিম্নমান ও নকল ওষুধের ছড়াছড়ি ছিল বাজারে। মানুষের মধ্যে সচেতনার অভাবও ছিলো। তখন বাজারে শতকরা ৩০ শতাংশ ওষুধ ছিল নিম্নমানের। তখন ওষুধ আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হতো বাংলাদেশের।

জানা যায়, ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতির ১২টি নিয়ন্ত্রণকারী পদক্ষেপের কারণে বাজার থেকে বিদেশি ১ হাজার ৭০০টি ওষুধ বাতিল হয়ে যায়। আর বদলে যেতে শুরু করে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প। ওষুধ প্রশাসন দুই সপ্তাহের মধ্যে রেসিপি পাস করতে শুরু করে। ফলে দেশের কোম্পানিগুলো ওষুধ বানানো শুরু করে। এতে ওষুধের বাজারে তড়িত ফল দেখা যায়। কোনো কোনো ওষুধের দাম এক–তৃতীয়াংশ কমে যায়। একই সঙ্গে দেশে ওষুধ আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। নামহীন ও ছোট অনেক দেশি কোম্পানি বড় কোম্পানিতে পরিণত হয়। সারাদেশের মানুষ অল্প দামে মানসম্পন্ন ওষুধ পাওয়া শুরু করে। মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় সচেতনতা।

৯০ দশক পেরিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার উপরে এবং আন্তর্জাতিক বাজার ৬৫০ কোটি টাকারও বেশি। এখন দেশের অনেক বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে এখন প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল উৎপাদিত হচ্ছে। এই শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়েছে লাখ লাখ মানুষের। এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৯ শতাংশের উপরে। বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে বর্তমানে সরকারি তালিকাভূক্ত ছোট-বড় এ্যালোপ্যাথিক ওষুধ কারখানা রয়েছে ৮৫০টি। ওষুধ প্রস্ততকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২৬৯টি।

ডা. জাফরুল্লাহ ও স্বাস্থ্যনীতি

জানা যায়, ওষুধ নীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে ১৯৮২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের নির্দেশে ৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় পিজি হাসপাতালের (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) পরিচালক অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামকে। এই কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

এ বিষয়ে একটি বেসরকারি গণমাধ্যমকে দেওয়া স্বাক্ষাৎকারে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরি বলেছিলেন, ‘ষাটের দশকে আমি বিলেতে ভাস্কুলার সার্জন হিসেবে কাজ করতাম। ওই সময় আমরা একটা খবর জেনে খুব হতাশ হয়ে পড়ি। যুক্তরাষ্ট্রের টেরামাইসিন নামের যে ওষুধ বাজারে চলত, তা তৈরি হতো পূর্ব ইউরোপের একটি সমাজতান্ত্রিক দেশে। পশুর ওষুধ এবং টেরামাইসিন একই কারখানায় তৈরি হতো।’

ওষুধ নীতি নিয়ে নিজের কাজের অভিজ্ঞতার তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রতারণার আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। আমি তখন গ্রামে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। দেখতাম এক দিনের চিকিৎসার জন্য যারা ঢাকায় আসতেন, তাদের সাত দিনের উপার্জন শেষ হতো। যক্ষ্মার ওষুধ ব্রিটেনে দাম ছিল ৬ ডলার। সেই ওষুধের দাম বাংলাদেশে ৪৯ ডলার। বিচিত্রায় ওষুধ সাম্রাজ্যবাদ নামে আমার একটি লেখা ছাপা হয়েছিল। বাংলাদেশের ওষুধের সার্বিক পরিস্থিতি আমি শেখ সাহেবকে বুঝিয়েছিলাম। তাকে বলেছিলাম, দেশে ওষুধের দাম কমাতে হলে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। তিনি পূর্ব ইউরোপ থেকে ওষুধ আমদানির ব্যবস্থা করেছিলেন। ওষুধ নিয়ে কাজ করা আমার অনেকটা নেশার মতো। জিয়াউর রহমানকেও আমি ওষুধের বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। এরপর জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় আসেন। তিনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ওষুধ নিয়ে আমি কী করতে চাই জানতে চেয়েছিলেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আহমদ শরীফসহ অনেকেই এরশাদের সঙ্গে কাজে না জড়াতে বলেছিলেন।’

রাষ্ট্রপতি এরশাদের সাথের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘এরশাদ সাহেবকে বলেছিলাম, একটি যথাযথ কমিটির মাধ্যমে ওষুধ নীতি প্রণয়নের কাজটি করতে হবে। ৮ সদস্যের কমিটি করা হয়েছিল। কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তখনকার পিজি হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক নুরুল ইসলাম। খুব কম সময় নিয়ে আমরা কাজটি করেছিলাম। ওষুধ নীতি প্রণয়নের কাজে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘সিলেকশন অব অ্যাসেন্সিয়াল মেডিসিন’ প্রকাশনাটি বিশেষ কাজে লেগেছিল। আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানসম্পন্ন ওষুধ তৈরি করা, ওষুধ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধ বাজার থেকে বের করে দেওয়া।”

উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অনুন্নত ৪৮ দেশের মধ্যে ওষুধ উৎপাদনে শীর্ষে অবস্থান করছে। ২০২০ সালে ওষুধ রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭২তম। যা সূচনা হয়েছে ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতির মাধ্যমে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com