বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০২:৩৪ পূর্বাহ্ন

শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বেকার আলামিনের হাতে এনে দিলো আলাদীনের চেরাগ

বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ, তথ্য প্রযুক্তির(আইসিটি) যুগ। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে  এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের  উন্নত দেশগুলো। তথ্য প্রযুক্তি খাতে নিত্য নতুন কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলছে। বেকার যুবকদের জন্য সফল উদ্যোক্তা হওয়ার অপার সুযোগ সৃষ্টি করেছে এই খাত। বিষয়টি মাথায় রেখেই   প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার  সরকার  ক্ষমতা গ্রহণের  পরই তথ্য প্রযুক্তি খাতে বিশেষ  নজর দিয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি খাতকে দেশের   প্রত্যন্ত অঞ্চলে  নিয়ে গেছে সরকার। ক্রমান্বয়ে স্বাবলম্বী  হয়ে উঠছে দেশের  বেকার যুব সমাজ।  কেবল স্বাবলম্বী হওয়া নয়, কেউ কেউ হয়ে উঠছেন  সফল  উদ্যেক্তাও।  তাদেরই একজন  নেত্রকোনার মোহাম্মদ  আলামিন।
দারিদ্র্যের  কষাঘাতে  বিপর্যস্ত  বেকার যুবক এই ৩১ বছর বয়সী  আলামিন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার এবং সরকারের বিভিন্ন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) ভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সহায়তা নিয়ে  আজ হয়েছেন  স্বনির্ভর  ও সফল একজন  উদ্যোক্তা। আইসিটি ভিত্তিক উদ্ভাবনী কাজ ও সেবার জন্য সমাজের অনেক দরিদ্র বেকার যুবকের সামনে আলামিন আজ অনুপ্রেরণার নাম।
তবে কাজটা  এত সহজ ছিলনা  নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়নের  হিরণপুর গ্রামের  আলামিনের জন্য।   ডিজিটাল সেন্টারে আত্মকর্মসংস্থান  সৃষ্টি করতে অনেক বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে। ২০০৭ সালে  এসএসসি পাশ করেন আলামিন। পরিবারের আর্থিক সমস্যায় উচ্চ শিক্ষা  গ্রহণের সুযোগ হয়নি তার।  তাই  এসএসসি পাশ করার পরই  পরিবারের প্রয়োজনে  একটা চাকুরি  পেতে  নিরলস প্রচেস্টা  চালান তিনি। আলামিন জানালেন, তার সমস্ত প্রচেষ্টাই  ব্যর্থ হয়। কিন্তু এই হতাশার মাঝেই তিনি আলোর সন্ধান পান সরকারের আইসিটি কর্মসূচির মধ্যে।
আলামিন বলেন,‘২০১০ সালে  জানতে পারলাম, নেত্রকোনা জেলা যুব উন্নয়ন  বিভাগের সভাকক্ষে তিন মাসব্যাপী কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হবে।  তারপরে আমি সেখানে গিয়ে  বিভাগের এক কর্মকর্তার সহায়তায়  প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিই।’
এই প্রশিক্ষণই তাকে পথ দেখালো ভবিষ্যতের। তিনি বলেন,  “আমি  সফলভাবে প্রশিক্ষণটি শেষ করি। সেখান থেকে  আমি কম্পিউটার চালনা, ইমেল, ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের  মাধ্যমে তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ, দেশে- বিদেশে চাকরির জন্য অনলাইন আবেদনের  ফাইলিংসহ কম্পিউটার এবং আইসিটি ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করি।”
এরপর তিনি একই বছর জেলা প্রশাসন ও আইসিটি বিভাগের তত্ত্বাবধানে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক অফিসে অনুষ্ঠিত আইসিটি নেটওয়ােের্ক সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার  আরেকটি সুযোগ পান।  সেখানে দেশের বিশিষ্ট আইসিটি বিশেষজ্ঞরা প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণের পর  পূর্বধলা উপজেলার  হিরণপুর বাজারে একটি বেসরকারী কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চাকরি করার সুযোগও মিলে যায় আলামিনের।
এরপর  ২০১১ সালে আলামিন নারান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সেসময়কার চেয়ারম্যানের সাথে  দেখা করে  ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে একজন উদ্যোক্তা হিসাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
কিছুদিন পর ইউপি চেয়ারম্যান আলামিনকে  সাথে করে  পূর্বধলা উপজেলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)’র কার্যালয়ে গিয়ে ইউএনওর সাথে তাকে  পরিচয়  করিয়ে দেন। ইউপি চেয়ারম্যান ইউএনওর কাছে তাকে নারানদিয়া  ইউনিয়ন  ডিজিটাল সেন্টারে উদ্যোক্তা হিসাবে কাজ করার অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ করেন। অনুরোধে সাড়া দিয়ে  ইউএনও তাকে একটি আবেদন জমা দিতে বলেন।  ইউএনওর নির্দেশ মত তিনি আবেদনপত্র জমা দেন। এক মাসের মধ্যেই তিনি ইউএনও অফিস থেকে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে  একজন   উদ্যোক্তা হিসেবে  কাজ করার অনুমতি পান। এরপরই আলামিনের বেকার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। আলামিন বলেন,‘ “ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে কাজ শুরুর পরই  আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।”
একজন উদ্যোক্তা হওয়ার সুবাদে তিনি ২০১২ সাল  থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে  (এটুআই), তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সরবরাহকৃত তথ্য ও উপাত্ত ব্যবহার করে ‘আইসিটি এবং কম্পিউটার অপারেটিং’ বিষয়ে বিস্তৃত জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পান।
এসব প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ই-কমার্স, ডিজিটাল বিপণন, হার্ডওয়্যার, সফ্টওয়্যার এবং আউটসোর্সিংসহ কম্পিউটার এবং আইসিটি নেটওয়ার্ক সম্পর্কে  বিশদভাবে জানতে পারেন।
এভাবে সরকারের বিভিন্ন ধরনের সহায়ক সেবা থেকে নিজেকে সমৃদ্ধ করে আলামিন এক সময়ে একজন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ উদ্যোক্তায় পরিণত হন। আলামিন বলেন, “২০২০ সালের দিকে আমি একজন সফল ও পেশাদার আইসিটি কর্মী হিসাবে স্মার্ট ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।  এছাড়া গ্রামীণ জনগণকে ডিজিটাল পরিষেবা সরবরাহের পাশাপাশি একটি অনলাইন ভিত্তিক বিপণন কার্যক্রম শুরু করি।’
আবেগ আপ্লুত কন্ঠে আলামিন বলেন, “এখন আমার স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। আমি নিয়মিত উপার্জনের একটি ব্যবস্থা করতে পেরেছি এবং আমার আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এর মাধ্যমে অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে।”
নিজের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি এবং সফল একজন উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর তথ্য প্রযুক্তি উপদেষ্টা  সজিব ওয়াজেদ জয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আলামিন।
নারান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খুকন মিয়া বলেন, আলামিনের মতো তার ইউনিয়নের অনেক দরিদ্র বেকার যুবক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন  বর্তমান সরকারের আমলে সরকারি উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘কম্পিউটার এবং আইসিটি নেটওয়াার্ক’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে কম্পিউটার এবং আইসিটি ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে স্বনির্ভর হয়ে  উঠেছে।’
নেত্রকোনা স্থানীয়  সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক, জিয়া আহমেদ সুমন বলেন,‘ ইউনিয়ন এবং উপজেলা ডিজিটাল  সেন্টারগুলো পরিষেবা বিতরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং  ক্ষমতায়নে সমন্বিতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি জানান, জেলার দশটি উপজেলায় মোট  ৮৬ টি ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় ৯২টি  ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে; যেখানে  আধুনিক ও প্রয়োজনীয় যেমন কম্পিউটার, ল্যাপটপ, লেজার ও কালার প্রিন্টার, প্রজেক্টর, মডেম, স্ক্যানার এবং ফটোষ্ট্যাট মেশিন রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে  জনগণের জন্য  জন্ম  ও মৃত্যু সনদ, নাগরিকত্ব সনদ, ফটোকপি, কম্পিউটার কম্পোজ, ফটোগ্রাফি, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ এবং চাকরির  জন্য অনলাইন আবেদনসহ শত শত পরিষেবা গ্রহণের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক বেকার যুবক নিয়মিত উপার্জনের উপায় এবং স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্যে  ডিজিটাল  সেন্টারগুলোতে উদ্যোক্তা এবং ডিজিটাল পরিষেবা সরবরাহকারী হিসাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাজী মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, সরকারের আইসিটি ভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান  ও স্বনির্ভর পথ দেখাতে  গুগুরুত্বপুর্ন  ভূমিকা পালন করছে।
এই কার্যক্রমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তৃণমূল পর্যায়ের ডিজিটাল সেন্টারগুলো জনগণের  দোরগোড়ায় প্রয়োজনীয় সেবা দিচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com