শনিবার, ২২ Jun ২০২৪, ১১:৫৬ অপরাহ্ন

অবরোধে জনমনে অগ্নিসন্ত্রাস আতঙ্ক : যানবাহন কম

অবরোধ কর্মসূচিতে ব্যাপক অগ্নিসন্ত্রাসের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সেইসঙ্গে আতঙ্কে ভীত হয়ে পড়েছেন পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকরা। অজানা আতঙ্কে রাস্তায় তেমন একটা যানবাহন চলাচল করছে না। আগাম আতঙ্ক সৃষ্টির অভিনব কৌশলে চেষ্টা চলছে অবরোধ কর্মসূচি সফল করার। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে অবরোধ ডাকার আগের রাতেই ব্যাপকহারে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশের দিন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পুলিশ সদস্য আমিরুল ইসলাম পারভেজকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে বিক্ষোভকারীরা। মূলত পুলিশের মনোবল ভেঙে দিতে এবং দেশবাসীর মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তাকে। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া বিএনপির অঙ্গসংগঠনের ছয় নেতা জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই পুলিশ সদস্যকে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তায় এনে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। যাতে বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে এবং মানুষের মধ্যে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে ভীতি কাজ করে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এমন ঘটনার পর পরই বিএনপি-জামায়াতের তরফ থেকে দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি ডাক দিতে পারত। কিন্তু তা দেয়নি। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মানসিক অবস্থা বোঝার জন্য দুই দিন সময় নিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। দুই দিনে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর গত ৩১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী টানা তিন দিন অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো। অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণার পর পরই তারা যানবাহনে অগ্নিসংযোগ শুরু করেনি।

সূত্রগুলো বলছে, অবরোধের নামে ৩০ অক্টোবর রাত থেকেই অগ্নিসন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় ৩০ অক্টোবর নরসিংদীর বাবুরহাটে এবং গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে এবিএম ফ্যাশন নামে একটি কারখানায় অগ্নিসংযোগ করে উত্তেজিত জনতা। অগ্নিসন্ত্রাসে গাজীপুরে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই গার্মেন্টস সেক্টরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় গত ৩১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ৩৪টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষোভকারীরা। এরপর থেকে দফায় দফায় অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হচ্ছে। কর্মসূচি শুরুর আগের রাতে যানবাহনে ধারাবাহিকভাবে ব্যাপকহারে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। চলমান চতুর্থ দফার অবরোধ কর্মসূচিতে সারা দেশে আড়াই শতাধিক যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, মূলত প্রতিটি অগ্নিসন্ত্রাসের ঘটনা পর্যালোচনা করে জানা গেছে, কর্মসূচি চলাকালে দিনের বেলায় যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা তুলনামূলক নেই বললেই চলে। সব অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে কর্মসূচি শুরুর আগেই। মূলত এটি একটি অভিনব কৌশল।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, রাতের আঁধারে ব্যাপক অগ্নিসন্ত্রাস চালিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। যেন পরদিন নেতাকর্মীদের মাঠে থাকার কোনো প্রয়োজন না হয়। প্রকৃতপক্ষে চলমান অবরোধ কর্মসূচিতে বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য সমমনা সংগঠনের তেমন কোনো তৎপরতাও চোখে পড়ছে না। ব্যাপক নাশকতার কারণে জনমনে রীতিমতো ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। সেই ভীতি থেকে জনগণ ব্যক্তিগত যানবাহন বের করছেন না। আর দূরপাল্লার ও স্বল্পপাল্লার পরিবহণগুলোও অগ্নিসংযোগ আর ভাঙচুর আতঙ্কে রাস্তায় নামছে না। এটি কর্মসূচি সফল করার অভিনব কৌশল।

দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এমন অভিনব কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে বিএনপি-জামায়াতের হাইকমান্ডের নির্দেশে। তাদের নির্দেশে একের পর এক নাশকতা ও অগ্নিসন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে। অথচ নাশকতাকারীরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অগ্নিসন্ত্রাসের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে অন্ধকার জায়গা ও গলিগুলোকে। যেসব জায়গায় সিসি ক্যামেরা নেই, সেই সব জায়গা দেখে দেখে নাশকতার ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছে। যাতে করে নাশকতাকারীদের সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অন্ধকারে থাকে। তাদের গ্রেপ্তার করতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়। এমনকি দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নাশকতা চালাতে দক্ষ নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনে নাশকতা চালানো হচ্ছে। তারা নাশকতা বা অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটিয়ে আবার নিজ নিজ এলাকায় বা অন্য কোনো এলাকায় আত্মগোপন করছেন।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম জানান, চলমান দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সারা দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকাসহ আশপাশের জেলায় ২৭ প্লাটুনসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ১৫২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত বিজিবি সংখ্যক বিজিবি প্লাটুন স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হওয়ামাত্রই তাদের মাঠে নামানো হবে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, চলমান অবরোধে সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং নাশকতা এড়াতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চলছে। এ ছাড়া ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র‌্যাবের ১৬০টি টহল দল কাজ করছে। আর সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছে ৪৬০টি টহল দল। দূরপাল্লার যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে র‌্যাবের তরফ থেকে এস্কর্ট দেওয়া হচ্ছে। আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আমিনুল হক জানিয়েছেন, বিএনপির ডাকা দেশব্যাপী অবরোধ-হরতালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সারা দেশে ৬৫ হাজার আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির কর্মসূচি ঘিরে পুলিশ হত্যা ও প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা, ভাঙচুর ও প্রতিনিয়ত যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা দায়ের হচ্ছে। গ্রেপ্তার করা হচ্ছে নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com