বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন

থমকে আছে বাণিজ্যিক সিনেমা

ঢাকাই সিনেমার স্বর্ণালী সময়গুলো এখন শুধুই অতীত। যে ইন্ডাস্ট্রিতে এক সময় শতাধিক সিনেমা মুক্তি পেত সেটা কমতে কমতে এখন ৪০-৪৫টিতে নেমে এসেছে। এর মধ্যে ব্যবসা সফল ছবির সংখ্যা খুঁজতে গেলে দেখা যাচ্ছে এক থেকে দুটির বেশি আশা করা মানেই সুদূর কল্পনা মাত্র।

২০২৩ সালের বছর শুরু হয়েছিল ‘ব্ল্যাক ওয়ার : মিশন এক্সট্রিম ২’ সিনেমা দিয়ে। সম্পূর্ণরূপে বাণিজ্যিক উদ্দেশে নির্মিত সিনেমাটি এই বছরের ১৩ জানুয়ারি মুক্তি পায়। তবে অনেক ডাকঢোল পিটিয়ে প্রচার পাওয়া সানী সারোয়ার এবং ফয়সাল আহমেদ পরিচালিত এবং আরিফিন শুভ অভিনীত এই সিনেমাটি আশানুরূপ ব্যবসা করতে ব্যর্থ হয়। অর্থাৎ এবারও ঢাকাই সিনেমার বছর শুরুই হয় ব্যর্থতা দিয়ে। এর পরের সপ্তাহেই মুক্তি পায় আরেকটি বাণিজ্যিক সিনেমা ‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’। সিয়াম-পরীমনি অভিনীত এই সিনেমাটিও ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হয়। তার পরের সপ্তাহে মাত্র ৫টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া ‘সাঁতাও’ সিনেমাটিকে তো দর্শক খুঁজে পেতেই হিমশিম খেতে হয়েছে। তবে গণ-অর্থায়নে নির্মিত এ সিনেমাটি দর্শক ও প্রেক্ষাগৃহের কাছে আগ্রহ সৃষ্টি করতে না পারলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সিনেমাটি ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

এ ছাড়াও চলতি বছওে এখন পর্যন্ত যেসব সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, এর মধ্যে আরও আছে ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’, ‘ভাগ্য’, ‘কথা দিলাম’, ‘মন দিয়েছি তারে’, ‘বুবুজান’, ‘মায়ার জঞ্জাল’, ‘ওরা ৭ জন’, ‘জে কে ১৯৭১’, ‘রেডিও’, ‘লিডার : আমিই বাংলাদেশ’, ‘কিল হিম’, ‘জ্বীন’, ‘শত্রু’, ‘লোকাল’, ‘পাপ : প্রথম চাল’, ‘আদম’, ‘প্রেম প্রীতির বন্ধন’. ‘ময়ূরাক্ষী’, ‘মা’, ‘উনিশ ২০’, ‘সুলতানপুর’, ‘এম আর নাইন’, ‘লালশাড়ি’, ‘প্রিয়তমা’, ‘সুড়ঙ্গ’, ‘প্রহেলিকা’, ‘অন্তর্জাল’, ‘দু:সাহসী খোকা’, ‘মুজিব : একটি জাতির রূপকার’, ‘বৃদ্ধাশ্রম’, ‘অসম্ভব’, ‘আজব ছেলে’, ‘মেঘের কপাট’, ‘যন্ত্রণা’ প্রভৃতি সিনেমা।

মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, শুধুমাত্র ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমারই দুই-একটি ব্যবসা করতে সক্ষম হয়েছে। এটা দেখে এখন সবার মুখে এই একই প্রশ্ন উঠছে, তবে কি ব্যবসায়িকভাবে সফল সিনেমা বলতে শুধু ঈদের সিনেমাই হয়ে গেল? নয়ত বছরের অন্যান্য সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো কেন ব্যবসায়িকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে?

ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমাই শুধু ব্যবসা করতে পারছে, ব্যাপারটি এ রকমও নয়। যে অভিনেতার ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা আছে, যে অভিনেতার দর্শকব্যাংক আছে, দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র তার সিনেমাই ব্যবসা করতে পারছে। এ ছাড়া যেসব অভিনেতা দর্শকপ্রিয়তায় পিছিয়ে আছেন বা নেই, দুই-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের কারও সিনেমাই কিন্তু এ পর্যন্ত ব্যবসা করতে পারেনি। তবে অভিনেতা হিসেবে এখনো পর্যন্ত নিজের জাত চেনাতে না পারলেও ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বিগ বাজেটের সিনেমা বানান বলে ঈদে মুক্তি পাওয়া অনন্ত জলিলের সিনেমাও মোটামুটি ব্যবসা করছে। এবারের ঈদে অবশ্য অনন্ত জলিল প্রযোজিত সিনেমা মুক্তি পায়নি। কিন্তু মুহাম্মদ ইকবালের ‘কিল হিম’ নামের যে সিনেমাটিতে তিনি অভিনয় করেছেন, সেটা তেমন ব্যবসা করতে পারেনি।

২০২৩ সালে ঈদে মুক্তি পাওয়া যেসব সিনেমা ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আছে, শাকিব খানের ‘লিডার : আমিই বাংলাদেশ’, ‘প্রিয়তমা’ এবং আফরান নিশো’র ‘সুড়ঙ্গ’। আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘প্রিয়তমা’ ছবিটির পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ লেখক হিমেল আশরাফ। আর ‘সুড়ঙ্গ’ ছবির পরিচালক রায়হান রাফী। অর্থাৎ বিদায়ী বছরটিতে মাত্র ৩টি সিনেমাই ছিল ব্যবসাসফল। যে সিনেমাগুলো মুক্তি পায় বছরের দুই ঈদে। অথচ ঈদে আরও বেশ কয়টি সিনেমা মুক্তি পেলেও সেগুলো ব্যবসা করতে পারেনি। কোনোটি চূড়ান্তভাবে দর্শকশূন্য ফ্লপও হয়। অথচ, বাংলা সিনেমার সোনালী দিনগুলোতে ঈদে কোনো সিনেমা চূড়ান্তভাবে ফ্লপ হয়েছে এমন চিত্র কখনো দেখা যায়নি।

তবে বর্তমানের মতো ঢাকাই সিনেমার সোনালী দিনগুলোতেও ঈদের সিনেমাই ব্যবসা করেছে সবচেয়ে বেশি। আবার পাশাপাশি বছরের অন্য সময়েও কমবেশি ব্যবসা করেছে। ব্যতিক্রম হিসেবে ঈদের বাইরে গত বছর ‘হাওয়া’ সিনেমাটিই ব্যাপক ব্যবসাসফল ছিল। কালেভদ্রে ছাড়া এখন সেই নিয়মিত ‘সুবাতাস’ বওয়ার দিন পাল্টে গেছে। এখন তো ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমাও মুখ থুবড়ে পড়ছে। সোনালী দিনগুলোতেও যাদের তারকামূল্য ছিল সবচেয়ে বেশি তাদের সিনেমাই ঈদে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করেছে। এ দিক থেকে অবশ্য এখনো সেই আগের হিসাবটিই বহালতবিয়তেই আছে। এখনো যাদের তারকামূল্য সবচেয়ে বেশি ঈদে তাদের সিনেমাই সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করছে। সেই হিসাবে এখনো ঈদে শাকিব খানের সিনেমা থাকা মানেই অন্য কোনো অভিনেতার সিনেমা সেখানে কোনোভাবেই লড়াই করতে না পারা। তবে এবারের এক ঈদে অবশ্য নতুন সিনে অভিনেতা হিসেবে ছোট পর্দার সুপারস্টার আফরান নিশো শাকিব খানের সঙ্গে ভালোই পাল্লা দিতে পেরেছেন। যা এর আগে আর কোনো অভিনেতাকেই দেখা যায়নি।

অথচ ঈদের বাইরে মুক্তি পাওয়া বেশ কয়টি বিগ বাজেটের সিনেমা মুক্তি পায়। সেগুলোও ব্যবসায়িকভাবে চরমভাবে ধরাশায়ী হয়। এই সিনেমাগুলোর মধ্যে আছে, দীপঙ্কর দীপনের ‘অন্তর্জাল’, সানী সারোয়ারের ‘ব্ল্যাক ওয়ার : মিশন এক্সট্রিম ২’, আবু রায়হান জুয়েলের ‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’ প্রভৃতি।

যারা বলছিলেন, ‘ঢাকাই সিনেমায় আবার সুবাতাস বইছে’- তারা আসলে এটা খেয়াল করে দেখেনটি যে, এই ‘সুবাতাস’ সেই চিরাচরিত ‘সুবাতাস’ই। যা আগে থেকেই প্রতি ঈদে কমবেশি বয়ে যায়। আবার সুবাতাস বওয়া এই সিনেমার সবই সেই সিনেমা যারা দর্শকপ্রিয় তারকা। এ ছাড়া ‘হাওয়া’র মতো ‘গল্পই সুপারস্টার’ হয়ে দেখা না দিলে অন্য কোনো গড়পড়তা তারকাদের সিনেমায় এই সুবাতাস বইছে না। তাই বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা গাজী রাকায়েত হোসেন বলেন, আমাদের সিনেমায় এখন যেসব উপচেপড়া দর্শক দেখা যাচ্ছে তারা ‘উইন্টার বার্ড’ বা শীতের অতিথি পাখির মতো। যাদের বছরে একবার শুধু দেখা যায়। এ ছাড়া আর কখনো দেখা যায় না। অর্থাৎ এই শীতের অতিথি পাখির মতো দর্শকরা শুধু ঈদেই সিনেমা দেখেন। শুধু তা-ই নয়, তারা শুধু দর্শকপ্রিয় তারকাদের সিনেমাই দেখেন। বাংলাদেশে একসময়ে যেসব দর্শক প্রতি মাসেই দুই-একটি সিনেমা দেখতো সেই দর্শক এখন আর নেই। তারা চলে গেছে। কারণ, সিনেমা দেখার সেই এনভায়রনমেন্টও এখন আর নেই। এখন দর্শক বলতে আমরা বুঝি শুধু সিনেপ্লেক্সের দর্শকই।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com