শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ১০:৪৯ পূর্বাহ্ন

নতুন বছরে বড় চ্যালেঞ্জ জ্বালানি খাত ব্যবস্থাপনা

সবকিছু ঠিক থাকলে নতুন বছরের শুরুতেই অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে দেওয়া শর্ত অনুযায়ী নির্বাচনের পরই দেশের বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম সমন্বয় করবে সরকার। তবে ডলারের চড়া দাম, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ও ঋণসহ দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পরিশোধের চাপ সামাল দিতে হবে জ্বালানি বিভাগকে। এ অবস্থায় নতুন বছরে দাম সমন্বয় করা হলে মূল্যস্ফীতিসহ ভোক্তার সামগ্রিক ব্যয় কয়েকগুণ বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, নির্বাচন পরবর্তী অর্থনীতিতে সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা। ডলারের উচ্চমান ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা আমদানিনির্ভর এ খাতের পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। উচ্চ আমদানি মূল্যের সঙ্গে দাম সমন্বয়ের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। তবে দাম কতটা বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে সেটাই দেখার বিষয়। নতুন বছরে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রিজার্ভের চাপ কমাতে এ খাতে সু-ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে মুনাফা না করে সহনীয় দামে জ্বালানি সরবরাহ করতে হবে বলেও মনে করেন জ্বালানি বিশ্লেষক ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম. শামসুল আলম।

যায়যায়দিনকে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি ছাড়া অর্থনীতি এক মুহূর্ত চলবে না। এছাড়াও নতুন কর্মসংস্থান ও জিডিপির অন্যতম রসদ জ্বালানি নিশ্চয়তা। তাই সরকারকে এ খাতে সুশাসন ও সু-ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতেই হবে। তা না হলে নতুন বছরে উচ্চ উৎপাদন খরচ মানুষের জীবন যাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিকভাবে মোটা দাগে নতুন সরকারকে জ্বালানি খাতে ৪টি চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে হবে। এর মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী তুলনামূলক সাশ্রয়ী উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি, বর্তমান ডলার মূল্য ও রিজার্ভ পরিস্থিতিতে এর ব্যয় ও বকেয়া পরিশোধ (ঋণ, দেশীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি ও বিদেশি রপ্তানিকারকদের পাওনা), জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণ কৌশলসহ এখাতে বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধন।

জ্বালানির দাম সমন্বয়:আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ চুক্তির শর্তে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি তুলে নিতে বলা হয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে গত বছর আগস্টে জ্বালানি তেল ও চলতি বছরের শুরুতে গ্যাস ও ৩ ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানো হয়েছিল। তবে মে থেকে আইএমএফ’র চাপ থাকলেও নির্বাচন পর্যন্ত দাম সমন্বয় না করার জন্য সময় চাওয়া হয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় আইএমএফ এতে রাজি হয়। সর্বশেষ ১৩ ডিসেম্বর ঋণের আরও একটি কিস্তির অর্থ ছাড় করে সংস্থাটি। ফলে জানুয়ারিতেই শর্ত অনুযায়ী দাম সমন্বয় করা হতে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

এর আগে অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার বলেছিলেন, ‘সেপ্টেম্বরে আইএমএফ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশকে তিন মাস সময় দিতে রাজি হয়, তবে জানুয়ারিতে নির্বাচন শেষ হলেই দাম সমন্বয় করা হবে এমন প্রতিশ্রুতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে।’

অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ডিসেম্বরের পর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের বাজার মূল্য নির্ধারণে একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা হবে। ইতোমধ্যে পেট্রোবাংলা একটি ফর্মুলা তৈরি করে জ্বালানি বিভাগে জমা দিয়েছে। ফর্মুলায় তিন মাস অথবা এক মাস পর পর ভোক্তা পর্যায়ে দাম নির্ধারণের বিষয়ে বলা হয়েছে। জানুয়ারিতে এটি কার্যকর হলে বর্তমান ডলার মূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হিসেবে লিটারে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে।

সে হিসেবে জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণে নির্বাহী আদেশের পরিবর্তে আবারও গণশুনানি চালুর পরামর্শ দিয়েছেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা। এ ক্ষেত্রে দাম বাড়লেও জনগণ এর ন্যায্যতা বিচার করে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে সাহায্য করবে। আর যদি গণশুনানি ছাড়াই আগের মতো নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানো হয় তাহলে সংকট আরও বাড়তে পারে। এছাড়াও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) তার ক্ষমতা প্রয়োগে স্বাধীন রাখতে হবে। গণশুনানির মাধ্যমে দাম নির্ধারণই মূলত এ খাতের প্রথম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকটের মধ্যেই সরকার প্রতি মাসে স্পট থেকে গড়ে প্রায় ১ কার্র্গো করে এলএনজি আমদানি চুক্তি করেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আমদানি করা গেলে এর অর্ধেক ব্যয় হবে। যদিও এ বছর কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি দুটি নতুন চুক্তি করেছে সরকার। কিন্তু সরবরাহ শুরু হবে ২০২৬ সাল থেকে। এ জন্য এলএনজিসহ জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানিতে উৎস নির্বাচনে আরও অনুসন্ধানী হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

এর বাইরে ২০২৪ সালের জন্য প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার তেল আমদানি চুক্তি করেছে সরকার। জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, আগামী বছরে জ্বালানি তেল আমদানি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে এ খাতে ব্যয় ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। একইভাবে নতুন বেশ কয়েকটি কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়ায় কয়লা ও এলএনজি বাবদও ব্যয় ছাড়াবে প্রায় ৬০ হাজার কেটি টাকা। বর্তমান ডলার মূল্যের কারণে বিগত অর্থবছরগুলোর তুলনায় একই পরিমাণ জ্বালানিতে ২০ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। বিদ্যমান জ্বালানি নীতিতে এ খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানো এক কথায় অসম্ভব বলে মনে করেন এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে অর্থনীতি সুরক্ষিত থাকবে না। তাই সবার আগে সরকারকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আইন ২০১০ বাতিল কিংবা বড় আকারে সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ আমদানি বাজার সাধ্যের মধ্যে না-ই থাকতে পারে। এর বিকল্প হিসেবে জনগণের ওপর বাড়তি ব্যয় চাপিয়ে দেওয়া উচিত হবে না।’

এই বিশ্লেষকের মতে- বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে জ্বালানি খাত বাণিজ্যিক থাকলে এই বিশাল ব্যয় সাধারণ মানুষ বইতে পারবে না। তাই আইএমএফ বা যে কোনো দাতা গোষ্ঠীর সব শর্ত মেনে নিতে হবেÑ এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সবার আগে জনগণকে ন্যায্য ও সহনীয় মূল্যে জ্বালানি নিশ্চয়তা, পরোক্ষভাবে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে বাজার সহনীয় রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভর্তুকি দিয়ে হলেও এ খাতে দাম সহনীয় রাখা প্রয়োজন। সরকার তার আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে জ্বালানিকে তালিকা থেকে বাদ দিলেই সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, কর পরিশোধের পরও গত অর্থবছরে শুধু জ্বালানি তেল থেকেই ৬ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করছে সরকার। এ জন্য ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়াতে হয়েছে ৪০ শতাংশ। ফলে বিদ্যুৎসহ সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com