শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ০৮:৫৩ পূর্বাহ্ন

দেশাত্মবোধক গানের আকাল

একটি দেশ ও তার জাতির বিরাট সাফল্যকে মহিমান্বিত করে তুলতে দেশপ্রেমমূলক গানের বিকল্প নেই। একটি দেশাত্মবোধক গান অন্তরের গভীর থেকে কী যে প্রভাব ফেলে, সেটা দেখা গেছে ভারতের প্রথম মহাকাশচারীকে যখন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলেন ‘উপর থেকে ভারতকে কেমন লাগল’- তখন তিনি মনের একটি ভাবে প্রকাশ করার জন্য তার জবাব দিতে বেছে নেন কবি ইকবালের ভারতস্তুতিগাঁথামূলক দেশাত্মবোধক গান- ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা হিন্দুস্তা হামারা’।

এই গানটি লেখা হয়েছিল যখন গোটা ভারত উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশের পদতলে। তবে ব্রিটিশের আগে-পরে অনেক ভাষায় অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান হয়েছে এই উপমহাদেশে। বাংলা ভাষায়ও বহু দেশাত্মবোধক গান হয়েছে, যার কোনো কোনোটি কালজয়ী ও চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। আজও বারবার ঘুরেফিরে আসছে সেসব গান শিল্পীদের কণ্ঠে-কণ্ঠে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।

এর মধ্যে দেশাত্মবোধক গান সবচেয়ে বেশি অনুরণিত হয় ২৬ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে। যে গান মানুষের মনের কথা বলে, ভালোলাগা, ভালোবাসার কথা বলে, জীবনযুদ্ধে বেপথ মানুষকে জাগিয়ে তুলতে নতুন করে উদ্দীপনা দেয়। জনশ্রুতি আছে, মোগল আমলে সম্রাট আকবরের দরবারের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ তানসেন গান গেয়ে বৃষ্টি নামাতে পারতেন। প্রত্যুষে ফুল ফোটাতে পারতেন। একটি খাঁটি দেশাত্মবোধক গান এমনই।

বাংলা ভাষায় বহু আঙ্গিকের দারুণ বৈচিত্র্যময় গান হয়েছে। পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া, জারি-সারি, টপ্পা, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, লালনগীতি, পঞ্চকবির গান, লোকগান, নানান উপজাতির গান ও দেশাত্মবোধক গানের সমহারে বাংলা গান ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। বিভিন্ন যুগসন্ধিক্ষণে, সংকটকালে, যুদ্ধে দেশাত্মবোধক গান আমাদের যেমন সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে, তেমন দেশের প্রতি অকৃত্রিম প্রেমও জুগিয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ’৪৭-এর দেশভাগ, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি অর্জনে দেশাত্মবোধক গান আমাদের একটি জাতি হিসেবে গঠনে অশেষ ঋণী করেছে। রবিঠাকুরের ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা’, অতুল প্রসাদের ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়েছে। রজনীকান্তের ‘মায়ের দেয়া মোটা কাপড়’ স্বদেশি আন্দোলনে, ব্রিটিশ পণ্য বর্জনে জনমত গঠনে, নজরুলের ‘কারার ওই লৌহ কপাট’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি’ গানগুলো ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রেরণা হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।

এসব দেশাত্মবোধক গানের প্রতিটি বর্ণে বর্ণে দেশপ্রেম থাকায় ওইসব গানের ভাণ্ডার থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি। যা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছিল।

যে গান দেশ ও দশের কথা বলে, দেশের মানুষকে একই পাটাতনে আসার বলে, অশুভ শক্তিকে বিতারিত করার কথা বলে, তেমন প্রেরণামূলক গানই দেশাত্মবোধক গান। এই গান অশুভ শক্তিকে দমনের জন্য, যুদ্ধযাত্রার জন্য, যুদ্ধজয়ের জন্য, দেশ গঠনের জন্য মানুষকে একটা বাড়তি শক্তি এনে দেয়। দেশাত্মবোধক গানের সার্থকতা এখানেই। তবে বাংলাদেশের দেশাত্মবোধক গান যে এখনো একই বৃত্তে আটকে আছে, এটা সঙ্গীতের অনেকেই এখন বলতে শুরু করছেন। যে কারণে এখন দেশাত্মবোধক গান বলতে শুধু ২৬ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বর এলেই চর্চা শুরু হয়ে যায়। বছরের বাকি মাসগুলোর উপযোগী কোনো দেশাত্মবোধক গানই হয় না। এ নিয়ে যারা মঞ্চে গান করেন, তাদের অনেককে প্রশ্ন করা হয় যায়যায়দিনের পক্ষ থেকে। তারা সবাই বলেন, এখন মঞ্চে যা গান হয় সেখানে কোনো দেশাত্মবোধক গান হয়ই না বলতে গেলে। আর যারা শিল্পী তারাও তাদের সীমাবদ্ধতার কারণে দেশাত্মবোধক গান গাইতে পারেন। কারণ, আয়োজকরা নাকি আগে থেকেই নির্দিষ্ট করে দেন কোন কোন গান গাইতে হবে। সে অনুযায়ীই মঞ্চের শিল্পীরা তাদের গান করেন।

এ প্রসঙ্গে বাউল শিল্পী শফি মণ্ডলকে প্রশ্ন করা হলে তিনি অত্যন্ত বিনয় ও দুঃখের সঙ্গে জানান, ‘আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমরা মঞ্চে দেশাত্মবোধক গান করি না। আপনি প্রশ্নটি করাতেই আমরা মনে হলো আসলেই তো আমরা কেউ মঞ্চে দেশাত্মবোধক গান করি না। আপনি খুবই ভালো একটি বিষয়ে টাচ করলেন। আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, গত দুই দশক ধরে আমাদের দেশের গান কমে গেছে। দেশের গানের সংখ্যা খুবই কম। আগে প্রতিটি স্টেজ শোই দেশাত্মবোধক গান দিয়ে শুরু হতো। এখন সেই প্রচলন নেই বললেই চলে। ঝুঁকে পড়েছে সবাই বাউল গান, লোকসঙ্গীতের প্রতি। সবাই খালি বাহবা নিতে চাচ্ছে। ওই দিকে কেউ যেতে চাচ্ছে না। এখন আমি আপনাদের মাধ্যমে আবেদন জানাব, যিনি যে গানই করুন, বাউল, রবীন্দ্র, নজরুল, আধুনিক- প্রত্যেকেই যেন প্রতিটি শোতেই একটা করে হলেও দেশাত্মবোধক গান করেন। তারা যদি এগিয়ে আসেন, আমাদের দেশপ্রেমটাও বাড়বে। আপনার এই কথাটি তোলার পর থেকে আমি নিজেও এই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি আমিও প্রতিটি অনুষ্ঠানে অন্তত একটি হলেও দেশাত্মবোধক গান করব। এ না হলে তো দেশ থেকে দেশপ্রেমটিই হারিয়ে যাবে।’

শফি মণ্ডল আরও বলেন, ‘যারা শ্রোতা আছেন, তারাও দেশাত্মবোধক গান গাইতে তেমন আবদার করেন না। মঞ্চে মূলত লোকগান ও জনপ্রিয় আধুনিক গানগুলোই বেশি গাওয়া হয়। শ্রোতারাও এই গানগুলো গাইতে বলেন।’ এ কথা বলে শফি মণ্ডল বলেন, ‘এখন থেকে আমি নিজে থেকেই মঞ্চে দুই-একটি দেশাত্মবোধক গান দিয়ে আমার গানের শুরু করব।’

প্রয়াত বরেণ্য গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কন্যা দিঠি আনোয়ার বলেন, ‘এখন দেশাত্মবোধক গান হবে কোথায়। শুধু স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবস এলেই দেশাত্মবোধক গান গাওয়া হয়। আর বছরের বাকি মাসগুলোতে দেশাত্মবোধক গান বলতে গেলে একেবারেই হয় না। ফলে ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে যেসব দেশাত্মবোধক গান হয়, সবই পুরনো। নতুন কোনো দেশাত্মবোধক গান তেমন একটা হচ্ছে না। গাওয়াও হচ্ছে না।’

দেশাত্মবোধক গান যে শুধু যুদ্ধ ও সংকটেই গাওয়া হবে, এমন নয়। দেশের উন্নয়ন, গঠন ও পুনর্গঠনের জন্যও যে দেশাত্মবোধক গান হতে পারে, এটা আমাদের কণ্ঠশিল্পী, গীতিকবি ও আয়োজকরা ভুলেই যান। একসময় যে দেশকে সম্প্রতি প্রয়াত হওয়া হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’- সেটার জবাবে আজ বাংলাদেশ যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে উন্নয়নের সাফল্য দেখাচ্ছে, এ নিয়েও হতে পারে অবিস্মরণীয় দেশাত্মবোধক গান। গাওয়া হতে পারে বছরজুড়েই। দেশাত্মবোধক গান হতে পারে যাবতীয় অন্যায়, অনাচার, অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধেও। কিন্তু দেশে যত কনসার্ট হয়, স্টেজ শো হয়- সেখানে যেন দেশের গানের কোনো প্রবেশাধিকারই নেই। অথচ রক গান, পপ গানেও একসময় গাওয়া হয়েছে প্রচুর দেশপ্রেম, মানবপ্রেমমূলক গান। সেই রক, পপ গানেও দেশপ্রেম নেই।

অথচ যে গান উন্নয়নের কথা বলতে জানে, উন্নয়নের নতুন নতুন তথ্য দিতে জানে, দেশের মানুষকে উন্নয়নের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে অনুপ্রেরণা দিতে জানে, দেশগড়ার জন্য মনের মধ্যে ঘুমন্ত মানুষটিকে জাগিয়ে তুলতে জানে- আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সেখানে এমন দেশাত্মবোধক গানের চেয়ে ভালো গান কী আর হতে পারে!

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com