দমতে চাই না, এ দায়িত্বে থাকলে রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করব

দমতে চাই না, এ দায়িত্বে থাকলে রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করব

0

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : প্রকাশের পর বিতর্কের কারণে স্থগিত হয়ে যাওয়া রাজাকারের তালিকা প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘আমি বল্লার গায়ে হাত দিয়েছি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যে কেউ সমালোচনা করতেই পারেন। তবে আমি সাহস হারাইনি। অন্য যার যতটুকুই সম্পৃক্ততা থাকুক না কেন, মন্ত্রী হিসেবে ভুলত্রুটির সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব আমি এককভাবেই নিয়েছি। এর জন্য ইতিমধ্যে দুঃখ প্রকাশও করেছি। যাই হোক, ভুল থেকেই মানুষ শিক্ষা নেয়। আমি দমতে চাই না, মনোবল ঠিক আছে। যদি এই দায়িত্বে থাকি, তাহলে রাজাকারের তালিকা ইনশাআল্লাহ প্রকাশ করে যাব।’

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয় পার্টি-জেপির উদ্যোগে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘পেনড্রাইভে যে তালিকা পেয়েছি, সরল বিশ্বাস থেকে সেটিই প্রকাশ করেছিলাম। আমার নাম রাজাকারের তালিকায় উঠলে যেরকম ব্যথিত হতাম, একইভাবে সহকর্মীদের নাম সেই তালিকায় ওঠায় আমি সমভাবে ব্যথিত। তবে যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে বলতে চায়, রাজাকারদের রাজাকার বলার সাহস আর কেউ করবে না, সেই সুযোগ তাদের দিতে চাই না। সমস্ত সাবধানতা অবলম্বন করে রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করার চেষ্টা করব। যারা তিলকে তাল বানিয়ে অপরাজনীতি করার চেষ্টা করছে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতির ঐক্যবদ্ধ শক্তির মাধ্যমে তাদের মোকাবিলা করতে হবে।’

আ ক ম মোজাম্মেল আরো বলেন, ‘বিজয় মানে আমরা জয়লাভ করেছি, আরেক দল পরাজিত হয়েছে। কয়েক লাখ লোক ছাড়া অন্য সবাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সেদিন ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। যারা পরাজিত হয়েছে, নতুন প্রজন্ম তাদের নাম জানে না। ’৭১-এ জামায়াত, আলশামস, আলবদর স্বপ্রণোদিত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সোর্স হিসেবে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যা, লুট, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগে তারাও শরিক হয়েছিল। এত বড়ো আন্দোলনে কত লোক জীবন দিয়েছেন, কতজন নির্যাতিত হয়েছেন, নতুন প্রজন্ম তা জানে না। তরুণ প্রজন্ম হয়তো মনে করতে পারে, বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীন হয়েছে। না, আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। নতুন প্রজন্মকে সেটি জানানোর জন্যই রাজাকারের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

জাতীয় পার্টি-জেপির ভূমিকার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, বিশেষ করে গত এক যুগে যত রাজনৈতিক সংকট, প্রতিটিতেই জেপির ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রাখতে জেপির ভূমিকা ইতিহাসে উল্লেখ থাকবে। বড়ো বা ছোটো দল বিষয় নয়, বিষয়টা হলো সিদ্ধান্তটা কী ছিল। রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে জেপির ভূমিকায় কোনো অস্পষ্টতা ছিল না।

যারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, তাদের নাম কিন্তু কেউ বলছেন না :আনোয়ার হোসেন মঞ্জু

আলোচনা সভায় সভাপতিত্বকারী ও জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, রাজাকারের যে তালিকা নিয়ে এত কথা হচ্ছে, সেটি কোথা থেকে এলো? থানার ওসি, ইউএনও, ডিসি, এসপি, উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিবসহ বহু হাত ঘুরে এই তালিকা মন্ত্রীর কাছে গেছে। এখন তালিকার জন্য শুধু মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়কে দায়ী করা হচ্ছে। মন্ত্রীর কাছে যারা এই ভুল তালিকা সুপারিশ করলেন, তাদের নাম কোথাও দেখছি না। পত্রপত্রিকায় শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নামই দেখছি। কিন্তু মাঝখানের লোকগুলো গেল কই? রাজাকারের সঠিক তালিকা প্রণয়নে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন তাদের নাম কিন্তু কেউ বলছেন না, পত্রিকায়ও তাদের নাম দেখি না। হুজুগে বাঙালি, হুজুগ ছাড়তে হবে। আলোচনা-সমালোচনা গঠনমূলক হতে হবে।

এই প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, রাজাকারদের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ওঠায় যারা কষ্ট পেয়েছেন কিংবা সংক্ষুব্ধ হয়েছেন সেটি অবশ্যই যৌক্তিক। এজন্য আমরাও দুঃখ প্রকাশ করি। কিন্তু মন্ত্রীর কাছে ফাইল আসার আগে আরো দশ দুয়ার ঘুরে। তাহলে বাকি নয় দুয়ারের কথা কেন বলা হবে না? ভাবটা এমন যেন, মন্ত্রী একাই সব করেছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সমালোচনা করুন, ঠিক আছে, কিন্তু নিচের লোকগুলোর নামও বলুন। কীসের বিনিময়ে এরকম হয়েছে, সেটি খোঁজার চেষ্টা করুন।

মন্ত্রণালয় পরিচালনায় নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, এতগুলো হাত ঘুরে যখন একটি ফাইল মন্ত্রীর কাছে আসে, আর মন্ত্রী যখন সেটিতে স্বাক্ষর করেন— তখন মন্ত্রী একা সেজন্য দায়ী থাকবেন কেন? আমাদের সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কিংবা অধীনস্থদের মাধ্যমে সরকার পরিচালনা করবেন, প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করতে ও পরামর্শ দিতে মন্ত্রিসভা রাখা হয়। কাজেই যারা শুধু মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়কে দায়ী করেন, তাদেরকে অনুরোধ করব—প্রশাসনকে একটু বোঝেন, ফাইল কীভাবে ওঠানামা করে সেটি জানুন। মন্ত্রী একাই যদি সব দেখেন, তাহলে অন্যরা কী করেন! সেজন্যই বলি, রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধা ও যোগ্যতা দরকার।

জেপি চেয়ারম্যান বলেন, থানার ওসি কিংবা এসপিসহ বিভিন্ন জনের কাছে লাখ লাখ দলিল না থাকলেও কিছু দলিল তো আছে। আমি যে এলাকা থেকে নির্বাচন করি, নদীর এপার-ওপার সামান্য দূরত্ব, আমরা একে অপরকে চিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় কে কোথায় ছিলেন, এখন তাদেরকে না চেনার কোনো কারণ নেই। এখন দেখছি সোনার তৈরি ‘নৌকা’ কিংবা ‘মেডেল’ দিয়ে অনেকে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যান। এমনকি তালিকায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার ওপরে তাদের নাম থাকে। যার দাদা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন, বাবা ছিলেন রাজাকার—তার ছেলে এখন একটি বড়ো জেলার আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক—অনেক স্থানে এমন ঘটনাও ঘটেছে। তিনি বলেন, ’৭২/’৭৩ সালের তুলনায় বর্তমানে আমরা অনেক উচ্চপর্যায়ে আছি। তবে ’৭২/’৭৩ সালে যেটা পয়সা দিয়ে সংগ্রহ করা যেত না, এখন সেটা সংগ্রহ করা যায়। যারা মাঠে-ঘাটে যাওয়া-আসা করেন তারা সেটা জানেন।

আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরো বলেন, আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। কেউ কেউ বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশে সমতা আসেনি। বিষয়টা তা নয়, সুযোগটা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

ষড়যন্ত্র ও বাধা মোকাবিলায় ঐক্যের বিকল্প নেই : শেখ শহীদ

আলোচনা সভায় জেপির সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, একটি জাতির স্বাধীনতাসংগ্রাম আর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য আছে। টাইপরাইটার দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এখন সম্মুখপানে এগোতে হলে উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে হবে যেখানে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থাকবে না। থাকবে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্য। এই যাত্রাপথে বাধা ও ষড়যন্ত্র থাকবে। সেটিকে মোকাবিলায় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

জেপির নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী বলেন, এদেশে অনেকে মন্ত্রী, এমপি, সচিব এবং আরো অনেক কিছু হবেন। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সুযোগ আর হবে না। ভুলত্রুটি শুধরে প্রকৃত রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ, একটি ঘৃণাস্তম্ভ নির্মাণ এবং সশস্ত্র বাহিনীর বাইরেও যারা মুক্তিযোদ্ধা, তাদেরকে প্রয়োজনে নতুন করে খেতাবে ভূষিত করার দাবি জানান তিনি।

জেপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিলের পরিচালনায় আলোচনা সভায় আবির আহাদও বক্তব্য রাখেন। সভায় অন্যদের মধ্যে ছিলেন—জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহিম, এ এইচ সালাহউদ্দিন মাহমুদ, এজাজ আহমেদ মুক্তা ও আবু সাঈদ খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক এম সালাহউদ্দিন আহমেদ, সহসাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় যুবসংহতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল, জেপির সহসাধারণ সম্পাদক কে এম মুজিবুর রহমান মজনু, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান প্রমুখ।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

কোন কমেন্ট নেই

উত্তর দিন