সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের খলনায়ক

সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের খলনায়ক

0

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : ঋণের নামে শুধু ব্যাংক লুট নয়, অভিনব উপায়ে মূল্যবান সরকারি সম্পত্তিও হাতিয়ে নিয়েছেন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক এমডি পিকে হালদার (প্রশান্ত কুমার হালদার)। জাল দলিল তৈরি থেকে শুরু করে রেজিস্ট্রেশনের প্রতিটি ধাপে তাকে সহায়তা করেন খোদ ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

এছাড়া আদালতের দুর্নীতিবাজ কর্মচারী ও স্থানীয় দখলবাজ চক্র বাড়তি সুবিধা পেয়ে হাত মেলায় পিকে হালদারের সঙ্গে। অনেকটা অবিশ্বাস্য হলেও যাদের একজনের ব্যাংক হিসাবে মিলেছে ২৬ কোটি টাকা। রাজধানীর অদূরে রূপগঞ্জে জমি হাতিয়ে নেয়ার এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য।

সূত্র জানায়, জালিয়াতির মাধ্যমে ১শ’ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের সরকারি সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেয়ার ঘটনায় পিকে হালদারের প্রধান সহযোগী ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা জাহেদুল আবেদীন ও রূপগঞ্জের তারাব পৌরসভার বাসিন্দা সদরুদ্দীন চৌধুরীর ছেলে নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

এছাড়া জমি দখলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পিকে হালদারকে সহায়তা করেন জনৈক মজনু। রূপগঞ্জের আধুরিয়া মৌজায় সরকারি ছয় একর সাতষট্টি শতাংশ জমি ভুয়া দলিলে রেজিস্ট্রি করা হয়। এ জমির বর্তমান বাজার মূল্য অন্তত ১২০ কোটি টাকা।

জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি লিখে নেয়ার এ ঘটনা অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়া একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তরফেও বিষয়টির ছায়া অনুসন্ধান চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন পদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা সরকারি জমিটি উদ্ধারের জন্য ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র সংগ্রহ করেছি।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে ডেকে ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জালিয়াতির বিস্তারিত তুলে ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনেও শিগগিরই চিঠি দেয়া হচ্ছে।’

সূত্র জানায়, লিজকৃত সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি নামে দখলের সঙ্গে পিকে হালদারের সঙ্গে একটি শক্তিশালী চক্র জড়িত। ঘটনার নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়েন কয়েকজন প্রভাবশালী। এ কারণে আদালতের বারান্দা থেকে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তির অনুকূলে রেজিস্ট্রি করতে পিকে হালদারকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।

সূত্র বলছে, গত কয়েক বছরে রূপগঞ্জের বেশ কয়েকটি মৌজায় বিপুল পরিমাণ জমি কেনেন পিকে হালদার। জমি কেনাবেচার সূত্রে তার সঙ্গে নজরুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। পরিচয়ের সূত্র ধরে তৈরি হয় এক ধরনের বিশ্বস্ততা।

পরে পিকে হালদার জানতে পারেন, নজরুল ইসলাম চৌধুরী সরকারের অর্পিত সম্পত্তির প্রায় ৭ একর জমি লিজ নিয়ে ভোগদখল করছেন। জমিটি দেখেই তিনি সেটি একেবারে নিজের করায়ত্তে নিতে চান। কিন্তু প্রশ্ন হল, কিভাবে। নজরুল ইসলামের এমন প্রশ্নের উত্তর অনেকটা সাবলীলভাবে দেন পিকে হালদার।

তিনি বলেন, এটি তার কাছে একেবারে মামুলি বিষয়। এরপর তিনি সরকারি এই জমির জাল কাগজপত্র তৈরি করে ভুয়া মালিকানা সাজান। পরিকল্পনা অনুযায়ী সব পক্ষকে ম্যানেজ করে আদালতের মাধ্যমে রাতারাতি সরকারি জমি হয়ে যায় ব্যক্তির। এরপর সাজানো ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি সাবকবলা দলিল মূলে কিনে নেন।

এছাড়া এসব মূল্যবান জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে তার কখনও টাকা নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। জমি কেনার পর ব্যাংকে বন্ধক রেখে জমির বাস্তব দামের চেয়ে কয়েকগুণ ঋণ নিয়ে নিতেন। বলা যায়, মাছের তেলে মাছ ভাজা।

সরকারি জমি দখলের বর্ণনা দিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশ্বস্ত সূত্রটি জানায়, পিকে হালদার আধুরিয়া মৌজায় সরকারি জমিটি নিজের নামে লিখে নিতে অভিনব ফন্দি আঁটেন। প্রথমে জাল কাগজপত্রের ভিত্তিতে নজরুলের শ্বশুর মিয়াজ উদ্দিনকে ভুয়া মালিক সাজিয়ে আদালতে মামলা করা হয়।

সব কাগজপত্র ভুয়া হলেও রহস্যজনক কারণে মামলার রায় আসে জালিয়াত চক্রের পক্ষে। এ মামলায় সরকার পক্ষ যেন অনেকটা স্বেচ্ছায় হেরে যান। এক পর্যায়ে মিয়াজ উদ্দিনকে জমির মালিক দেখিয়ে ডিগ্রি জারি হয়। পরে পিকে হালদার মিয়াজ উদ্দিনের কাছ থেকে নিজের নামে জমিটি লিখে নেন।

২০১৬ সালের ২৪ জুলাই ঢাকার সাবরেজিস্ট্রার অফিস থেকে তার নামে এ সংক্রান্ত দলিল রেজিস্ট্রি হয় (দলিল নম্বর ৫৬৮৩, খতিয়ান নম্বর ১২৬৯, দাগ নম্বর-এসএ৭২৯ আরএস ৬৪৩)।

ঋণ কেলেঙ্কারির দায়ে পিকে হালদারের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর সরকারি জমি আত্মসাতের অনুসন্ধান শুরু হয়। ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে পিকে হালদারের সহযোগী নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে জিজ্ঞাসাবাদে নজরুল নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘সরকারি জমিটি দখলের মূল নায়ক পিকে হালদার।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম চৌধুরী মঙ্গলবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার স্কুল বন্ধু জাহেদুল আবেদীনের মাধ্যমে পিকে হালদারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। পরিচয়ের শুরুতে আমি শুধু জানতাম তিনি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের একজন বড় অফিসার। পরে বুঝতে পারি, তিনি সাধারণ লোক নন।

অনেক উপর মহলে তার যোগাযোগ রয়েছে। প্রভাবশালী লোকজনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পিকে হালদার ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন এমন বিষয় আমাদের জানা ছিল না। সরকারি সম্পত্তি দখলের সঙ্গেও আমরা জড়িত নই।’

সূত্র জানায়, নজরুল ইসলাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও জালিয়াতির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা অনেকটাই প্রমাণিত। এছাড়া ব্যাংকিং সংক্রান্ত বিভিন্ন দলিলপত্রে এটাও প্রমাণিত যে, পিকে হালদারের সঙ্গে তার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। নজরুলের নামে কয়েকটি কোম্পানিও খোলেন পিকে হালদার।

তার নামে খোলা একটি কোম্পানির অ্যাকাউন্টে অজ্ঞাত স্থান থেকে ২৬ কোটি টাকা জমা হয়। এ টাকা পরে অন্যত্র স্থানান্তর করে নেয়া হয়। এভাবে আরও একাধিক ব্যাংকে নজরুলের নামে জাল তথ্য দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সূত্র বলছে, অনেকটা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির স্টাইলে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেন পিকে হালদার। ব্যাংক খাতের লুটেরা হিসেবে পরিচিত একটি শিল্প গ্রুপের ছত্রছায়ায় থেকে রীতিমতো ব্যাংক লুটের রাজ্য খুলে বসেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকসহ প্রভাবশালী মহলে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে পিকে হালদারের অপকর্মের খবর দীর্ঘদিন চেপে রাখা হয়। কিন্তু সম্প্রতি পিকে হালদারের সঙ্গে চট্টগ্রামভিত্তিক প্রভাবশালী শিল্প গ্রুপটির কর্ণধারদের দ্বন্দ্ব শুরু হলে অর্থ লোপাটের খবর সামনে আসে।

দুদকও হঠাৎ করে এ বিষয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। কেউ কেউ বলছেন, স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণেই পিকে হালদারকে ধরিয়ে দিয়েছে ব্যাংক খাতের প্রভাবশালী একটি শিল্প গ্রুপ।

দুদক সূত্র জানায়, পিকে হালদার বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আগে ব্যাংক লুটের বেশির ভাগ টাকা ভারত ও সিঙ্গাপুরে পাচার করেন তিনি। দেশের অভ্যন্তরে তার এখন তেমন কিছুই নেই।

পরিত্যক্ত অবস্থায় কয়েকটি প্লট ও কিছু জমি থাকলেও তা একাধিক ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ। পিকে হালদারের পরিবারের সদস্যরাও ইতিমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানি থেকে পিকে হালদার ও তার কয়েকটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেয়া হয়। যার পরিমাণ ৩ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে পিকের তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা হয় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বাকি টাকার মধ্যে প্রশান্ত কুমার হালদারের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা হয় ২৪০ কোটি এবং তার মা লীলাবতী হালদারের অ্যাকাউন্টে জমা হয় ১৬০ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে হঠাৎ করেই চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) মালিকানায় পরিবর্তন আসে। প্রথমে আড়ালে থাকলেও পরে পিকে হালদার ও তার নামসর্বস্ব কয়েকটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানায় যুক্ত হয়।

এর কয়েক বছরের মধ্যে ঋণের নামে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেই হাজার কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়। এ কারণে চারটি প্রতিষ্ঠানই এখন ধুঁকছে। ইতিমধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি তিনটিও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

কোন কমেন্ট নেই

উত্তর দিন