শুক্রবার, ১৭ Jul ২০২৬, ১১:৫১ পূর্বাহ্ন

দক্ষিণখানে ফ্ল্যাটে ৩ লাশ: ঋণের হতাশা থেকে স্ত্রী ও সন্তানদের খুন

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : জুয়া ও মাদকে আসক্ত হয়ে কোটি টাকার বেশি ঋণ করে ফেলেছিলেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডের (বিটিসিএল) উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিব উদ্দিন ভুঁইয়া। এ কারণে সংসারে অশান্তি লেগেই থাকত। এ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর গা ঢাকা দিয়েছেন তিনি। রাজধানীর দক্ষিণখানে তিন লাশ উদ্ধারের ঘটনা তদন্তে নেমে প্রাথমিকভাবে এমন ধারণা করছে পুলিশ। রাকিবকে গ্রেফতারে থানা পুলিশের পাশাপাশি মাঠে নেমেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শনিবার তিন লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে। তিনজনকেই হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান একেএম মাইনুদ্দিন। নারীকে মাথায় আঘাত ও দুই শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। তবে এ ঘটনায় শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পর্যন্ত মামলা করা হয়নি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এ খুনে রাকিবই জড়িত। তিনি নানা কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এতে তাদের পরিবারে অশান্তি দেখা দেয়। ধারণা করা হচ্ছে, অশান্তি থেকে মুক্তি পেতেই তিনি স্ত্রী-সন্তানদের খুন করেছেন। আশা করা হচ্ছে, খুব দ্রুতই তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। তাকে গ্রেফতার করতে পারলে এই খুনের রহস্যভেদ করা সম্ভব হবে।

দক্ষিণখানের ৮৩৮ নম্বর প্রেমবাগানের চতুর্থ তলার বাসা থেকে শুক্রবার সন্ধ্যায় মুন্নী বেগম (৩৭) এবং তার দুই সন্তান ফারহান উদ্দিন (১২) ও লাইভা ভুঁইয়ার (৩) অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মা ও মেয়ের লাশ একটি কক্ষের বিছানায় এবং ছেলের লাশ আরেক কক্ষের মেঝেতে পড়ে ছিল। মায়ের মাথায় শক্ত কিছু দিয়ে আঘাতের ক্ষত ছিল। ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতুড়ি উদ্ধার করা হয়।

উত্তরা জোনের ডিসি নাবিদ কামাল শৈবাল জানান, তিনজনকেই ৩-৪ দিন আগে হত্যা করা হয়েছে বলে ময়নাতদন্তে জানা গেছে। ঘরের ভেতরে তিনটি লাশই ডি-কম্পোস্ট (অর্ধগলিত) অবস্থায় পাওয়া গেছে। মা ও ছেলের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আমরা খুনিকে ধরতে অভিযান চালাচ্ছি। এ ঘটনায় রাকিব উদ্দিন ভুঁইয়াই একমাত্র সন্দেহভাজন আসামি।

তদন্ত তদারক সূত্র জানায়, বছরখানেক আগে রাকিব জুয়া ও মাদকে আসক্ত হন। এরপর থেকেই তার সংসারে অশান্তির ছোঁয়া লাগে। বাসার সামনের একটি মুদি দোকানে তার বাকি পড়েছে ৪ লাখ টাকা। তার এক সহকর্মীর কাছ থেকে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা ধার নেন। পাশাপাশি আরও অনেকের কাছ থেকেও এভাবে টাকা ধার নেন। সব মিলিয়ে তিনি কোটি টাকার ওপরে ঋণ করেছিলেন।

এছাড়া কয়েক মাস আগে অপহরণের নাটক সাজিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছ থেকে মুক্তিপণ বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। এ নিয়েও পরিবারে অশান্তি ছিল। সম্প্রতি ওই টাকা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য রাকিবের ওপর চাপ ছিল। ওই টাকার বড় অংশ নেয়া ছিল শ্বশুরবাড়ি থেকে।

সূত্র জানায়, রাকিব উদ্দিন ভুঁইয়া ১০-১২ বছর ধরে ওই বাসায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। সম্প্রতি তিনি বিটিসিএলের গুলশান কার্যালয় থেকে উত্তরা কার্যালয়ে বদলি হন। এরপর থেকেই তাদের ফ্ল্যাট থেকে নিয়মিত ঝগড়া-ঝাঁটির শব্দ পাওয়া যেত। বিশেষ করে পাওনাদাররা তার বাসায় আসার কারণে বিরক্ত ছিলেন রাকিবের স্ত্রী। এ কারণে স্বামীর সঙ্গে প্রতিদিনই উচ্চবাচ্য হতো। পুলিশের ধারণা, এসব থেকে মুক্তি পেতেই রাকিব স্ত্রী-সন্তানদের খুন করে নিরুদ্দেশ হয়েছেন।

হত্যার শিকার মুন্নীর ভাই সোহেল আহমেদ বলেন, মুন্নী-রাকিব সম্পর্কে খালাতো ভাই-বোন ছিলেন। প্রেম করে প্রায় এক যুগ আগে তারা বিয়ে করেন। ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। ধারণা করছিলাম, কোথাও বেড়াতে গেছেন। এর আগেও তারা বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে যেতেন, তখন কখনও কখনও ফোনে পাওয়া যেত না। কিন্তু দীর্ঘ সময় তাদের ফোন বন্ধ থাকায় শুক্রবার খোঁজ নিতে এসে লাশ পাই।

সোহেল আহমেদ বলেন, তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক ছিল বলেই আমরা জানতাম। আমরা এখনও বুঝতে পারছি না কারা কেন তাদের হত্যা করল। তিন মাস আগে রাকিব একবার অপহরণ হয়েছিলেন বলে বাসায় জানিয়েছিলেন, কিন্তু বিষয়টি রহস্যজনক ছিল। কারা, কেন অপহরণ করেছিল এবং অপহরণ করে তাকে কোথায় নেয়া হয়েছিল- তা পরিষ্কার করেননি তিনি। বিষয়টি নিয়ে আমরাও গোলকধাঁধার মধ্যে রয়েছি। তিনি আরও জানান, রাকিবের বাবার নাম আশরাফ উদ্দিন ভুঁইয়া। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের ভাতশালা এলাকায়।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com