বৃহস্পতিবার, ১৬ Jul ২০২৬, ০১:৩৯ অপরাহ্ন

তাঁত শিল্পে নারীর মজুরিতে বৈষম্য, মালিকরা বলছেন বাজার মন্দা

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : একটি শাড়ি বা লুঙ্গি তৈরির মোট নয় ধাপের ছয়টিতে মূল ভূমিকা রাখেন নারী শ্রমিকরা। সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্পের কাজে জড়িত সেই নারী শ্রমিকরাই শিকার হচ্ছেন মজুরি বৈষম্যের। আর এমনটি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়, চলে আসছে যুগের পর যুগ ধরে। এই নারীরা পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করলেও মজুরি পাচ্ছেন তাদের তিন থেকে চার ভাগের এক ভাগ। মহাজনদের কাজে আর্জি জানিয়েও হয়নি কোনো ফল।

কথা হয় এনায়েতপুর থানার গোপিনাথপুর গ্রামের শ্রীমতি আপুচি বালার (৪৬) সঙ্গে। জানালেন, স্বামী গত হবার পর আট বছর হলো সংসারের হাল ধরেছেন। করছেন তাঁত শ্রমিকের কাজ। ভোর থেকে গভীর রাত অবদি চালিয়ে যাচ্ছেন চড়কার হাতল। চড়কায় এক পাশে সুতা কেটে নাটাই ও ববিনে তোলেন। এভাবে এক ডবল সুতা কাটতে তাকে অন্তত ২/৩ দিন অপরিসীম পরিশ্রম করতে হয়। এজন্য ডবল প্রতি তাকে মহাজন মজুরি দিয়ে থাকেন মাত্র দুইশ থেকে ২৭০ টাকা। এর মধ্যে সুতার মাড় তৈরিতে অন্তত ৮০ টাকা তাকে খরচ করতে হয়। সব মিলিয়ে তার মজুরি গিয়ে দাঁড়ায় দিনে ৭০ টাকা।

তিনি আরও জানান, অথচ একইভাবে পুরুষ শ্রমিক শাড়ি-লুঙ্গি বুনলে দিন তিনশ থেকে ছয়শ টাকা মজুরি পান। মহাজনরা স্পষ্ট জানিয়েছেন মজুরি বাড়াবেন না।

একই কথা জানালেন বৃদ্ধা তাঁত শ্রমিক মিনতি বালা (৭০) এবং মরিয়ম খাতুন (৬২)। তারা জানান, পরিবারের অভাবের কারণে ৭/৮ বছর বয়স থেকে সুতা কাটার কাজ করছি। তখন পেয়েছি ২৫ পয়সা মোড়া (১০টি পোল্লা)। এখন পাই ২ টাকা করে। দিনে বাড়ির কাজের পাশাপাশি ১০/১২ মোড়া সুতা কাটলে ২০ থেকে ২৫ টাকা মজুরি পাই। এই দিয়ে কি চলা যায়!

জানা যায়, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, এনায়েতপুর, শাহাজাদপুর, উল্লাপাড়া, কাজিপুর ও সদর উপজেলার দেড় লক্ষাধিক ইঞ্জিন এবং হাতে চালানো তাঁতে অন্তত কয়েক লাখ নারী শ্রমিক কাজ করছেন। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে উৎপাদিত উন্নতমানের শাড়ি-লুঙ্গি দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভারতসহ বর্হিবিশ্বে রপ্তানি হচ্ছে। এই বস্ত্র তৈরিতে পুরুষ শ্রমিকরা শুধু সুতা রং, শাড়ি বুনন এবং ড্রামে তানা পেছানোর কাজ করেন। অপরদিকে নারী শ্রমিকেরা সুতা শুকানো, পাড়ি করা, সুতা কাটা, চড়কা ববিন করা, সেলাই, বুটা কাটার কাজ করেন।

মজুরি বৈষম্যের বিষয়টি অবশ্য পুরুষ শ্রমিকরা অকপটে স্বীকার করে জানান, আমরা সারাদিন কাজ করলে ৩/৫ শত টাকা মজুরি পাই। আর নারীরা পায় একশ টাকার নিচে। নারীদের তুলনায় আমরা কিছুটা ভারি কাজ করলেও তাদের দিন অন্তত দুইশ টাকা মজুরি হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন: বেনাপোল চেকপোস্টে ভ্রমণকর রসিদ বই নেই, ভোগান্তিতে যাত্রীরা

এ ব্যাপারে খুকনী গ্রামের মিটন কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজের সত্ত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম, হাজী ফারুক আহমেদ, খামারগ্রামের জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত টাঙ্গাইল তাঁত বাজার কারখানার মালিক তোফাজ্জল হোসেন বাবুল জানান, তাঁত শিল্পে মূলত নারীরাই প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে যুগ যুগ ধরে কাজ করে আসছেন। তারা মজুরি কম পান মূলত ভারি কাজ না করার জন্য। তবে সবাই কম পান না। বেশি কাজ করলে বেশি পান। বাজার মন্দার কারণে বর্তমানে তাদের কিছুটা কম মজুরি দিচ্ছি। বাজার চাঙ্গা হলেই তাদের মজুরি বাড়িয়ে দেওয়া হবে।

সিরাজগঞ্জ হ্যান্ডলুম পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি বদিউজ্জামান বদি জানান, তাঁত শিল্পে কর্মজীবী নারীদের অবদান বলে শেষ করা যাবেনা। তারা যথাযথ মজুরি পাবে সেটা আমি চাই। তবে বাজারের বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে। বিদেশে নতুন-নতুন বাজার সৃষ্টি করে এ শিল্পের উৎপাদিত পণ্য বিক্রিতে সরকারের সহায়তা করতে হবে। তবেই বর্তমানে ন্যুয়ে পড়া শিল্প চাঙ্গা হবে। বাড়বে নারী-পুরুষ সব শ্রমিকদের বেতন।

এদিকে নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা নারী নেত্রী এবং বেলকুচি পৌরসভার মেয়র বেগম আশানুর বিশ্বাস জানিয়েছেন, তাঁত শিল্পে নারীর মজুরি বৈষম্য রোধে গার্মেন্ট সেক্টরের মত সরকারি ভাবে নীতিমালা তৈরি করা দরকার। পাশাপাশি শ্রমিক ফেডারেশন থাকলে মালিক পক্ষের কাছ থেকে আমাদের অবহেলিত নারীরা দাবি-দাওয়া আদায় করে নিতে পারবে।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com