শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৩:১০ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
ইন্টারনেট নির্ভরতা যতো বেশি তৈরী হচ্ছে , ডিজিটাল অপরাধ ততো বেশি বাড়ছে : টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র : সমৃদ্ধির পথে তিস্তার চরাঞ্চল রাঙ্গামাটিতে হাইফ্লো অক্সিজেন সাপোর্ট ও করোনা ইউনিটের উদ্বোধন পিছিয়ে পড়েও লিড নিলো বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল টাস্কফোর্সের সভা : শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে চামড়া শিল্প কর্তৃপক্ষ নামে নতুন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার চায় ঢাকা বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসায় জাতিসংঘ মহাসচিব দেশের মানুষ ভালো আছে বলেই বিএনপি ভালো নেই: ওবায়দুল কাদের জনগণের ভোট ও রায়ের ওপর নির্ভরকারীদের জন্য নির্বাচন বর্জন আত্মহননমূলক: তথ্যমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল : পরিকল্পনামন্ত্রী

টিকা উৎসবে উপচে পড়া ভিড়

সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে তৃণমূলের ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকা দেওয়ার বিশেষ কর্মসূচির প্রথম দিনে দেখা গেছে বিপুল আগ্রহ ও উদ্দীপনা। লোকে গমগম করছিল টিকাকেন্দ্রগুলো। তবে উৎসব-আমেজ সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে আসে টিকা পাওয়াদের তুলনায় না পেয়ে ফিরে যাওয়া লোকের সংখ্যাধিক্যের কারণে। ফিরে যাওয়াদের চোখেমুখে ছিল হতাশা।

অনেক এলাকায়ই বৃষ্টিতে ভিজে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে যাঁরা টিকা নিতে পেরেছেন তাঁরা যেমন আনন্দ নিয়ে ঘরে ফিরেছেন, তেমনি যাঁরা টিকা না পেয়ে ফিরেছেন তাঁদের মুখে শোনা গেছে কর্তৃপক্ষের নানা পরিকল্পনার ঘাটতি, বিশৃঙ্খলা, হয়রানি ও অনিয়মের কথা। কোথাও নিবন্ধন ছাড়াও অনেকে টিকা পেয়েছেন। আবার অনেকে দীর্ঘদিন আগে নিবন্ধন করে এসএমএস না পেয়েও গতকাল আশা নিয়ে কেন্দ্রে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে নানা অজুহাতে।

অন্যদিকে বিভিন্ন এলাকায় টিকাকেন্দ্রে মানুষের ভিড়ে  পাত্তা পায়নি স্বাস্থ্যবিধি। অনেকে মাস্ক না পরেই এসেছিলেন টিকা দিতে। অনেক এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা আগেই নিজেদের পছন্দের লোকজনের নিবন্ধন করে রেখেছিলেন। এর পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন কিছু সুযোগে সরাইল ও খুলনা নগরীতে দুজনকে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একাধিক ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। একটি এলাকায় একজন সংসদ সদস্য নিজেই টিকা পুশ করেন বলে তথ্য এসেছে গণমাধ্যমে।

এই টিকাদান কার্যক্রমে সরকারের স্বাস্থ্যকর্মীসহ বিভিন্ন বেসরকারি পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবীরা যেমন কাজ করেছেন, তেমনই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় বিভিন্ন কমিটির নেতাকর্মীরাও সহায়তা করেছেন। যদিও কোথাও কোথাও এমন সহায়তার আড়ালে প্রভাব খাটানোরও অভিযোগ উঠেছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় আগে থেকেই চলমান শহর এলাকার নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি ছয় দিনব্যাপী এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির  আওতায় গতকাল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত টিকা দেওয়া হয়। ২৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠী, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী জনগোষ্ঠী, নারী ও শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়। ১০ থেকে ১২ আগস্ট বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের জনগোষ্ঠীর ৫৫ ও তদূর্ধ্ব মানুষের মধ্যে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

ঢাকায় গতকাল এই বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনের আওতায় অন্যান্য সরকারি কেন্দ্রের পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৩৩টি কেন্দ্রে শুরু হয়েছে কভিড-১৯-এর গণটিকা কার্যক্রম।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা খুব ভালো বিষয় যে মানুষ টিকা নেওয়ার জন্য এতটা সাড়া দিচ্ছে। এটা একটি ইতিবাচক দিক। আজ (গতকাল) যারা টিকা পায়নি আমরা তাদের আশ্বস্ত করছি কাল, পরশু বা আগামী সপ্তাহে তাদের টিকা দেওয়া হবে।’

হাজারীবাগ ও লালবাগ এলাকার ২২, ২৪ ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন গণটিকাদানকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, কেন্দ্রগুলোতে ভোটের মতোই বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে। বিভিন্ন কেন্দ্রে পুলিশ মাইকিং করেও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি। আবার দুপুরের পর থেকে টিকা না পাওয়ার আশঙ্কায় হৈচৈ হতেও দেখা যায়। সব কেন্দ্রেই নির্ধারিত টিকার তুলনায় কয়েক গুণ টিকাপ্রত্যাশী উপস্থিত ছিলেন।

রাজধানীর তেজগাঁও আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের কেন্দ্রে টিকার সরবরাহ ছিল মাত্র ৩৫০টি। ফলে অপেক্ষা করেও বহু মানুষকে টিকা না নিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে; যদিও কেন্দ্র থেকে তাঁদের বলা হয়েছে আজ আবার যেতে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২৭ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার বকশীবাজার নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র-৫-এ দায়িত্বরত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, সকাল থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ১৫০ জনের রেজিস্ট্রেশন করানো হয়েছে। যাঁদের সব কাগজপত্র ঠিক আছে এবং শারীরিক কোনো অসুস্থতা নেই তাঁদের এখন টিকা দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকার বাইরে কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলার ৬৬টি ইউনিয়নের ৩৯ হাজার ৬০০ মানুষ গতকাল করোনা টিকা গ্রহণ করেছেন। জেলার বিভিন্ন টিকাকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ উদযাপনের মতো আনন্দ উল্লাস করতে করতে দলে দলে মানুষজন টিকাকেন্দ্রে এসে টিকা নিয়ে আবার একইভাবে যাঁর যাঁর বাড়ি পৌঁছেছেন।

খুলনায় বরাদ্দ টিকা শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই টিকা না নিয়েই বিষণ্ন মনে বাড়ি ফেরেন। মহানগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন হিরা সকাল সাড়ে ১০টায় সূর্যের হাসি ক্লিনিকে টিকা নিতে যান, কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তিনি টিকা নিতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘টিকা শেষ হয়ে গেছে। তাই টিকা নিতে পারিনি। শুধু শুধু একটি দিন নষ্ট হলো।’

রংপুরে দুপুরের আগেই শেষ হয়ে যায় টিকা। মানুষের আগ্রহ বাড়ায় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গণটিকার প্রথম ডোজ দেওয়া সম্পন্ন হয়। রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডে ৯৯টি কেন্দ্রে ১৯ হাজার ৮০০ জনকে করোনার প্রথম ডোজের টিকা দেওয়া হয়েছে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মোতাহারুল ইসলাম বলেন, টিকা গ্রহণে মানুষের আশানুরূপ সাড়া পাওয়া গেছে। প্রথম ডোজে গণটিকা কার্যক্রম ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

সুনামগঞ্জে বিপুলসংখ্যক মানুষকে সামাল দিতে বিভিন্ন কেন্দ্রে গ্রাম পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবীরা হিমশিম খাচ্ছিলেন। একটি কেন্দ্রের লাইনে দাঁড়ানো শারীরিক প্রতিবন্ধী, ষাটোর্ধ্ব নূরুল হক ক্রাচে ভর করে টিকাদানকেন্দ্রে আসেন। ভিড়ের কারণে তিনি রেজিস্ট্রেশন করতে পারছিলেন না। লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজন তরুণ তাঁকে অগ্রভাগে দাঁড় করিয়ে রেজিস্ট্রেশনের জন্য সহযোগিতা করেন। নূরুল হক বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। টিভিতে পরতি দিন দেকি সারা দুনিয়ায় করোনায় মানুষ মরতাছে। আমার ডর আইছে। তাই মাগনা টিকা দিতে আইছি।’

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার পৌরসভাসহ ১৩টি এবং রাঙ্গাবালী উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ৫৪টি ওয়ার্ডে টিকা দেওয়া হয়। স্থানীয় ডাকুয়া ইউনিয়নের টিকাকেন্দ্রটি ছিল একটি দোকানঘরের মধ্যে, যে কারণে বারান্দা না থাকায় এখানে মানুষ বৃষ্টিতে ভিজে যায়। ডাকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মো. আরাফাত হোসাইন রাকিব বলেন, ‘লাইনে দাঁড়ানোর জায়গায় কাপড়ের শামিয়ানাও টানিয়ে দিয়েছি। গতকাল বৃষ্টি ছিল না। আজ এত বৃষ্টি হবে তা ভাবতে পারিনি।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে দিনের শুরুতেই প্রতিটি টিকাদানকেন্দ্রে দেখা গেছে মানুষের ঢল। উপজেলার ১৪টি স্পটে দেওয়া হয়েছে করোনাভাইরাসের টিকা। গত তিন দিনে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করেন নিজ নিজ ইউনিয়ন পরিষদ এবং বিভিন্ন স্কুলের আইটি অভিজ্ঞ শিক্ষকরা। টিকা দেওয়ার আগে প্রত্যেককেই নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়।

দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কাটলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নিয়ে মাস্ক পরে টিকাকেন্দ্রে আসেন আমেনা বেগম (৮৭) ও আয়শা বেগম (৮২)। দুই বৃদ্ধা দাঁড়ান টিকা দেওয়ার দীর্ঘ লাইনে। টিকা দেওয়ার পর তাঁদের একজন বলেন, ‘কষ্ট হলেও সুস্থ থাকতেই হারা টিকা নেওচি (নিলাম)। মেলা মানুষ মেলা কথা কয়চিলো, হারা কারো কথা শুনি নাই।’

প্রথম দিনের টিকা দেওয়া শেষে গত রাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েকটি কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া বেশ সুন্দর ও উৎসবের মধ্যেই টিকাদান শেষ হয়েছে। আমরা সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। টিকার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। এটা খুবই ভালো দিক। যারা টিকা দিতে পারেনি তাদের জন্য আমরা আবার টিকার ব্যবস্থা করছি।’

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com