মঙ্গলবার, ৩০ Jun ২০২৬, ০৭:০৭ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

ডেঙ্গুঝুঁকি সেপ্টেম্বর জুড়ে

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। গত পাঁচ দিন ধরে দৈনিক রোগীর সংখ্যা তিনশর ঘরে রয়েছে। গত ১১-১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৮৪২ রোগী ও মারা গেছে ১০ জন। এ সময় দৈনিক গড় রোগী ছিল ৩৬৪ জন। অথচ এর আগের পাঁচ দিন (৬-১০ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৭৭ ও দৈনিক গড় রোগী ছিল ২৫৫ জন।

বিশেষ করে গত ২৯ আগস্ট থেকেই ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকে। সেদিন হাসপাতালে ভর্তি হয় ২০১ জন। সেদিনই চলতি বছরের মধ্যে প্রথম ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দুইশর ঘরে ওঠে। এরপর গত ১৯ দিনের মধ্যে মাত্র চার দিন রোগীর সংখ্যা একশর ঘরে ছিল। বাকি ১৫ দিনের মধ্যে ১০ দিন দৈনিক রোগী দুইশর ঘরে ও শেষ পাঁচ দিন ধরে তিনশর ঘরে ওঠানামা করছে। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার ১৬৪ জন রোগী ভর্তির তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, সাপ্তাহিক বন্ধের দিন হওয়ায় সব হাসপাতালের তথ্য আসেনি।

এমন অবস্থায় সেপ্টেম্বর জুড়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেপ্টেম্বরের পুরোটা ডেঙ্গুর ঝুঁকি আছে। এরপর থেকে ডেঙ্গু একটু কমতে পারে। বৃষ্টিপাত কমে আসবে। সাধারণত অক্টোবরে আমাদের দেশে বৃষ্টিপাত হয় না।’

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী কিছুটা বেড়েছে। বয়স্কদের পাশাপাশি শিশুরাও ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে আসছে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।

গতকাল ডেঙ্গুতে রাজধানীতে এরশাদ হোসেন নামে এক সাংবাদিক মারা গেছেন। তিনি এশিয়ান টেলিভিশনের মিরপুর (ঢাকা) সংবাদদাতা ছিলেন। তার বাড়ি মাগুরা পৌরসভার পারনান্দুয়ালী গ্রামে। তিনি ঢাকায় মাগুরা জেলা সাংবাদিক ফোরামের অন্যতম সদস্য ছিলেন।

এরশাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, গত রবিবার জ¦রে আক্রান্ত হন এরশাদ হোসেন। বুধবার তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ওই দিন প্রথমে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও পরে গ্রীনলাইফ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রক্তের অণুচক্রিকা (প্লাটিলেট) ৩৮ হাজারের নিচে নেমে আসায় তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। গতকাল ভোরে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শুরুতেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে : প্রধানমন্ত্রীর প্রধান চিকিৎসক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এবিএম আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু বর্তমানে ডেঙ্গু বেড়ে যাচ্ছে, তাই যে কারও জ্বর হলে, মাথা-শরীর-গিঁটে গিঁটে ব্যথা হলে, গায়ে র‌্যাশ হলে, যেকোনো লক্ষণ থাকলে দেরি না করে শুরুতেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। অনেকে দেরি করে। দেরি করা যাবে না। টেস্ট করতে হবে। সে অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে জটিলতাগুলো এড়ানো সম্ভব। অনেকে সাধারণ ভাইরাস মনে করে বসে থাকে। চার-পাঁচ দিন পর যখন জটিল হয়ে যায়, তখন মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে যায়। আজকাল টেলিফোনেও চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া যায়। এগুলো শুরুতেই করলে জটিলতা এড়ানো যায়।’

এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, ‘মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য যা যা করার করতে হবে। দিনে ঘুমালে মশারি টাঙাতে হবে। বাচ্চারা হাফপ্যান্ট না পরে ফুলপ্যান্ট ও ফুলহাতা জামা পরবে। বাজারে কিছু ওয়েন্টমেন্ট ও স্প্রে পাওয়া যায়, সেগুলো ব্যবহার করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দিন দিন ডেঙ্গু বাড়ছে। এটা বৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। দায়িত্ব সবার। ডাবের খোসা, বিভিন্ন ধরনের পাত্র, এসব জায়গার স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। একটা মশা থেকে শত শত ডেঙ্গুবাহিত মশা হবে। সুতরাং এসব প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা প্রশাসনের দায়িত্ব এবং এটা সমন্বয়ের মাধ্যমে করতে হবে। সব সিটি করপোরেশন পারবে না। অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। মশা ধ্বংসের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। এডিস মশা ঘরে বাস করে। ঘরের যেখানেই পানি থাকে, সেখানেই বাস করে।’

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. কাজী মো. রাশিদ উন নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন কিছুটা হলেও ঝুঁকি। তাই সবাইকে বলব, জ¦রের রোগী হলেই হাসপাতালে আসতে হবে। আউটডোরে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। সবসময় খোলা থাকে। দেরি করলে রক্তে প্লাটিলেট কমে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। তখন হাসপাতালে এলেও চিকিৎসা দিয়েও কোনো লাভ হয় না। তবে এবার ডেঙ্গুতে মৃত্যু কম। কারণ রোগীরা সচেতন। তারাও হাসপাতালে আসছে।’

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নিয়াতুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার ক্ল্যাসিক ডেঙ্গু রোগী বেশি। হেমোরেজিক ও শকসিনড্রোম ধরনের ডেঙ্গু রোগী কম। হাতব্যথা, গাব্যথা, জয়েন্ট ফুলে যাওয়া এ ধরনের সাধারণ উপসর্গ নিয়ে রোগীরা আসছে। সুতরাং জ্বর হলে বা এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলেই রোগীকে হাসপাতালে আসতে হবে। অপেক্ষা না করে বা এদিক-সেদিক না গিয়ে যেকোনো সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে এলেও রোগীরা চিকিৎসা পাবেন। সব হাসপাতালেই ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে।’

আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরাও : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. কাজী মো. রাশিদ উন নবী বলেন, ‘এখন ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। এখানে দৈনিক গড়ে ৬২-৬৬ জন রোগী ভর্তি থাকছে। সব বয়সী রোগীই আসছে। তাদের মধ্যে ২০ শতাংশই শিশু, যাদের বয়স ৫-৭ বছরের মধ্যে। এরপর ২৫-২৬ বছর বয়সী রোগী বেশি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে শিশু ওয়ার্ডে বেড কম। তাই শিশু রোগী বেশি হলে সমস্যা। শিশুদের জন্য ১৫টা বেড রেখেছি। যাতে বাচ্চাদের চিকিৎসা দেওয়া যায়। বয়স্ক রোগী বেশি হলে সমস্যা নেই। কারণ তাদের বেড বেশি। রাখা যায়। কিন্তু বাচ্চাদের রাখা সমস্যা। এবার ডেঙ্গুর জন্য আলাদা ওয়ার্ড করা হয়নি। প্রতিদিন গড়ে ১১০০-১২০০ রোগী ভর্তি থাকে। ডেঙ্গুর জন্য আলাদা ওয়ার্ড করা সম্ভব নয়।’

নিয়ন্ত্রণে হটস্পট ব্যবস্থাপনার তাগিদ : কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এই মুহূর্তে হটস্পট এরিয়া ম্যানেজমেন্ট ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ডেঙ্গু রোগী যেখানে আছে, ঠিকানা ধরে তাদের বাড়ির চারপাশে লার্ভিসাইডিং করে উড়ন্ত মশাকে মেরে ফেলাই হচ্ছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মশা মেরে দিতে না পারলে ডেঙ্গু রোগ ছড়াবেই।’

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘পুরো সেপ্টেম্বর জুড়ে অবস্থাটা খারাপই থাকবে। এখন যে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে, পানি জমছে, এমন পরিবেশ এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল। এ ছাড়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, এডিস মশার ঘনত্ব, সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম সব মিলে প্রকোপটা বেড়েছে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন চেষ্টা করছে। কিন্তু কতটা গুরুত্ব সহকারে চেষ্টা করছে, সেটা নিয়ে কিছুটা সন্দিহান।’

তিনি বলেন, ‘একটা এডিস মশা একটা ডেঙ্গু রোগীকে কামড়ালে, ওই মশা আরও চারজনকে ডেঙ্গুতে সংক্রমিত করতে পারে। ঘরে ঘরে যেহেতু ডেঙ্গু রোগী আছে ও এডিস মশাও আছে, তাই ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। সর্বশেষ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে যে জরিপ করা হয়েছে, তাতে এডিস মশার লার্ভার পরিমাণ অন্য সময়ের তুলনায় কিছু বেশি পাওয়া গেছে। তাই প্রত্যেককে তার বাড়ি ও বাড়ির আশপাশে যাতে কোনোভাবেই এডিস মশা জন্মাতে না পারে, এটা খেয়াল রাখতে হবে। রোগীকে মশারির নিচে রাখতেই হবে, এটা আইন। এডিস মশা কমপক্ষে আটতলা পর্যন্ত উড়তে পারে। সে জন্য উঁচু ভবনগুলোও ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে।’

বেশি রোগী ঢাকায় : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত এ বছর দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১০ হাজার ৩৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে রাজধানীতেই ভর্তি ৮ হাজার ২৩৩ জন, যা মোট ভর্তি রোগীর ৭৯ শতাংশ। বাকি ২১ শতাংশ বা ২ হাজার ১৬৩ রোগী ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায়। ঢাকার বাইরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে কক্সবাজারে, ৯১৬ জন। সেখানে বর্তমানে ভর্তি আছে ৭০ জন। এরপর চট্টগ্রাম জেলার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪৬, বর্তমানে সেখানে ভর্তি আছে ১৫ জন, চট্টগ্রাম জেলায় ২৭৯ রোগী ভর্তি হয়েছে এবং বর্তমানে ভর্তি আছে ৬০ জন, যশোরে ১৩০ জন আক্রান্ত হয়েছে এবং বর্তমানে ভর্তি আছে ২৮ জন, বরিশালে আক্রান্ত হয়েছে ৮৯ ও বর্তমানে ভর্তি আছে ১৬ জন। এখনো দেশের ২৪ জেলায় এ বছর কোনো ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়নি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com