মঙ্গলবার, ৩০ Jun ২০২৬, ০৯:০৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

ইরানে ইসলামি শাসনের মৃত্যুঘন্টা কি বেজে গেছে?

ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র গণতান্ত্রিক বিশ্বের সাধারণ প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি দিন ধরে টিকে আছে। শুরুতেও ইরানের ইসলামি বিপ্লব ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, আর নয়তো তা সফল হতে পারতো না। কিন্তু, ৪৩ বছর পর এসে মনে হচ্ছে, ইরানের জনগণের বড় অংশই এখন আর ইসলামি শাসন পছন্দ করছে না। কারণ বিপ্লবের সময় যে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি ইসলামি শাসকরা। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানেই প্রথম রাজার ক্ষমতাকে সীমিত করতে এবং শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একটি সাংবিধানিক বিপ্লব হয়েছিল। সেই বিপ্লবে ইসলামপন্থীরাও অংশগ্রহণ করেছিল। এরপর ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবেও জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিপ্লবের পর ইসলামি শাসকরা ক্রমাগত চরম কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠে। ফলে বিপ্লবের দুই দশক পর থেকেই ইরানের জনগণের বিশাল অংশ কয়েক বছর পরপরই ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আসছে। তবে এবারের বিদ্রোহ আগেরগুলোর চেয়ে ভিন্ন এবং আরও ব্যাপক ও গভীর বলেই মনে হচ্ছে।

১৯৬০ এবং ৭০ এর দশকে শাহের অধীনে আগ্রাসী ধর্মনিরপেক্ষতা, তেল-গ্যাস সহ জাতীয় খনিজ সম্পদ পশ্চিমাদের হাতে তুলে দেওয়া, দুর্নীতি এবং দমন-পীড়নমুলক রাজতান্ত্রিক শাসনে ক্ষুব্ধ হয়ে ইরানের জনগণের বড় অংশই রাজনৈতিক অনুপ্রেরণার জন্য ইসলামি প্রতীক, ধারণা এবং নেতাদের দিকে ফিরেছিল। তাদের কাছে শাহের আগ্রাসী পশ্চিমীকরণ প্রকল্পের বিপরীতে ইরানের ধর্মীয় নেতাদের প্রস্তাবিত ‘ইসলামি সরকার’ ব্যবস্থাকেই সমাধান মনে হচ্ছিল। আয়াতুল্লাহরা জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা সহ জণকল্যাণমূলক এক উদার ইসলামি শাসন ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এমনকি বামপন্থীরাও ইসলামি বিপ্লবে সমর্থন দেয়। কারণ ইসলামি নেতারা নাস্তিক, কমিউনিস্ট সহ সকল মত ও পথের সহাবস্থান এবং বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। যে কারণে বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোও ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পক্ষে লেখালেখি করেন।

কিন্তু বিপ্লবের পর ইসলামি শাসকরা হাজার হাজার কমিউনিস্টকে হত্যা করে এবং এমন একটি শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে যা শাহের রাজতান্ত্রিক শাসনের চেয়ে কোনো অংশেই কম দমন-পীড়নমূলক নয়। এমনকি পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোর ধর্মগুরুরাও কখনো কল্পনাও করতে পারেননি এমন নিয়মও চাপিয়ে দেওয়া হয়। যেমন, রাষ্ট্রীয়ভাবে সব ধর্মের নারীদের বাধ্যতামূলক হিজাব পরার নিয়ম। অবশ্য, তেল-গ্যাস সহ খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ জাতীয়করণের ফলে দুই দশকের মধ্যেই ইরানে মোটামুটি শক্তিশালি একটি জাতীয় বুর্জোয়া অর্থনীতির বিকাশ ঘটে। এছাড়া ইরান আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায়ও বেশ অগ্রগতি অর্জন করে। যার প্রতিফলন দেখা যায় ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে সমরাস্ত্রসহ যুদ্ধবিমান ও জাহাজ তৈরি এবং উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দারিদ্র দূর করতে পারেনি ইসলামি সরকার।

অন্যদিকে, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার এবং বিশেষকরে ইন্টারনেট প্রযুক্তির ফলে দুনিয়াটা হাতের মুঠোয় চলে আসার ফলস্বরুপ নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাকস্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং নারীর স্বাধীনতার আকাঙ্খাও তৈরি হতে থাকে। তারা ধর্মীয় অনুশাসন পালনে ইসলামি সরকারের জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধেও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ইরানের ধর্ম-পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া চলমান বিক্ষোভের ১৮তম দিন গত ৩ সেপ্টেম্বরে ইরানের মাশাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের সামনে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা বলছিল, ‘এই আন্দোলন এখন আর শুধু প্রতিবাদ নয় বরং এক নতুন বিপ্লবের ‍সূচনা করেছে’। রাস্তার বিক্ষোভকারীরাও স্লোগান দিচ্ছে, আমরা আর ভয় পাই না, আমরা এবার লড়ব। ইরানের ইসলামি শাসকদের অভিযোগ এই বিক্ষোভের পেছনে তাদের চিরশত্রু যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের উস্কানি রয়েছে। তবে, বাস্তবতা হলো ইরানের নতুন প্রজন্মের শহুরে তরুণদের একটা বিশাল অংশ এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে। নিরাপত্তাবাহিনী গুলি চালিয়ে ইতিমধ্যেই প্রায় দুইশ বিক্ষোভাকারীকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। হাজার হাজার জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবুও বিক্ষোভ থামার কোনো লক্ষণ নেই এখনো। গতকাল সন্ধ্যার পর ২৮তম দিনের মতো ইরানজুড়ে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। এদিকে, রাজধানী তেহরানের তরুণদের একটি গ্রুপ আগামীকাল থেকে পুরো দেশজুড়ে নতুন করে জাতীয়ভাবে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com