রবিবার, ২৮ Jun ২০২৬, ০৪:২৭ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

নদীর কারণে প্রাণ পাওয়া বাণিজ্যকেন্দ্র এখন বিলীনের শঙ্কায়

এক সময় অবিভক্ত বাংলার সিংহদ্বার হিসেবে পরিচিত ছিল চাঁদপুর। ব্রিটিশ শাসন আমলের শুরুর দিকে মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর তীরে গড়ে উঠে পুরানবাজার বাণিজ্যকেন্দ্র। নৌপথে সহজ যাতায়াত সুবিধার কারণে পূর্ব বাংলা-পশ্চিম বাংলাসহ ভারতবর্ষে নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে পুরানবাজারের।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে নদীই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই বাণিজ্য কেন্দ্রের জন্য। বিভিন্ন সময়ে মেঘনার ভাঙনে সংকুচিত হয়েছে ‘Get way to Eastern India’ খ্যাত এই বাণিজ্য কেন্দ্র। তবুও প্রতিদিন এই বাজারে বাণিজ্য হয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার ভাঙন ধরেছে পুরানবাজার শহররক্ষা বাঁধে। ভাঙন প্রবণ এলাকা হওয়ায় ব্যাংক থেকেও ব্যবসায়িক কাজে কোন সহায়তা পাচ্ছে না ব্যবসায়ীরা।

এদিকে নদী ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ব্যাংক সহায়তা পেতে সহায়তার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
বহুকাল আগে মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর তীরে গড়ে ওঠে পুরানবাজার বাণিজ্য কেন্দ্র। জনশ্রুতি আছে ‘মনসা মঙ্গল’ খ্যাত চাঁদ সওদাগর সপ্তডিঙ্গা ‘মধকর’ ভাসিয়ে বাণিজ্য করতে আসতেন এখানে। ঐতিহাসিকদের মতে পরবর্তীতে এই সওদাগরের নামানুসারেই এই বন্দরের নামকরণ করা হয় চাঁদপুর।

নৌপথে যোগাযোগ সুবিধার কারণে বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠে পুরানবাজার। ব্রিটিশ শাসন আমলে পাট ব্যবসার জন্য চাঁদপুরের পুরান বাজারের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। তখন অবিভক্ত বাংলার সিংহদ্বার হিসেবে খ্যাতি লাভ করে চাঁদপুর। দেশ বিদেশ থেকে আসা বণিকদের পদচারণায় পুরানবাজারের অর্ধশতাধিক বাণিজ্যিক পট্টি রমরমা হয়ে উঠতো। প্রতিদিন সহস্রাধিক কোটি টাকার লেনদেন হতো এখানে।

নদীর কারণে প্রাণ পাওয়া এই বাণিজ্য কেন্দ্র এখন নদীতেই বিলীনের শঙ্কায় রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৬০ সালের পর থেকে মেঘনার করাল গ্রাসে ভাঙনের শিকার হতে থাকে ঐতিহ্যবাহী এই বাণিজ্য কেন্দ্রটি। একাধিকবার ভাঙনে এই বাণিজ্য কেন্দ্রর প্রায় ৫ কিলোমিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পরবর্তীতে ২০০৯-২০১০ সালে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পুরানবাজার এলাকার ১৬শ’ ৩০ মিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এর পরেই নদী ভাঙনের ক্ষতি থেকে কিছুটা রক্ষা পায় পুরানবাজার। তবে দীর্ঘদিন ধরে পুরানবাজার রক্ষা বাঁধের কার্যকর সংস্কারের অভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাঙনের শিকার হয়েছে এলাকাটি। এতে শতাধিক বসতভিটা ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান মেঘনার বুকে তলিয়ে গেছে। নদীতে পুঁজি হারিয়ে অনেক ব্যবসায়ীই হয়েছেন দেউলিয়া। বর্ষার মৌসুমে নদীতে বিলীনের শঙ্কায় সময় কাটে ব্যবসায়ীদের।

পুরান বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গোপাল সাহা বলেন, এক সময় পুরানবাজারে চাল পট্টি, ডাল পট্টি, বাতাসা পট্টি, দুধ পট্টি, ফল পট্টিসহ অর্ধশতাধিক পট্টি ছিল। প্রতিটি পট্টিতে জমজমাট ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যে। কিন্তু কালের বিবর্তনে অধিকাংশ পট্টিই হারিয়ে গেছে। বিভিন্ন সময় নদী ভাঙনের কারণে অনেক বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হারিয়ে গেছে। অতীতের জৌলুস হারিয়ে এখন অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে পড়েছে এই বাজার।

চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায় বলেন, বিভিন্ন সময়ে মেঘনা নদীর ভাঙনে পুরানবাজারের প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদী ভাঙনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বাজারে চাল মিল, ডাল মিল, লবণ শোধানাগার, তেলের মিলসহ এখনো ব্যবসায় পরিচালনা করেছেন সহস্রাধিক ব্যবসায়ী। প্রতিদিন এ বাজারে প্রায় ৫শ’ কোটি টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু মেঘনার ভাঙনরোধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় যেকোন সময় পুরানবাজার মেঘনায় বিলীনের শঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, ভাঙনপ্রবন এলাকা হওয়ায় এই বাজারের ব্যবসায়ীদের কোন ব্যাংক লোন দেয় না। এতে করে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। পুরানবাজারের হারানো ঐহিত্য ফিরিয়ে আনতে ব্যংক ঋণ সুবিধার পাশাপাশি নদী ভাঙনরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।

অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড চাঁদপুর পুরানবাজার শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার সফিউল আলম বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ এলাকা হওয়ার পরও প্রবল নদী ভাঙনের ঝুঁকি থাকায় পুরানবাজারের ব্যবসায়ীদের ঋণের সুবিধা দেয়া যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বাজারের দক্ষিণ দিকে শহর রক্ষা বাঁধ ভাঙনের শিকার হয়েছে। তাছাড়া বিগত সময়ে আমরা বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে ঋণ দিয়েছিলাম। কিন্তু নদী ভাঙনে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে তারা দেউলিয়া হওয়ায় ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারেনি।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান বলেন, পুরানবাজার একটি ঐতিহাসিক বাজার। মেঘনা নদীর কারণে ভাঙনের সমস্যা রয়েছে। তবে গেল দুই বছর বড় ধরণের ভাঙন না হলেও ঝুঁকির মধ্যে আছে। নদী ভাঙন রোধে পুরানবাজারের পাশাপাশি চাঁদপুর শহররক্ষা বাঁধের স্থায়ী সংস্কারের জন্য সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, অনুমোদন পেলেই বাঁধের কাজ শুরু হবে। তখন এই ঝুঁকি অনেকাংশে লাগব করা যাবে। তবে মেঘনা নদী প্রবল খরস্রোতের কারণে আগে থেকে কোন মন্তব্য করা যায় না। তবুও আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com