শনিবার, ১১ Jul ২০২৬, ০৩:৩৬ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : স্ট্রোক হওয়ার পর গুরুতর অবস্থায় প্রথমে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয় ৭০ বছরের বৃদ্ধকে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রেফার করেন। ঢামেক হাসপাতালে নেয়ার পর রোগীকে স্পর্শ না করেই ডাক্তার স্বজনদের জানিয়ে দেন, এখানে করোনা রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে।
আপনারা রোগীকে নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে নেয়ার পর কোনো রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে বলা হল- বাড়ি নিয়ে যান। কথা হচ্ছিল গজারিরায় বাসিন্দা বৃদ্ধের ছেলে ও ছাত্রলীগের এক নেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, বাবার অবস্থা তখন ক্রমেই খারাপের দিকে।
শেষ পর্যন্ত শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ছুটে যাই। কর্তব্যরতদের হাতে-পায়ে ধরে ১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করাই। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত এই ৩ দিনে কোনো চিকিৎসক ছুঁয়েও দেখেননি বাবাকে। ডাক্তাররা আমাকে যন্ত্রপাতি কিনে নিজে নিজে জ্বর, ডায়াবেটিস এবং প্রেসার মাপতে বললেন।
তবে জ্বর এবং ডায়াবেটিস মাপার যন্ত্র কিনতে পারলেও অন্য যন্ত্রটি কিনতে পারিনি। তিনি বলেন, রোগীর অবস্থা সম্পর্কে যা জানার ডাক্তাররা আমার কাছ থেকেই জানছেন। আমাদের কাছে শুনে শুনেই ওষুধ লিখে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, জানি না বাবাকে জীবিত বাড়ি নিয়ে যেতে পারব কি না?
কথাবলার এক পর্যায়ে হাতজোড় করে তিনি বলছিলেন, ভাই আমার পরিচয় প্রকাশ করবেন না, পরিচয় জানতে পারলে আমার বাবার চিকিৎসায় আরও ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এছাড়া করোনা উপসর্গ নিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নমুনা দেয়ার জন্য ঘুরছিলেন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রাজিব।
তিনি একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে যাচ্ছিল। দৌড়ঝাঁপ করার কারণ জানতে চাইলে রাজিব নামের ওই লোকটি যুগান্তরকে বলেন, বুধবার থেকে নমুনা পরীক্ষার জন্য ঘুরছি কিন্তু পারছি না। এখানে গেলে তারা এক জায়গার কথা বলছে, সেখানে গেলে তারা আবার আরেক জায়গা দেখিয়ে দিচ্ছে।
মনে হয় বিনা চিকিৎসায়ই মরতে হবে। দুপুরের দিকে নমুনা সংগ্রহের লাইনে গিয়ে কথা হয় দুই ব্যক্তির সঙ্গে। একজন বললেন, আমরা দু’জন একসঙ্গে পরীক্ষা করিয়েছিলাম। আমার নেগেটিভ এবং ওর পজিটিভ হয়েছে। তাই আজ আসলাম পরীক্ষা করাতে, নমুনা নিলো না। বলল সিরিয়াল নিয়ে পরে আসতে হবে।
আমরা স্টাফ হয়েও পারলাম না। আর সাধারণ মানুষের কথা বলে লাভ নেই। ওষুধ কিনতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের রাস্তা দিয়ে বাইরে যাচ্ছিলেন রামপুরার আল আমিন। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমার এক নিকটাত্মীয় টিউমারের সমস্যা নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছেন।
তাকে গত ১৫ জুন ভর্তি করিয়েছি। চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চিকিৎসকরা আগের চেয়ে অনেক আন্তরিক। আগেও এখানে রোগী নিয়ে এসেছি। কিন্তু কোনো শুক্রবারই ডাক্তারের দেখা পাইনি। গত শুক্রবার ঠিকই ডাক্তার আমার রোগীকে দেখেছেন। কথা হয় আরেক বৃদ্ধের সঙ্গে।
তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, আমার রোগী ভর্তি আছে। চিকিৎসকরা আন্তরিকভাবেই চিকিৎসা দিচ্ছেন। এছাড়া গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নিয়ে আসা আরেক নারী জানান, হাসপাতালের চিকিৎসায় আমি সন্তুষ্ট।
হাসপাতালের নানা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে গিয়ে জানা গেল পরিচালক ডা. উত্তম বড়ুয়া করোনা আক্রান্ত। তিনি হাসপাতালে নেই। হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. কেএম মামুন মোর্শেদের রুমে গিয়ে দেখা গেল তিনি লোকজনের সঙ্গে কথা বলছেন।
অফিসে তার এক নারী স্টাফ এসে বাইরে দাঁড়ানো এক ব্যক্তির দিকে আঙুল তাক করে বলছিলেন, ‘স্যার উনি করোনা পজিটিভ।’ সারা হাসপাতাল ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন আসছে আপনার সঙ্গে কথা বলতে। এ সময় ডা. মামুন মোর্শেদ বলেন, এই আপনি কে?
এখানে আসছেন কেন? উত্তরে সে নিজেকে এ হাসপাতালের টেকনোলজিস্ট পরিচয় দেন। ডা. মামুন ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, টেকনোলজিস্ট আর নার্সদের যন্ত্রণায় পারলাম না। এই তুমি যে ঘুরে বেড়াছে জানো আরও কয়জনের মাঝে করোনা ছড়িয়েছ?
এক ফাঁকে নিজের পরিচয় দিয়ে হাসপাতালের অনিয়ম নিয়ে জানতে চাইলে উপ-পরিচালক ডা. কেএম মামুন মোর্শেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, আসলে আমরা যারা সেবামূলক কাজ করি, তাদের প্রতি রোগীদের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি থাকবেই।
কাউকে শতভাগ সন্তুষ্ট করা যাবে না। তবে আমি বলব, যেসব অনিয়মের কথা বলা হয়েছে তা ঠিক নয়। তিনি বলেন, আমাদের এখানে প্রতিদিন ১৯০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৫০টি নমুনা শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বাকিটা আমাদের এখানেই টেস্ট করা হয় এবং রিপোর্ট পরের দিনই দিয়ে দেয়া হয়। তিনি বলেন, কেউ যাতে ভোগান্তিতে না পড়েন, এসব বিষয় দেখভালের জন্য চিকিৎসকদের পাঁচ সদস্যের কমিটি করে দেয়া আছে।
যারা করোনা টেস্টের জন্য নাম এন্ট্রি করান, তাদের এসএমসের মাধ্যমে পরদিন আসার জন্য বলে দেয়া হয়। ডা. মামুন মোর্শেদ জানান, এ হাসপাতালে বর্তমানে ৮০টি বেডের একটি বিশেষায়িত ওয়ার্ডে করোনার চিকিৎসা চলছে।
আগামী শনিবার আরও ১০০ বেড বাড়ানো হবে। এরপর থেকে ১৮০টি বেড থাকবে করোনা রোগীদের জন্য।
নগরকন্ঠ.কম/এআর