বৃহস্পতিবার, ০৯ Jul ২০২৬, ০৭:৫৭ পূর্বাহ্ন

দুই-তৃতীয়াংশ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক অবৈধ

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : বরিশালে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এগুলোর বেশির ভাগেরই নেই বৈধ কাগজপত্র। অনেকগুলোরই নেই লাইসেন্স, আবার লাইসেন্স থাকলেও তা নবায়ন করা হচ্ছে না দীর্ঘদিন। প্রতিষ্ঠানগুলোতে ন্যূনতম ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ানও নেই। সেবার দিকটা ভুলে যেনতেনভাবে অর্থ কামাই করাই যেন মুখ্য হয়ে উঠেছে। মৃত ডাক্তারের নামেও দেয়া হচ্ছে পরীক্ষার সনদ। এসব দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোক থাকলেও সেখানেও রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। সম্প্রতি ঢাকার রিজেন্ট ও জেকেজি হাসপাতালের জালিয়াতি প্রকাশ্যে আসার পর বরিশালের স্বাস্থ্য বিভাগ নড়েচড়ে বসেছে। কয়েকটি অভিযান চালিয়ে দুটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা ও ৭ জনকে দণ্ড দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র হালনাগাদের কাজ শুরু করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

বিশেষ করে বরিশাল নগরীতে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘিরে দালালদের দৌরাত্ম্য ব্যাপক। সবকিছুই হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যকে ম্যানেজ করে। নগরীর সদর রোড, গীর্জা মহল্লা মোড়, আগরপুর রোড, কাকলির মোড়, বাটারগলি, বিবির পুকুর পার, অশ্বিনী কুমার হল চত্বর, শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের সামনে গেলেই চোখে পড়বে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য। নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজের বিনিময়ে রোগী ভাগিয়ে নেয়ার তুমুল প্রতিযোগিতা চলে দালালদের মধ্যে।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার দাস বলেন, সিটি কর্পোরেশন ও বিভাগের ৬ জেলায় সিভিল সার্জনদের প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির কাছ থেকে হালনাগাদ তথ্য পেলে অনুমোদনবিহীন ও অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। সিটি কর্পোরেশন ছাড়াও বরিশাল জেলায় ১২৭টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে লাইসেন্স রয়েছে ৮৬টির। ১৪টি বন্ধ হয়ে গেছে, ১৭টি আবেদনবিহীন অবস্থায় আছে।

জেলা সিভিল সার্জন অফিস বলছে, গত অর্থবছর পর্যন্ত মাত্র ২৮টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে নবায়ন করা হচ্ছে না এমন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এদিকে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় বলছে, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৩৯টি বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১১টির লাইসেন্স আছে। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১১৬টি বেসরকারি ল্যাব-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে লাইসেন্স আছে ২৮টির। বিভাগের ৬ জেলায় প্রায় সাড়ে ৯শ’ হাসপাতাল, ক্লিনিক, ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩শ’ প্রতিষ্ঠানের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। বাকিগুলো চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য ও সাস্থ্য বিভাগের লোকদের ম্যানেজ করে। তাছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব প্রতিষ্ঠানের হর্তাকর্তা হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষে খুব বেশি কিছু করা বা বলাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

জাল-জালিয়াতি বেড়ে যাওয়ায় বুধবার নগরীর জর্ডন রোড এলাকায় অভিযান চালিয়ে সেন্ট্রাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দুই মালিক ও ভুয়া ডিগ্রিধারী এক চিকিৎসককে ৬ মাসের দণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মৃত ডাক্তারের স্বাক্ষরযুক্ত প্যাথলজি রিপোর্ট দেয়া ও ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করায় এক চিকিৎসককে আটক করা হয়েছে। অভিযানে নানা অনিয়ম পাওয়ায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। এর আগে শনিবার নগরীর আগরপুর রোডে দি মুন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ। এখানে রিপোর্টে চিকিৎসকের জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করার প্রমাণ পাওয়ায় সেন্টারটি সিলগালা এবং প্রতিষ্ঠানের দুই মালিক ও দুই টেকনিশিয়ানকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেয়া হয়। বরিশাল জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াউর রহমান জানান, অভিযান চলছে এবং এটি অব্যাহত থাকবে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালাতে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগে। আবেদন করতে হয়, পরে সবকিছু যাচাই-বাছাই করে লাইসেন্স দেয়া হয়। যারা আবেদন করেনি বা কাগজপত্র হালনাগাদ করেনি তাদের তালিকা করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com