বৃহস্পতিবার, ০৯ Jul ২০২৬, ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ন

করোনায় বেপরোয়া প্রতারকচক্র, মানুষকে ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নেয় টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : করোনাকালে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে প্রতারকচক্র। এরা অন্তত এক ডজন কৌশলে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকাপয়সা। মহামারীতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বেশি প্রতারণা করছে চক্রের সদস্যরা। আর বেশির ভাগ প্রতারণায় টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সুন্দরী নারীদের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে একের পর এক প্রতারক চক্রের সদস্যরা গ্রেফতার হচ্ছে। এরপরও থামছে না প্রতারণা।

জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পেজ খুলে প্রতারণা, বিভিন্ন গ্রুপে বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন জনের মোবাইল নম্বর ও ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের তথ্য জোগাড় করে প্রতারণা, করোনার সার্টিফিকেট, রক্ত, সুরক্ষাসামগ্রী নিয়ে প্রতারণা, ভুয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয়েও প্রতারণা চলছে। ২১ জুলাই পল্লবী থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী তূর্ণাসহ আরও ১২ নাইজেরিয়ান নাগরিককে গ্রেফতার করে সিআইডি। সিআইডি জানায়, তূর্ণাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে ফেসবুকে বিভিন্ন লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ত। এরপর তারা বিদেশি উপহার পাঠানোর নামে কৌশলে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিত। এভাবে তারা শতাধিক লোকের কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দেশি-বিদেশি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র চট্টগ্রামে অনলাইন জুয়ার আসর বসিয়ে মাত্র ৪ মাসে ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ওই টাকায় কেনা হয়েছে দামি গাড়ি ও ফ্ল্যাট। আবার কয়েক কোটি টাকা বিদেশেও পাচার করা হয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে অনলাইন জুয়াড়ি দলের ৫ সদস্যকে আটকের পর চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য বের হয়ে আসে। চক্রটি বিভিন্ন অ্যাপ এবং ওয়েবসাইট ব্যবহার করেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, বিশেষায়িত ৩টি ওয়েবসাইট এবং কয়েকটি অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া চলত। আবার আয়ের অংশ কয়েক কোটি টাকা অনলাইন মুদ্রা বিটকয়েনে কনভার্ট করে ইউক্রেনের মাফিয়াদের কাছে পাঠানো হয়। সিআইডি এখন বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।

সম্প্রতি ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদ উল্লাহ, তার স্ত্রী নিপা সুলতানা নূপুর এবং তাদের এক সহকারীকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ কোম্পানিটি মতিঝিলে আলিশান অফিস নিয়ে সুন্দরী নারীদের ব্যবহার করে মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন জানান, গ্রেফতার ব্যক্তিরা টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।

করোনা মহামারীতে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা করোনার ভুয়া সার্টিফিকেট বিক্রির ঘটনা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনার নমুনা সংগ্রহের পর টাকার বিনিময়ে ভুয়া সার্টিফিকেট দেয়ার ঘটনা নজরে আসে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন-অর-রশীদের। ২৩ জুন পুলিশ জেকেজি হেলথ কেয়ারে অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আরিফ চৌধুরীসহ ৬ জনকে গ্রেফতার করে। পরে আরিফের স্ত্রী আলোচিত চিকিৎসক সাবরিনাকেও গ্রেফতার করা হয়। এ বিষয়ে ডিবিতে মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। জেকেজি হেলথ কেয়ার মূলত ডা. সাবরিনাকে পুঁজি করেই প্রতারণা চালিয়ে আসছিল। এছাড়া রিজেন্ট হাসপাতালের কর্ণধার সাহেদও করোনার চিকিৎসায় প্রতারণার দায়ে গ্রেফতার হয়েছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমডি ফয়সাল আল ইসলামসহ তিনজনকে। করোনা রোগীকে প্লাজমা দেয়ার নামে প্রতারণার তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ধরনের অন্তত ৬টি চক্রকে শনাক্ত করা হয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, প্লাজমা প্রতারণা চক্রের সদস্যরা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে করোনা রোগীর জন্য প্লাজমার সন্ধান করা ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর এরা নিজেদের করোনামুক্ত দাবি করে প্লাজমা দেয়ার প্রস্তাব দেয়। এরপর রোগীর অবস্থাভেদে ১০ হাজার থেকে শুরু করে ২৫-৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়। পরে মোবাইল নম্বর বন্ধ কিংবা ব্লক করে দেয়। দেশে করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই নকল সুরক্ষা সামগ্রী, হ্যান্ডস গ্লাভস, স্যানিটাইজার তৈরি করে একশ্রেণির প্রতারক প্রতারণা করে আসছে। এছাড়া করোনা রোগের টিকা ও ওষুধের কথা বলেও কেউ কেউ প্রতারণা করে আসছে। অন্যদিকে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ‘ভাইরাস শাটআউট’ নামে একটি পণ্য বিক্রি করছে প্রতারকচক্র। প্রতিটি কার্ড তারা আড়াই থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করে থাকে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহনাজ হোসেন ফারিবা জানান, কার্ড ঘাড়ে থাকলে এক মাস করোনামুক্ত থাকা যাবে- এমন বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্ষতিকর চিকিৎসা সামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছিল। এ ধরনের প্রতারণার দায়ে একজনকে জরিমানা করা হয়েছে। তার কাছ থেকে কার্ড জব্দ করা হয়েছে।

করোনাকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপে বিজ্ঞাপন দিয়েও প্রতারণা করছে একটি চক্র। সম্প্রতি ফেসবুকে একটি গ্রুপে আম বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায়। এরপর বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে আমের অর্ডার করেন ক্রেতা। টাকা পাঠিয়ে দেয়ার পর কথিত বিক্রেতা তার মোবাইল নম্বর বন্ধ করে দেয়। করোনাকালে সিআইডি একটি অভিনব প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছে। এরই মধ্যে চক্রের ১০ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সিআইডির ঢাকা মেট্রো-পূর্ব বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার কানিজ ফাতেমা জানান, চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পিকআপ গাড়ি চুরি করে। তারা গাড়ি চুরির পর ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে সিমকার্ড তুলে গাড়ির মালিককে ফোন করে গাড়ি ফেরত দিয়ে টাকা নিত। এখানেও তারা প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়েছে।

পুুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, প্রতারকের খপ্পর থেকে মুক্ত থাকতে হলে প্রত্যেককে আগে নিজেকে সচেতন হতে হবে। কেউ প্রতারণার শিকার হলে বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আনতে হবে।

ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার ওয়ালিদ হোসেন বলেন, অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বিষয়টি জানাতে চান না। এতে অনেক সময় প্রতারকরা পার পেয়ে যায়। প্রতারণার বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স অবস্থান। কয়েকজন প্রতারককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com