লোকালয়ে বাঘ আতঙ্ক, রাত জেগে পাহারা

লোকালয়ে বাঘ আতঙ্ক, রাত জেগে পাহারা

0

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : পঞ্চগড় সদর উপজেলার ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা কয়েকটি গ্রামে বাঘ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বাঘ আতঙ্কে দিন কাটছে উপজেলার সাতমেরা ইউনিয়নের মুহুরিজোত, সাহেবীজোত, উষাপাড়া ও বাদিয়াগছ এলাকার কয়েক হাজার মানুষের। প্রায় এক মাস ধরে ওই এলাকায় দিনে ও রাতে বেশ কয়েকটি বাঘের দেখা পেয়েছে তারা। এমনকি ওই এলাকায় বাঘের আক্রমণের শিকার হয়েছে গরু-ছাগলও। বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে বাঘের পায়ের ছাপও। এলাকায় বাঘের আনাগোনা দেখা যাওয়ায় ওই এলাকায় মানুষেরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন গ্রামের মানুষ। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ জনপ্রতিনিধিরাও। বাঘ ধরতে এরই মধ্যে ঢাকা থেকে বন বিভাগের প্রশিক্ষিত কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার সাতমেরা ইউনিয়নের মুহুরিজোত গ্রামের শেষ প্রান্তের প্রায় চার একরের পরিচর্চাবিহীন জঙ্গলাকীর্ণ চা বাগান এলাকায় শত শত উৎসুক মানুষের ভিড়। দূর-দূরান্ত থেকে তারা বাঘ দেখতে এসেছে। ওই চা বাগানের ঝোপঝাড়ে বাঘ লুকিয়ে রয়েছে বলে জানায় স্থানীয়রা। কেউ কেউ চা বাগানের ভেতরে ঢুকেও বাঘের দেখা পাওয়ার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন স্থানে বাঘ ধরতে ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, এক মাস ধরেই রাতে পথে-প্রান্তরে বাঘ দেখছে তারা। আকারে লম্বা ও গায়ে কালো গোল ছোপ দেখে তারা ধারণা করছে, বাঘগুলো চিতাবাঘ। দুটি বড় ও তিনটি বাচ্চা বাঘ রাত হলেই বের হয়ে গ্রামের দিকে চলে আসে। পাশের মহাসড়কেও বাঘ চলাফেরা করতে দেখেছে পথচারীরা। এরা শিকার ধরতে ঝোপঝাড়ের পাশে ওঁৎ পেতে থাকে।

স্থানীয়রা ধারণা করছে, বাঘগুলো ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে ওই এলাকায় প্রবেশ করেছে। এক সপ্তাহ ধরে বাঘের আনাগোনা আরো বেড়ে গেছে। বুধবার বিকেলে ঊষাপাড়া এলাকার আবুল কালাম ওই চা বাগানের পাশ দিয়ে গরু নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর একটি গরুর ওপর আক্রমণ করে বসে একটি চিতাবাঘ। বাঘের আক্রমণে মুহূর্তেই মারা যায় গরুটি। গরুটি উদ্ধার করতে গেলে তার দিকেও তেড়ে আসে বাঘ। পরে তাঁর চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এলে পালিয়ে যায় বাঘটি।

এরপর বাঘ আতঙ্ক আরো প্রকট আকার ধারণ করে। স্থানীয়রা এখন একা একা বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ হাট-বাজারে যাচ্ছে না। গেলেও দল বেঁধে যাচ্ছে। এখন রাতে শান্তিতে ঘুমাতেও পারছে না তারা। প্রতিটি বাড়িতে বড় টর্চ লাইট রাখা হয়েছে। রাত জেগে বাঘ পাহারা দিচ্ছে গ্রামের মানুষ।

ঊষাপাড়া এলাকার আবুল কালাম বলেন, আমি গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। যে গরুটি সবার আগে আগে যাচ্ছিল সে গরুটির ওপর হামলা করে বাঘটি। মুহূর্তের মধ্যে গরুটি হত্যা করে তার কাছে বসে ছিল বাঘটি। আমি গরুটি উদ্ধার করতে গেলে আমার দিকেও তেড়ে আসে। পরে আমি চিৎকার করলে স্থানীয়রা ছুটে আসে। তখন দ্রুত পালিয়ে যায় বাঘটি। আমার ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার গরুটি মেরে ফেলল বাঘ। এর আগে আরেকটি ছাগলের ওপর হামলা করে বাঘ।

মুহুরিজোত এলাকার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সপ্তাহখানেক আগে দশমাইল বাজার থেকে আমরা তিনজন হেঁটে বাড়ি ফিরছিলাম। ফেরার পথে হঠাৎ দেখলাম একটি বাঘ সড়ক পার হয়ে চা বাগানের দিকে যাচ্ছে। আমরা লাইট নিয়ে পেছনে পেছনে কিছুদূর গিয়ে দেখি জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে পড়েছে বাঘটি। তার পর থেকেই প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে কাটাচ্ছি আমরা। প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে কেউ বের হচ্ছি না। দিনের বেলায়ও মাঠে কাজ করতে ভয় হচ্ছে।

দিনাজপুর সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বলেন, স্থানীয়দের তথ্য মতে, দুটি প্রাপ্তবয়স্ক ও তিনটি বাচ্চা বাঘ দেখেছে তারা। তাদের বর্ণনা অনুযায়ী আমরা ধারণা করছি, বাঘগুলো চিতাবাঘ। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা ঢাকা থেকে একটি অভিজ্ঞ টিম পাঠিয়েছে। তবে বাঘগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি বাঘগুলোর অবস্থান নিশ্চিত হয়ে বাঘগুলোকে জীবিত অবস্থায় ধরতে।

পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বাঘের কিছু আলামত পেয়েছি। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বাঘ ধরা বা বাঘের অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছেন। আমরা এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করেছি। এ ছাড়া স্থানীয়দের প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছি। এ ছাড়া বাঘের আক্রমণে যাদের গরু-ছাগল মারা গেছে, আমরা তাদের সহযোগিতা করব।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

কোন কমেন্ট নেই

উত্তর দিন