বৃহস্পতিবার, ০৬ মে ২০২১, ০৬:৫৩ অপরাহ্ন

ভুলোমনা ম্যানেজার

নিউজ ডেস্ক, নগরকন্ঠ.কম : খুব সম্ভবত আমার কিছু একটা হয়েছে। বাড়িতে হুটহাট আত্মীয়স্বজন আসা বেড়ে গেছে। কী হয়েছে- সেটি ঠিক বুঝতে পারছি না। আয়নার সামনে দাঁড়াই। চেহারার কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। নাক, মুখ ও ঠোঁট- সব ঠিক আছে। এমনকি মাথার চুল- সেটিতেও কোনো সমস্যা নেই। আগেও কালো ছিল; এখনও কালো আছে। সাদা কিংবা লাল হয়নি।

তাহলে কেন এমন আত্মীয় আসা বেড়ে গেল! গতকাল ঠিক সন্ধ্যায় কলিংবেল বেজে উঠল। অফিসের একটা হিসাব নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। কলিংবেল বাজতেই লাফ দিয়ে উঠলাম। গরমিল বেঁধে গেল হিসাবে। এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে। দরজা খুলে অবাক! যাকে দেখলে সুন্দর সুন্দর গালি পেটের ভেতর থেকে টুপ করে মুখে চলে আসে, সেই আব্বাস আলি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

তিনি সম্পর্কে আমাদের পাতি আত্মীয় হন। মানে লেজের সারির আত্মীয়। তিনিও আমার বাড়িতে হাজির! কিছু বলতে যাব ঠিক তখন-ই মুখ খুললেন তিনি, ‘ভাইসাহেব, ভালো আছেন? আপনার ঘটনা শুনে খুব খুশি হলাম। তাই একটু এলাম আপনাকে দেখতে।’

‘দেখতে!’ আমি একটু ঝুঁকে এগিয়ে যাই আব্বাস সাহেবের দিকে, ‘দেখুন; ভালো করে দেখুন। দেখুন তো, চেহারায় কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা!’

আব্বাস সাহেব আমার কথায় হৃদয়ে কিছুটা হলেও ব্যথা পেলেন বলে মনে হল। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘না না, আপনার চেহারার কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের মতোই লাগছে।’ তারপর কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বললেন, ‘আজ তাহলে আসি। অন্য কোনোদিন দেখা হবে।’

আমি ঠাস করে দরজাটি লাগিয়ে দিলাম। মনে মনে বললাম, ‘আর যেন তোমার মুখ না দেখি আমি।’

নিজের রুমে ফিরে হিসাবের খাতাটা ঠিক করতে যাব, তখন-ই বউ এসে হাজির। তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ওগো শুনছো।’ আমি মাথা তুললাম না। তিনি আবারও বললেন, ‘ওগো শুনছো।’

আমি বললাম, ‘তোমার কথা না শুনলে হবে বল! শুনছি এক কান দিয়ে। আরেক কান দিয়ে বের করার চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না। বল, কী হয়েছে? ভালো কথা তো, নাকি?’
‘ভালো মানে। সেই রকম ভালো! রুবিনা ফোন দিয়েছিল।’

‘কোন রুবিনা?’

‘রুবিনাকে চিনতে পারলে না! গাধা কোথাকার! আরে আমার খালাতো বোনের মেয়ের নাতনি! ওই যে কিছুদিন আগে যার বিয়ে হল। নতুন জামাই নিয়ে নাকি কালকে আসবে।’
হায়রে কপাল আমার! নিজেকেই প্রশ্ন করি মনে মনে। কোথাকার কোন নাতনি সে নাকি আমার বাড়িতে আসছে বেড়াতে! নতুন বিয়ে হয়েছে। হানিমুনে কক্সবাজার যাও। বান্দরবানে বান্দর দেখতে যাও। খাগড়াছড়িতে ছড়ি ঘুরাতে যাও। হিমালয়কন্যা নেপালে যাও। আমার এখানে কেন বাপু! হানিমুন কি এখানেই হবে!

দুর্দান্ত, অদ্বিতীয় অবস্থা আমার আত্মীয়দের। যখন-তখন বাসায় আসছে তারা। কিন্তু যাচ্ছে না। আমার বাসা যেন একটি লঙ্গরখানা হয়ে গেছে। যে যেভাবে পারছে আসছে। রান্না করছে আমার স্ত্রীর সঙ্গে। খাচ্ছে যে যার মতো। আমার শ্যালিকার কথা-ই ধরি। সে এসেছে বেশ ক’দিন হল। কিন্তু তার যাওয়ার কোনো নাম-ই নেই। অথচ আগে সে তেমন আসত-ই না।

আমার কাছে সে মাঝে মাঝেই আসছে। আর বলছে, ‘দুলাভাই, আমি আপনার একমাত্র শ্যালিকা। আমার জন্য ওটা আনবেন-এটা আনবেন।’

ভেতরটা ফেটে গেলেও আমি মুখ কালো করি না। হাসিমুখে বলি, ‘অবশ্যই আনব। শ্যালিকা মানেই তো দ্বিতীয় বউ। প্রাণের আত্মীয়। তোমার জন্য না আনলে কার জন্য আনব!’

আমার মাথায় ঠিক ধরে না। নিশ্চয়-ই কিছু একটা হচ্ছে বাসায়। যার জন্য আমার বাড়িতে আত্মীয় আসা বেড়ে গেছে। আমাকে মানুষ অভিনন্দন জানাচ্ছে! আমি তো নতুন করে বাবাও হইনি, আমাকে অভিনন্দন জানাতে হবে। আমি তো পুরান বাবা। আমাকে অভিনন্দন জানানোর কী হল! পরদিন অফিসে যাওয়ার জন্য বের হই। রাস্তায় দাঁড়াই। রিকশা ডাকি।

পাশের বাসার জহিরুল ভাই বিরাট এক সালাম দিয়ে বলল, ‘ভাইজান, ভালো আছেন? আপনার কথা শুনেছি। শুনে বেশ পুলকিত এবং আনন্দিত হয়েছি।’
রিকশায় করে যাওয়ার সময় পথ আগলে দাঁড়াল বন্ধু কবির, ‘দোস্ত, বাসায় আসব সন্ধ্যায় তোর ভাবিকে নিয়ে। তোর ভাবি কথাটা শুনে তো বেশ খুশি।’

আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়াই। বাহ, বন্ধুর বউও খুশি আমার বিষয় নিয়ে। নিশ্চয়-ই এলাকার অন্যদের বউও খুশি হবে। ভাবতেই বেশ ভালো লাগছে। অন্যের বউ খুশি হলে আমারও খুশি থাকা উচিত। আমিও খুশিমনে অফিসে চলে যাই। অফিসে গিয়ে সরাসরি চলে যাই জিএম সাহেবের রুমে। রুমের দরজায় বড় করে লেখা, ‘জেনারেল ম্যানেজার। জনাব মোবাস্বির খান।’

আমার নামটা দেখে অবাক হই। কী যে হয়েছে আজকাল, সব-ই ভুলে যাই! আমার তো অফিসে প্রমোশন হয়েছে। তাই তো বলি, আমার বাসায় এত আত্মীয়স্বজন কেন আসে!

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com