বৃহস্পতিবার, ০২ Jul ২০২৬, ০১:০২ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
জুলাই স্মরণে জামায়াতের ৩৬ দিনের কর্মসূচি অনলাইন বেটিংয়ে ৭ বছর জেল, ৫ কোটি টাকা জরিমানা হাসিনার বক্তব্য প্রচার করা নিষেধ, গণমাধ্যমকে আদালতের নির্দেশনা মানতে হবে : তথ্য উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাজেট পরবর্তী নৈশভোজ বাতিল ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ

বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশারও বেশি

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য। বর্তমানে গবেষণা সংস্থা সিপিডির চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে আমাদের অর্জন এবং করণীয় নিয়ে মতামত দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাকির হোসেন

বাংলাদেশের বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি আজ। আপনি বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন অত্যন্ত কাছ থেকে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধুর দর্শন কী ছিল?

রেহমান সোবহান :বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণের শেষে ঘোষণা দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ জনগণের সামনে এ ঘোষণাই ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে তার দর্শন। তিনি স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামকে কল্পনা করেছিলেন একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হিসেবে, যা ছিল সহজে বোধগম্য একটি লক্ষ্য এবং যা অন্যান্য জাতিরাষ্ট্রকে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার সংগ্রামে উৎসাহ দিয়েছিল। স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর আহ্বান ছিল সংক্ষিপ্ত এবং একই সঙ্গে সুদূরপ্রসারী। এটি শুধু পাকিস্তানি শাসনের অন্যায্য প্রভাব থেকে নয়, শতাব্দীকাল ধরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ওপর যে অন্যায় হয়েছে, তা থেকে মুক্ত করার মিশন ছিল। রক্তক্ষয়ী জন্মের আঘাত সামলে বাংলাদেশ গত ৫০ বছরে এর অর্থনীতিকে অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। উল্লেখযোগ্য সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে এবং অধিকতর বিশ্বায়িত পৃথিবীতে নিজের অবস্থান পুনর্গঠন করেছে। এসবের অনেক কিছুই হতো না, যদি আমরা স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেরিয়ে জনগণের পুনর্জাগরণ ঘটাতে না পারতাম, প্রতিষ্ঠান গড়ে না তুলতে পারতাম এবং বিশ্ব দরবারে নিজেদের তুলে ধরতে না পারতাম। বিরূপ পরিস্থিতিতে সীমিত সম্পদ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার তিন বছরের মধ্যে এ ধরনের পুনর্জাগরণ দেখা যায়।

বঙ্গবন্ধু কি একটি কার্যকর রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে যেতে পেরেছিলেন?

রেহমান সোবহান : স্বাধীনতা অর্জনের এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সংবিধানে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র- এই চার মূলনীতির মাধ্যমে একটি জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসনের জন্য বঙ্গবন্ধু আজীবন সংগ্রাম করেন, যা পরবর্তীতে তার বীরোচিত নেতৃত্বে একটি কার্যকর জাতিরাষ্ট্রে রূপান্তরের দিকে ধাবিত হয়। তিনি যেটুকু সময় পেয়েছিলেন, তাতে একটি কার্যকর রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ‘আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’ অসমাপ্ত থেকে যায়।

আপনি বাংলাদেশ স্বাধীনের আগে ও পরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনামূলক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছেন। আমরা পাকিস্তানের তুলনায় কতটুকু এগিয়েছি?

রেহমান সোবহান :মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সামষ্টিক-অর্থনীতির বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। গত ৫০ বছরের যাত্রায় বাংলাদেশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে। বিশেষত গত ২৫ বছরে এবং আরও সুনির্দিষ্টভাবে গত ১০ বছরে আমরা অনেক এগিয়েছি। উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু আয়ে পাকিস্তানকে অনেক পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল পাকিস্তানের ৬১ শতাংশ কম। ২০২০ সালে এসে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের চেয়ে ৬২ শতাংশ বেশি। এ ধরনের দ্রুত উত্থান সম্ভব হয়েছে উচ্চ হারের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ এবং উচ্চ মাত্রার রপ্তানি আয়ের কারণে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন পাকিস্তানের দ্বিগুণ। বৈদেশিক ঋণ-জিডিপি অনুপাত পাকিস্তানের অর্ধেক। আমরা এখন কোনোভাবেই বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র নই। বাংলাদেশের বৈদেশিক সাহায্য- জিডিপি অনুপাত ২ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে, পাকিস্তানকে মাঝেমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেইল আউটের দরকার হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এখন পাকিস্তানের দ্বিগুণ। মানব উন্নয়ন সূচকে (এইচডিআই) ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু বর্তমানে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ তার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়ে রাখতে পেরেছে। এ কারণে এখন আমাদের জনসংখ্যা সে দেশের চেয়ে কম। অথচ অবিভক্ত পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা ছিল ৫৩ শতাংশ। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু পাকিস্তানের চেয়ে পাঁচ বছর পিছিয়ে ছিল। এখন আমাদের গড় আয়ু অনেক বেশি। শিক্ষার ক্ষেত্রে স্কুলে ভর্তি ও সাক্ষরতার হারে আমরা পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে ছিলাম। কিন্তু এখন এগিয়ে গেছি। সম্ভবত সবচেয়ে নাটকীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে এ দেশের নারীরা। জেন্ডার উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ শুধু পাকিস্তানকে নয়, ভারতকেও পেছনে ফেলেছে। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com