শনিবার, ২৭ Jun ২০২৬, ১২:০১ অপরাহ্ন
অবাধ এবং বিরতিহীন এক মৃত্যুযাত্রায় পরিণত হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। তবে আমাদের দেশে শুধু সড়কেই যে অবিরাম মৃত্যু ঘটছে এমনটা না। মৃত্যু ঘটছে নৌপথ, রেলপথ এমনকি আগুনে পুড়ে নিজ ঘরে কিংবা কর্মস্থলে। তবুও আমাদের সচেতনতার জায়গাটি যেন ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হচ্ছে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারণী মহল থেকে সড়ক তৈরিতেও আসছে না কাঠামোগত কোন পরিবর্তন। যে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে কিছুটা হলেও কমে যেত সড়কে অকাল মৃত্যুর সংখ্যা। প্রতিদিনই বিভিন্ন টিভি কিংবা পত্র-পত্রিকায় সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন, কথাবার্তা দেখে থাকি। কিন্তু বাস্তব জীবনে চলার পথে আমরা নিজেরাই সেগুলো পালন করি না। বরং মুখে নিয়মনীতির কথা সঙ্গত কারণে বললেও পথে গিয়ে আমরা হয়ে উঠছি বেপরোয়া এবং অসচেতন। যার ফলে প্রতিনিয়ত সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এভাবে মৃত্যুর সংখ্যা ভারী হলেও আমাদের নিজেদের সচেতনতার জায়গায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসছে না।
আমাদের দেশে দুর্ঘটনার পর এর পিছনের কারণ হিসেবে অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোসহ নানা বিষয় উঠে আসে তবে প্রায়ই দুর্ঘটনায় একটি সাধারণ অভিযোগ পাওয়া যায় আর তা হলো অনুমোদনহীন গাড়ি। সবশেষ খুলনা থেকে ঢাকাগামী ইমাদ পরিবহন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ১৯ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন। খাদে পড়া ইমাদ পরিবহনের এ বাসটি চলাচলের অনুমতি ছিল না। গত ১৮ জানুয়ারি বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবুও দুরন্ত গতিতে প্রতিনিয়ত গাড়িটি দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলো। ঘটনাটি ঢাকা-খুলনা এক্সপ্রেসওয়ের মাদারীপুরে ঘটেছে। তবে যে দুর্ঘটনা কমাতে আমরা হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে হাইওয়ে এক্সপ্রেস তৈরি করছি সেখানেই কেন বারংবার এমন ঘটনা ঘটছে তার কোন অনুসন্ধান হচ্ছে না। এসব সমস্যার পিছনের কারণ খোঁজা হচ্ছে না। যার ফলে এসব জায়গায় দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হলো, দুর্ঘটনার কারণগুলো গভীরভাবে তদন্ত করে খুঁজে বের করা। যাতে এ সমস্যার সমাধান খুব সহজে পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের দেশে এই কারণ খোঁজার বিষয়টিতে আলোকপাত করলে দেখা যাবে, পেছনের কোন কারণ উন্মোচন করে ভবিষ্যতে যাতে এমন কিছু না ঘটে সে বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।ফলে যথাযথ সংশোধনমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক মহাসড়কে প্রতিদিন দুর্ঘটনায় বহু মানুষ আহত কিংবা নিহত হচ্ছেন তার পিছনে শুধু অতিরিক্ত গতি কিংবা অনুমোদনহীন যানবাহন দায়ী নাকি যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোর ধরণও সমানভাবে দোষী তাও ভাবতে হবে। অন্তর্নিহিত এসব সমস্যার কারণ স্পষ্ট করতে হবে। তাহলেই অনেকাংশে দুর্ঘটনা কমে আসবে।
পত্রিকার একটি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে চলাচলরত ৩৩ শতাংশ যাত্রীবাহী বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই। এছাড়া ৫৬ শতাংশ বাসের গতি নিয়ন্ত্রক সার্টিফিকেটও নেই। বিআরটিএ’র জুলাই ২০১৯ এ হাইকোর্টে দাখিল করা প্রতিবেদন অনুসারে দেখা যায়, সারা দেশে ফিটনেস নবায়ন ছাড়াই ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩২০টি যান নিয়মিত চলাচল করছে। তবে যে গাড়িগুলোকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সেগুলোও রাস্তায় যাত্রী নিয়ে চলার জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত কিনা সেটা নিয়েও সন্দেহ রয়ে যায়। কারণ বিআরটিএ কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণ এ সন্দেহ থেকেই যায়।
দেখা যায়, অধিকাংশ চালক গাড়ি চালানোর জন্য সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের সুযোগ কম থাকায় তাদের ওস্তাদের কাছ থেকে গাড়ি চালানো শিখে থাকে। আবার কর্তৃপক্ষ চালকের দক্ষতা অনুযায়ী ভারী ও হালকা যানবাহনের লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থায়ও দুর্নীতি করে থাকে। সুতরাং এখানেও আমাদের বড় সংকট রয়ে গেছে। পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশের কিছু গতানুগতিক আচরণ আর টাকার বিনিময়ে অসৎ পথ অবলম্বন এমন সব দুর্ঘটনার পিছনে অন্যতমভাবে দায়ী। এজন্য শুধু তদন্ত কমিটি করে ছেড়ে দিয়ে কিংবা লাখ লাখ টাকার হাইওয়ে এক্সপ্রেস বানিয়ে রাখলেই সড়কে দুর্ঘটনা কমবে না। বরং এসব দুর্ঘটনার অন্তর্নিহত কারণ খুঁজে সেসব সমস্যার সমাধান করতে হবে।
যেমন, অদক্ষ চালককে গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে বয়স, চালকের দক্ষতা বিবেচনা করে লাইসেন্স প্রদান করতে হবে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে হাইওয়ে এক্সপ্রেস তৈরি করতে হবে। রাস্তার বাক, ইউটার্ন, দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা হিসেবে সর্তক থাকার বিষয়টি লক্ষ্য রাখতে হবে। আর বিশেষ করে অনুমোদনহীন গাড়ির বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সে গাড়ি সনাক্ত করে নিষিদ্ধ করতে হবে অন্যথায় শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কারিগরিভাবে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দিকগুলো বিবেচনা করে ছাড়পত্র প্রদান করতে হবে।এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা এবং সততার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই। পাশাপাশি পথচারী কিংবা নিজস্ব পরিবহনের চালক হিসেবে আমাদের সচেতনতার জায়গাটিও সমৃদ্ধ করতে হবে। এভাবে সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্যে দিয়েই সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।
লেখক- শিক্ষার্থী সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা।