বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০১:০১ অপরাহ্ন

সহকর্মীদের স্মৃতিতে ড. ইনামুল হক

প্রখ্যাত অভিনেতা, নাট্যকার, লেখক ও শিক্ষক ড. ইনামুল হক আর নেই। গতকাল বিকেলে তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গন। অনেক তারকার ফেইসবুকের পাতায় উঠে আসে তাকে নিয়ে শোকবার্তা, স্মৃতিচারণ। শেষ বিদায়ে এই গুণী মানুষকে স্মরণ করেছেন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা। কথা বলেছেন রণ

নাটকের প্রতি প্রেম ছিল অসম্ভব

রামেন্দু মজুমদার

আমি এখন ইনামের বাসাতেই আছি। আগে কতবার কত কারণে এসেছি। প্রতিবার তার হাসি মুখখানা দেখতে পেয়েছি। উচ্ছল সেই মুখের হাসি, কথা, আপ্যায়ন মুগ্ধ করেছে। আর আজ সে নিথর দেহে পড়ে আছে। খুব কাছের মানুষ চলে গেলে প্রথমে বিশ্বাস হয় না। খবরটি শোনার পর আমারও বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিন্তু তাকে এভাবে চুপচাপ শুয়ে থাকতে দেখে এখন মনটা বিষাদে ভরে উঠেছে। তার সঙ্গে যত স্মৃতি সব মনের মধ্যে তোলপাড় করছে। তার সম্পর্কে নতুন করে কী আর বলব? তিনি তো দেশের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা। তার সব কথা এমনিতেই মানুষের মুখে মুখে। তার প্রতিটি অর্জন, প্রতিটি কাজের সাক্ষী তার ভক্ত-দর্শকরা। নাটকের প্রতি প্রেম ছিল অসম্ভব। জনপ্রিয় বলতে যা বোঝায় সেটা তিনি ধারণ করেছেন। এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলার মতো মানসিক অবস্থায় নেই আমি।

নাটকের জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র

মামুনুর রশীদ

সংস্কৃতি জগতে কাজ করার সুবাদে একটা সময় কাছের আত্মীয় স্বজনের চেয়ে বেশি অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়ে যায় এই অঙ্গনের মানুষের সঙ্গে। শিল্পী জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় যাদের একেবারে গোড়ার দিকে পেয়েছি তাদের মধ্যে ড. ইনামুল হক একজন। অনেক কাছের মানুষকে হারিয়েছি। বিশেষ করে এই করোনাকালে অনেকেই দ্রুত আমাকে একা করে চলে গেছে। ইনামুল হকও চলে গেল! ভাবতেই পারছি না। তার মৃত্যুর খবর শোনার পরই ছুটে এসেছি, প্রাণের বন্ধুকে শেষবার দেখব বলে। তবে এই দেখা বড্ড কষ্টের। আর কত প্রাণের মানুষকে এভাবে নিথর অবস্থায় শুয়ে থাকতে দেখব! ইনাম ছিল আমার প্রাণের বন্ধু। মঞ্চ, টেলিভিশন দু মাধ্যমেই তার সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। মানুষটা নাটককে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। এমন ভালোবাসা খুব কম মানুষের মধ্যেই পেয়েছি। তাই তো সে নাটকের জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে মানুষের হৃদয়ে।

প্রকৃত বাঙালি ছিলেন

আতাউর রহমান

১৯৬৮ সালে আমরা একসঙ্গে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় শুরু করি। জিয়া হায়দার ছিলেন সভাপতি, আমি সাধারণ সম্পাদক। তখন মঞ্চনাটক করা খুব কঠিন ছিল। তাই টিভিতে জিয়া হায়দারের নির্দেশনায় ড. ইনামুল হকের তত্ত্বাবধানে বিটিভিতে ইদিপাস নাটকটি করেছিলাম। আমি ছিলাম কেন্দ্রীয় চরিত্রে, সে করেছিল বৃদ্ধ মেষপালকের চরিত্র। এরপর নাগরিক থেকে আমার নির্দেশনায় ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’, ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’সহ অনেক সাড়া জাগানো নাটকে তার অভিনয় ভীষণ আলোচিত হয়। আলী যাকের, আবুল হায়াত, লাকী ইনামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মঞ্চে অভিনয় যুদ্ধ চলত তার। তখন থেকেই সে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এরপর টিভি নাটকেও নানামাত্রিক চরিত্রে নিজেকে বারবার মেলে ধরেছে। অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিল। পরে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমেস্ট্রিতে পিএইচডি শেষ করে ১৯৬৫ সালে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেয় বুয়েটে। একজন ভালো মানুষ, ভালো অভিনেতা, ভালো নাট্যকার, ভালো স্বামী, ভালো বাবা ও ভালো শিক্ষক ছিল সে। ছাত্রজীবনে আমি, মতিয়া চৌধুরী ছাত্র ইউনিয়ন করতাম, তবে সে ছাত্রলীগই করত। তখন ফজলুল হক হলের ছাত্র ছিল সে। আমি ছিলাম শহীদুল্লাহ হলের ছাত্র। মোটকথা ছাত্রকাল থেকেই আমাদের ওঠাবসা। সে প্রকৃত বাঙালি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরও গুণমুগ্ধ। দেশের নাট্যাঙ্গনে তার অবদান অনস্বীকার্য। স্বীকৃতি স্বরূপ একুশে পদকও পেয়েছে। বিশেষ করে তার লেখা অসংখ্য মুক্তিযুদ্ধের নাটকের মধ্য দিয়ে সে বেঁচে থাকবে। তার নাটকে এত বিশদভাবে পারিবারিক সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে যা হুমায়ূন আহমেদের নাটকেও নেই। আমরা একজন প্রকৃত নক্ষত্রকে হারালাম।

আমাদের সম্পর্ক আত্মার

আবুল হায়াত

আমার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। ইনামুল হকের সঙ্গে ছিল আমার অন্যরকম আত্মার সম্পর্ক। মুক্তিযুদ্ধের অনেক আগে থেকেই তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শুরু। সে যখন বুয়েটের শিক্ষক হয়ে আসে, আমি তখন বুয়েটের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তবে সে সরাসরি আমাকে পড়ায়নি। তার আগে থেকেই আমরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। গত ১৫দিন আগেও ফোনে কথা হলো। আমি তো করোনাকালে তাও টুকটাক শ্যুটিং করেছি। ও একেবারেই ঘর থেকে বের হতো না। সেদিন ফোনে কত গল্প করলাম। দিব্যি ভালো মানুষ, তেমন কোনো শারীরিক অসুবিধা ছিল না। ব্যাক পেইনের সমস্যা, সে তো বহু পুরনো। ওটা তেমন কিছু ছিল না। তার হুট করে এভাবে চলে যাওয়া মানতে পারছি না। সেদিন আমাকে বলছিল, কতদিন দেখা হয় না। আবার কবে একসঙ্গে কাজ করব! অনেকগুলো ইংরেজি বইয়ের অনুবাদ করেছে সম্প্রতি, সে কথাগুলোই আনন্দের সঙ্গে বলছিল। এমনি মানুষ ছিল সে। অল্পতেই খুশি হতো। শিল্পের প্রতি তার প্রেম ছিল দেখার মতো। আমরা রাস্তাঘাটে, মাঠে-ময়দানে একসঙ্গে কত নাটক করেছি। শহীদ মিনার, বাংলা একাডেমি অনেক জায়গায় বিপ্লবের নাটক করেছি। টিভিতেও অসংখ্য নাটকে একসঙ্গে অভিনয় করেছি। হুমায়ূন আহমেদের ‘এলাচি লবঙ্গ’ তখন খুব সাড়া ফেলেছিল।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com