বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ০৬:২৯ পূর্বাহ্ন

কিঞ্চিৎ কার্দাশিয়ান কথন

অনেক পয়সাওয়ালী তিনি। এ বছর এপ্রিলে ফোর্বস ম্যাগাজিন মাফিক জানা যায়, তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিত্তময়ী এমন নারীকে নিয়ে কৌতূহলই স্বাভাবিক। তিনি নিজে কি তা এনজয় করেন? এই সারাক্ষণ আলোচনায় থাকা? উত্তর কোথা পাই!

তার খোঁজ পেতে, কাজ, কাম আর গতর দেখতে উৎসুক লোকেরা ভিড় করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ইনস্টাগ্রামে তাই তার চেয়ে বেশি ফলোয়ার কারো নেই। সংখ্যায় তা প্রায় ৪০৬. ৪৪ মিলিয়ন। এ মাধ্যম থেকে তার অ্যাকাউন্টে ঢোকে অবিশ্বাস্য অঙ্কের মুদ্রা। গত বছরের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতিটি বিজ্ঞাপন মোড়ানো ইনস্টা পোস্টের জন্য তিনি আয় করেন প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার। টুইটারে এ নারীর ফলোয়ার সংখ্যা ৭০.৩ মিলিয়ন। ফেইসবুকে অনুসারী সংখ্যা ৩০ মিলিয়ন। এ লেখা পড়ার মুহূর্ত পর্যন্ত উল্লিখিত প্রতিটি সংখ্যা বাড়ছে বলাই বাহুল্য।

এ আলোচিতার জন্মদিন ছিল বৃহস্পতিবার। দেরিতে হলেও এখন পর্ব তার নাম বলে উইশ করার।

শুভ জন্মদিন, কিম কার্দাশিয়ান!

১৯৮০ সালের এই দিনে লস অ্যাঞ্জেলসে ভূমিষ্ঠ হন এখনের খুব চটকদার এ তারকা। তার পুরো নাম কিম্বার্লি নোয়েল কার্দাশিয়ান। পরিবারটি আর পাঁচ-দশটি খেটে খাওয়া মার্কিন মধ্যবিত্ত। শৈশবের কিমের সংসারে কোনো প্রাচুর্য ছিল না। বাবা ছিলেন আর্মেনিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান প্রজন্মের। মা’র রক্তে ছিল ইউরোপীয় ধারা। ম্যারিমাউন্ট হাই স্কুলে ভর্তি করানো হয় কিমকে। স্কুলে তার ছেলেবন্ধু সম্পর্কে জানা যায় না। লস অ্যাঞ্জেলসে অল গার্লস স্কুল নামে পরিচিত তার বিদ্যাপীঠ।

আলোচিতা মার্কিন সেলিব্রেটি প্যারিস হিলটনের সঙ্গে জড়িয়ে ঝলমলে মিডিয়া জগতে পথচলা কিমের। এটা ২০০৩ সালের ঘটনা। রিয়্যালিটি শো ‘দ্য সিম্পল লাইফ’-এ নিয়মিত দেখা যেত তাকে। টানা ৩ বছর এ কাজে রত ছিলেন কার্দাশিয়ান। পরে ক্যালিফোর্নিয়ায় দুই বোনকে সঙ্গে নিয়ে একটি বুটিক শপ চালু করেন তিনি। এর দোকানদারি করতেই হয়তো সারা জীবন কেটে যেত। কিন্তু বিধি নির্ধারিত ছিল ভিন্ন কিছু। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে সে ঘটনা।

২০০২ সালের দিকে কিম কার্দাশিয়ানের বয়ফ্রেন্ড ছিলেন মার্কিন সংগীত শিল্পী রে জে। এই যুগলের একান্ত কিছু মুহূর্তের ভিডিও টেপ প্রকাশিত হয়। যৌন বাণিজ্যে সয়লাব ইন্টারনেট দুনিয়ায় তা ছড়িয়ে পড়ে। লাস্যময়ী বিবেচিত হয়ে কিমের প্রথম ব্যাপক প্রচারে আসা। ‘কিম কার্দাশিয়ান, দ্য সুপার স্টার’ নামে ভিডিওটি সিনেমার আদলে প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের পর্নোগ্রাফিক ফিল্ম প্রোডাকশন প্রতিষ্ঠান ভিভিড এন্টারটেইনমেন্ট। কার্দাশিয়ান প্রথমে মামলা করেন কোম্পানির বিরুদ্ধে। কিন্তু কিম ও তার পরামর্শকদের মনে কী ছিল তা তিনিই ভালো জানেন! ৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে মামলা ফয়সালা হয়। সেক্সটেপটি প্রচারের সত্ত্ব পায় ভিভিড। অনেকে অর্থলিপ্সু কিমের প্রতি ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু কিমের তাতে কী! অ্যাকাউন্টে কারেন্সি ঢোকা নিয়ে কথা।

২০০৭ সালের অক্টোবরে সপরিবারে রিয়্যালিটি শো নিয়ে হাজির হন কিম কার্দাশিয়ান। তিনি তখন ‘হটকেক’। অনুষ্ঠানের নাম ‘কিপিং আপ উইথ দ্য কার্দাশিয়ানস’। ব্যাপক মুনাফা করে প্রচারক চ্যানেল। একই বছর ডিসেম্বরে আরেক দফা নিজেকে উন্মুক্ত করেন কিম। প্লেবয় ম্যাগাজিনের কভারে নগ্ন শরীরে শোভিত হন তিনি। এ করে কত ডলার কামান এর পরিমাণ অবশ্য অজ্ঞাত থাকে। তবে দুনিয়া টের পায় প্রভাবশালী এক নগ্নিকার আগমনী।

এরপর একের ধাপ ডিঙিয়ে কিমের আজকের পর্যায়ে আসা। ২০১৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকার কিম কার্দাশিয়ানের নাম থাকে। সে বছর তার উপার্জন ছিল ৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।

সারাক্ষণ আলোচনায় থাকা কিমের স্বভাব, না কি তা সংবাদমাধ্যমের কর্তব্য তা জানি না। শুধু দেখি অহর্নিশ মিডিয়া তাড়া করে এ নারীকে। তার ত্বক, ঠোঁট, স্তন, নিতম্ব, অস্ত্রোপচার, কাপড় পরা, কাপড় খোলা, চুম্বন, সম্পর্ক, বিয়ে, সন্তানধারণ, বিচ্ছেদ, আবার বিয়ে, আবার বিচ্ছেদ, শরীর চর্চা, সূর্যস্নান, সমুদ্রস্নান – সবই উন্মুক্ত। টোয়েন্টিফোর সেভেন কিম যেন সরাসরি সম্প্রচারিত। তাকে মনে হয় সংবাদ শিরা। সময়ের মোক্ষম জনবশকারিনী।

অনেক সমালোচনা হলেও কেউ অগ্রাহ্য করতে পারবেন না কিমকে। এন্টারপ্রেইনর হয়ে সফল তিনি। অজস্র এনডোর্সমেন্ট, টিভি শো, ফ্যাশন বাণিজ্য, সুগন্ধি ব্যবসা নিয়ে তিনি পসরা সাজিয়ে শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে।

পর্নোগ্রাফি ছাড়াও কিম কার্দাশিয়ান একাধিক হলিউড ভেঞ্চারে কাজ করেছেন। কিন্তু তার অভিনীত কোনো সিনেমা হিট হয়নি। তিনি গান গেয়েছেন। সমালোচকেরা তা রেখেছেন ‘ওয়োর্স্ট সিঙ্গার’ ক্যাটাগরিতে। আবার তার দেহ খচিত মিউজিক ভিডিও মিলিয়ন ভিউ রিচ ছাড়িয়েছে। তার আত্মজীবনী ‘কার্দাশিয়ান কনফিডেন্সিয়াল’ নিউ ইয়র্ক টাইমসের বহুল বিক্রীত বইয়ের তালিকায়।

কিম কার্দাশিয়ানের জীবনে পুরুষ এসেছে বহু। বিবাহ ও তা বহির্ভূত। তবে এর ভেতর সবচেয়ে বেশি আলোচিত র‌্যাপার কেনি ওয়েস্ট। বিচ্ছেদ হলেও নামে এখনো তিনি ধারণ করেন ‘ওয়েস্ট’ পদবি। সে বিবাহ ছিল যেমন ঘটা করে, বিচ্ছেদ তেমন সাড়া ফেলে। তাতে মুদ্রা গেছে। কিন্তু অন্য কিছুই আসে যায়নি। তিনি রয়েছেন কোটি পুরুষের ঘুম হরণকারী রূপেই।

লাস্যময়ী কিম কার্দাশিয়ানকে বিরাজনীতিকরণের সুযোগ নেই। ২০১৬ এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে সমর্থন করেন। সম্পর্ক তার আবার সবার সঙ্গে। ওবামা, ট্রাম্প, বাইডেনদের নিকটবর্তী হয়েছেন নানা ইস্যুতে। কিম কার্দাশিয়ান ইসরায়েল সফর করেছেন একাধিকবার।

বাবার রক্তধারায় তিনি আর্মেনিয়ান। অটোমান সাম্রাজ্য কর্তৃক আর্মেনিয় গণহত্যার স্বীকৃতির বিষয়ে তিনি সোচ্চার। আর্মেনিয়ান কমিউনিটি অগ্রসরতার লক্ষ্যে ব্যয় করেন বহু ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অহরহ চলতে থাকা বন্দুকধারী ঘটিত হত্যাকাণ্ডের কট্টর সমালোচক এই ৪ সন্তানের জননী।

একচ্ছত্র ডলার সর্বস্ব অমিত ভোগের দুনিয়ায় কিম কার্দাশিয়ানকে উপেক্ষা করা যায় না। তার ভেতর প্রতিবিম্বিত হয় পশ্চিমের সমসময়। সে বিচারে তিনি কেবল নিথর ‘সেক্সটয়’ নন। বরং তার ইন্দ্রিয়, তার মনন, তার প্রকাশ ভীষণ রকম রক্তমাংসে জীবন্ত। আর তা গোপন হবে একান্ত সত্যের বরখেলাপ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com