মঙ্গলবার, ০৭ Jul ২০২৬, ০৯:১২ পূর্বাহ্ন

পুনর্গঠন হচ্ছে হেফাজত, শফি অনুসারীরা বাদ?

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : দেশের সর্ববৃহৎ ও ধর্মীয় শীর্ষ সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সম্মেলন (কাউন্সিল) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী রবিবার। ১৫ নভেম্বর সকালে অনুষ্ঠিত হবে হাটহাজারী মাদরাসার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। হেফাজতের কাউন্সিলকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে শীর্ষ এ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এ সম্মেলনে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির দেশের শীর্ষ আলেম প্রয়াত আল্লামা শাহ আহমদ শফির (রহ.) অনুসারী নেতাদের বাদ দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের নীল নকশা করা হচ্ছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা অভিযোগ করেন।

২০১০ সালে নারী নীতিমালা নিয়ে বিরোধ থেকে হেফাজতের আত্মপ্রকাশ ঘটে। জন্মলগ্ন থেকেই আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)। গত ১৮ সেপ্টেম্বর আমিরের মৃত্যুর পর পদটি শূন্য হয়। এর পর থেকে আমিরের এ পদের জন্য তোড়জোড় চলছে। কে বসছেন শীর্ষ এ পদে- এমন প্রশ্ন সবার মুখে মুখে।

চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসায় হেফাজতের মূলকেন্দ্র। এ কেন্দ্রকে ঘিরে যেকোনো আন্দোলনের ডাক হাটহাজারী থেকে হয়। কিন্তু বর্তমানে বেশির ভাগ অংশ চাচ্ছে ঢাকায় মূলকেন্দ্র করতে, এমন দাবি নাম প্রকাশে হেফাজতের কয়েকজন নেতার।

এদিকে আগামী রবিবার হেফাজতের কেন্দ্রীয় সম্মেলন (কাউন্সিল) উপলক্ষে সারা দেশ থেকে কওমি অঙ্গের শীর্ষ আলেমরা কাউন্সিলে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসায় হেফাজতের এ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। হেফাজতের প্রায় ৩৬০ জন কেন্দ্রীয় শীর্ষ মুরুব্বিরাই ঠিক করবেন কে প্রয়াত আল্লামা আহমদ শফির স্থলাভিষিক্ত হবেন।

এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে ঘিরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা সমালোচনা। আমিরের পদে বেশির ভাগ নেতাকর্মী বর্তমান মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সমর্থন করলেও নগরীর লালখান বাজার মাদরাসার পরিচালক মুফতি ইজহার হেফাজতের আমির পদের জন্য আটঘাট বেঁধে নেমেছেন। মুফতি ইজহার তার দুই ছেলেকেও হেফাজতের নেতৃত্বে আনতে আগ্রহী। তবে মুফতি ইজহারের বড় ছেলে হারুন ইজহার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। হেফাজতের মহাসচিব পদ নিয়েও চলছে নানা গুঞ্জন, এ পদটির জন্য টারজনের নাম শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত ঢাকার বারিধারার এক শীর্ষ হেফাজত নেতাকে দেওয়া হতে পারে বলে একাধিক সূত্রে প্রকাশ।

হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির ও দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার সাবেক মহাপরিচালক শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তারপর থেকে হেফাজতের আমিরের পদটি শূন্য রয়েছে। মূলত এরপর থেকেই হেফাজত প্রতিষ্ঠার ৮ বছরের মাথায় এসে কাউন্সিলের আলোচনা শুরু হয়।

জানা যায়, ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয়েছিল চট্টগ্রামকেন্দ্রিক কওমি আকিদাপন্থী অরাজনৈতিক ইসলামী সংগঠন হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ। যদিও-বা পরে অরাজনৈতিক এ সংগঠনটি রাজনৈতিক ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। হটহাজারীর দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদরাসার প্রয়াত মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফিকে আমির ও মাদরাসার তৎকালীন সিনিয়র মুহাদ্দিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে মহাসচিব করে হেফাজতের ২২৯ সদস্যের মজলিশে শুরা কমিটি গঠন করা হয়েছিল সেই সময়। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে হেফাজতের আত্মপ্রকাশ হলেও সংগঠনটি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে ১৩ দফা দাবিতে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বর অবরোধের মাধ্যমে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হেফাজত সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি হেফাজত মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর সাথে সাক্ষাত করে নগরীর লালখান বাজার মাদরাসার পরিচালক মুফতি ইজহার তাকে হেফাজতের আমির করার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন এবং তার ছেলেদ্বয়কে (মুফতি হারুন ইজহার ও মুসা ইজাহার)-কে যুগ্ম মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদক রাখার জন্য দাবি জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়টি অস্বীকার করে হারুন ইজহার কালের কণ্ঠকে বলেন, ইসলামে কোনো পদ চেয়ে নেওয়া নিষেধ, এটি সঠিক নয়। তিনি বলেন, আমি বর্তমানে হেফাজতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। নতুন পদ পাওয়া না-পাওয়াকে তিনি চলমান প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেন।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, আগামী ১৫ নভেম্বর হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এ সম্মেলনকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে সারা দেশে। গুরুত্বপূর্ণ এ পদে যিনি আমির নির্বাচিত হবেন তাকে নিয়েই হেফাজতের পুনর্গঠন হবে। হেফাজত ফিরে পাবে পূর্বের সেই প্রাণ।

তিনি আরো বলেন, এর মধ্যে সম্মেলনকে ঘিরে আমাদের প্রস্তুতি শেষপর্যায়ে। সারা দেশের ৬৪টি জেলা থেকে হেফাজতের শীর্ষ নেতারা সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন। সেখানে তাদের মতামতের ভিত্তিতে আমাদের আমির নির্বাচিত করা হবে। আল্লামা শফির অনুসারীদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি সঠিক নয়। সংগঠনের প্রয়োজনে কারো কারো পদোন্নতি কিংবা অবনতি হতে পারে। এটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে হয়ে থাকে। মুফতি ইজহার আমির পদে আসছেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের সংগঠনে কোনো প্রাথী কিংবা ভোট প্রদানের নিয়ম নেই, কাউন্সিলে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের তাৎক্ষণিক মতামতের ভিত্তিতেই কমিটি গঠন হবে।

এদিকে হেফাজতের আমির আল্লামা শফির পুত্র মাওলানা আনাস মাদানি হেফাজতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে থাকলেও কাউন্সিল নিয়ে তার তেমন ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। আল্লামা শফির মৃত্যুর পর থেকে তিনি অনেকটা নীরব রয়েছেন। বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তাকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হেফাজতের প্রথম সারির কয়েকজন নেতা দাবি করেন, আল্লামা শাহ আহমদ শফির অনুসারীদের হেফাজত থেকে মাইনাস করতে চেষ্টা করছে। কিন্তু ক্ষণিকের এ মহোৎসব বেশিদিন টিকবে না। হেফাজত হবে আপামর সকল তৌহিদি জনতার। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠির নয়।

আল্লামা শফির অনুসারী হিসেবে পরিচিত হেফাজতের যুগ্ন মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহি কালের কণ্ঠকে বলেন, আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.) হেফাজতে ইসলামকে মুসলমানদের ইমান-আকিদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ একটি প্লাটফরম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই হেফাজতকে ক্ষমতালোভী একটি গোষ্ঠীর পকেট কমিটিতে রূপান্তর করা হচ্ছে।

কমিটিতে আল্লামা শফি, মুফতি আমিনি ও চরমোনাই পীর অনুসারীদের বাদ দেওয়ার নীল নকশা করা হচ্ছে উল্লেখ করে মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহি বলেন, গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ পর্যন্ত যারা হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির ও কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের চেয়ারম্যান শাহ আহমদ শফির সঙ্গে যারা সর্বোচ্চ বেয়াদবি ও অমানবিক আচরণ করতে বেশি উৎসাহিত ছিলেন, হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনে তাদেরই স্থান ও বেশি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। হেফাজতের গঠনতন্ত্র ভঙ্গ করে মাওলানা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে কাউন্সিলের আহ্বায়ক করা হয়েছে অথচ তিনি ২ বছর পূর্বে ২০১৭ সালে হেফাজত থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। রুহি প্রশ্ন রাখেন- একজন পদত্যাগী নেতা কিভাবে কাউন্সিলের আহ্বায়ক হন

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com