শুক্রবার, ০৩ Jul ২০২৬, ০৯:৪৩ পূর্বাহ্ন
৭৪তম কান চলচ্চিত্র উৎসব শেষ করে বেশ কদিন আগে দেশে ফিরেছে বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা হিসেবে অফিশিয়াল সিলেকশন পাওয়া ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর পুরো টিম। কানে থাকাকালে সিনেমাটির মুখ্য অভিনয়শিল্পী আজমেরী হক বাঁধন অসংখ্য স্মৃতি শেয়ার করেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেগুলো নিয়ে ভক্ত-দর্শক থেকে শুরু করে শোবিজ, মিডিয়া সব জায়গাতেই দারুণ আগ্রহ লক্ষ করা গেছে। কিন্তু বাঁধনের জীবনের এই অবিস্মরণীয় জার্নি, তার সব কথা তো আর সবাইকে বলা সম্ভব নয়। তেমনি কিছু কথা, কিছু স্মৃতি ও অনুভূতি মেলে ধরেছেন দেশ রূপান্তরকে। বাঁধন বলেন, ‘সারা জীবন আমাকে অনেক ধরনের হিউমিলিয়েশন, অনেক ধরনের অসম্মান, অনেক ধরনের বিব্রতকর অবস্থার শিকার হতে হয়েছে। আল্লাহ আমাকে সেই সব বাজে অভিজ্ঞতার প্রতিদান দিয়েছেন এই কান উৎসবের মাধ্যমে। এত সম্মান পেয়েছি, বলে বোঝাতে পারব না। আমি সত্যিই পরিচালক সাদের কাছে কৃতজ্ঞ যে আমাকে দিয়ে রেহানার মতো একটি চরিত্র করিয়েছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে আমার সঙ্গে কাজ করা খুব সহজ। আমার ব্যক্তিজীবনে নানা সমস্যা, ডিপ্রেশন, রাগ সবকিছু মিলিয়ে আই অ্যাম নট ইজি টু হ্যান্ডেল। শ্যুটিংয়ের সময় হয়েছেও তাই। কিন্তু সাদ ধৈর্যের সঙ্গে কাজটি করেছে। সে একবারের জন্যও বলেনি যে তোমাকে কাস্ট করা ভুল হয়েছে। আমি বরং বলতাম, আমাকে নিয়েছ কেন? কারণ কাজটি সত্যি খুব কষ্টকর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রেহানা মরিয়ম নূরের সঙ্গে আমার জীবনের অন্য কাজের কোনো তুলনা করাটাও ঠিক না। কারণ ওটা অন্য রকম অভিজ্ঞতা। কারণ পরিচালক সাদের সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। তার মধ্যে কোনো লোভ নেই।’
বাঁধনের কান অভিজ্ঞতার মধ্যে অন্য রকম সাড়া পেয়েছে হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শ্যারন স্টোনের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি। এ নিয়ে বাঁধন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৬ জুলাই দুপুরে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পক্ষ থেকে একটি অফিশিয়াল লাঞ্চের আয়োজন করা হয় এবারের উৎসবে আমন্ত্রিত সব অতিথির জন্য। সেখানেই উপস্থিত ছিলেন শ্যারন স্টোন। তাকে দেখে আমি মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ি। শুধু আমি কেন, তার ভক্ত কে নয়? এত কাছ থেকে এই বিশাল মাপের অভিনেত্রীকে দেখছি আর একটু কথা বলব না বা কোনো স্মৃতি থাকবে না, সেটা কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। এ ব্যাপারে আমি সবচেয়ে কৃতজ্ঞ এবারের কানের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমোর কাছে। তিনিসহ কান কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই তো আমাদের সিনেমা রেহানা মরিয়ম নূরের সম্মানজনক প্রিমিয়ার হয়েছে। ফলে তিনি আমাকে স্বনামেই চেনেন। তাকে গিয়ে বললাম, ‘আমি শ্যারন স্টোনের অনেক বড় ভক্ত। তার সঙ্গে কি একটু কথা বলতে পারি?’ তখন থিয়েরি ফ্রেমোই আমাকে শ্যারন স্টোনের কাছে নিয়ে গেলেন। আমি তাকে জানালাম, আপনার অভিনয়ের প্রচন্ড ভক্ত আমি। আরও জানালাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি রেহানা মরিয়ম নূর সিনেমা নিয়ে। সেটি কোন বিভাগে সিলেক্ট হয়েছে, সেটিও বললাম। তিনি আমাকে কাছের মানুষের মতো আলিঙ্গন করলেন। বুঝতেই দিলেন না এত বড় তারকা তিনি। আসলে কানে গিয়ে নতুন একটি উপলব্ধি হয়েছে। কত বড় মাপের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কিন্তু তারা প্রত্যেকেই নিরহংকারী। সবার সঙ্গে এত আন্তরিকভাবে মেশেন, এত বড় মনের মানুষ বলেই তারা এত বড় উচ্চতায় যেতে পেরেছেন। এটি আমি তাদের কাছ থেকে শিখেছি যে আমি যা কিছুই অর্জন করি না কেন, সেটা আমার নিজের ব্যবহারে যেন প্রকাশ না পায়। সেটি বলবে অন্য মানুষ।’
বাঁধনের ফেইসবুকে আরও একটি ছবি দেখা যাচ্ছে বিশে^র অন্যতম মেধাবী অভিনেতা বিল মরের সঙ্গে। সেই অভিজ্ঞতাও জানালেন তিনি, ‘বিল মরের সঙ্গেও একই দিনে দেখা। রেহানা মরিয়ম নূর করার আগে সাদ আমাকে তার ‘লস্ট ইন ট্রান্সলেশন’ সিনেমাটি দেখতে বলেছিল। আমি প্রথমে তাকে চিনিনি। সাদ আমাকে বলল, ওই দেখো বিল মরে। আমি অস্থির হয়ে গেলাম তার সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু কীভাবে কথা বলব, কী বলব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। এমন সময়ে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটল। অবাক হলাম, তিনি নিজেই আমাদের কাছে এলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে আমাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি তাকেও বললাম, তার কাজের বড় ভক্ত আমি। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুললেন। তখন মুখে ‘লস্ট ইন ট্রান্সলেশন’ সিনেমার সেই এক্সপ্রেশন চলে আসছিল।’
আসছে ১৩ আগস্ট কলকাতার জনপ্রিয় ওয়েব প্ল্যাটফর্ম হইচইয়ে মুক্তি পাবে সৃজিত মুখার্জি পরিচালিত বাঁধন অভিনীত প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে খেতে আসেনি’। নতুন কাজ নিয়ে কী ভাবছেন জানতে চাইলে বাঁধন বলেন, ‘রেহানার মতো একটা ছবিতে সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন নারীর, বিশেষ করে আমার বয়সী নারীর জন্য প্রায় অসম্ভব। কারণ এমন একজন পরিচালক নেই যিনি এমন নারীপ্রধান চরিত্রে ভাববেন। এ ধরনের সুযোগ আর না-ও পেতে পারি। তবে কাজ তো করতেই হবে। কিন্তু অবশ্যই আমার আগের কাজের থেকে সেগুলো আলাদা হবে। এখন আমি স্বাধীন, সেটি উপলব্ধি করতে পেরেছি। কাজ সিলেক্ট করার স্বাধীনতাও আমার। সাদের সিনেমার সময় অনেকে আমাকে উপদেশ দিয়েছে, কী এমন সিনেমা যে এত সময় দিতে হবে! কেন একটা কাজ নিয়ে পড়ে আছি, কেন অনেক কাজ করছি না, কেন এই পোশাক পরছি, কেন কার সঙ্গে কোথায় যাচ্ছি, ব্যক্তিজীবন সবকিছুতেই যে আমাদের সমাজের নাক গলানোর বাজে স্বভাব, সেটিই বোঝে না অনেকে। আমি এখন বুছে গেছি, ওটা তাদের সমস্যা। তাই আমি ওসব কথা গায়ে না মাখিয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চাই, স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাই।’