বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০২:১৫ অপরাহ্ন

করোনা থেকে সুস্থ হবার পর দীর্ঘমেয়াদী যেসব জটিলতা হচ্ছে

ঢাকার বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনা ইউনিটের চিকিৎসক সাজ্জাদ হোসেন বলছেন, পোস্ট কোভিড সিনড্রোমে অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন এবং এর মধ্যে কারও কারও অবস্থা আরও জটিল হচ্ছে সময়মতো ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে।

এই পোস্ট কোভিড সিনড্রোমই লং কোভিড হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে গত বছরের মার্চে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর বিষয়টি নজরে না এলেও গত বছরের শেষ দিকে এসে এবং চলতি বছরের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ার পর লং কোভিডে অনেককেই ভুগতে দেখা যাচ্ছে, বলেন চিকিৎসকরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবে দেশে এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এখন পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩ জন। আর এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ২১ হাজার ৩৯৭ জনের। অন্যদিকে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ১১ লাখ ২৫ হাজার ৪৫ জন। এই সুস্থ হওয়াদের অনেকেই আবার চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হচ্ছেন নানা জটিলতা নিয়ে।

ডা: সাজ্জাদ হোসেন বলছেন সাম্প্রতিক সময়ে করোনায় আক্রান্ত হবার পরে সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর আবার হাসপাতালে আসছেন অনেকে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে বলে মত এই চিকিৎসকের।

করোনা রোগীদের নিয়ে কাজ করা এই চিকিৎসক বলছেন, করোনা থেকে সুস্থ হওয়া ব্যক্তিরা মূলত কয়েকটি সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এগুলো হলো:

• কোভিড নিউমোনিয়া

• হাইপারটেনশন

• ফাঙ্গাল ইনফেকশন

• ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন

• নিউরোজিক্যাল সমস্যা

• হৃদরোগ

• লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া

• কিডনিতে সংক্রমণ

ডা: সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা এমন রোগী পেয়েছি যার ফুসফুসের ১০-১২ শতাংশ সংক্রমণ হয়েছিলো। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পরে আবার যখন অসুস্থ হলো তখন দেখলাম যে ৭০% পর্যন্ত ফুসফুস ড্যামেজ।’

তিনি বলেন, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে অনেকের ফুসফুস ছোট হয়ে যায়। এ পর্যায়ে যথাযথ চিকিৎসা না হলে নানা জটিলতা তৈরি করে। করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার পরে অনেককে হার্ট, লিভার ও কিডনি  জটিলতায় পড়তে হচ্ছে।

কানাডা ভিত্তিক চিকিৎসক এবং সেন্টার ফর রিসার্চ, ইনোভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাকশনের ডা: শাহরিয়ার রোজেন বলছেন, বাংলাদেশে লং কোভিড বলতে ফুসফুস কেন্দ্রিক সমস্যাই বেশি হচ্ছে, অনেকের দীর্ঘদিন কাশি থাকছে।

‘তবে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন এমন বয়স্কদের সাথে অনেক তরুণও শরীরে যেমন শক্তি পাচ্ছেনা, তেমনি তাদের মধ্যে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। আবার অনেকে নতুন করে ডায়াবেটিস বা হাইপারটেনশনের মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন যা কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার আগে তাদের ছিলো না’ বলছিলেন তিনি।

তিনি বলেন, খুব কম সংখ্যায় হলেও সুস্থ হওয়ার পর কারও কারও মধ্যে রক্ত জমাট বাধার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যা স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

লং কোভিডের লক্ষণগুলো কী?
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর ১২ সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও যদি রোগীর দেহে অসুস্থতার লক্ষণ রয়ে যায় তাহলে ধরে নিতে হবে তার ‘লং কোভিড’ হয়েছে।

ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার তথ্য অনুযায়ী লক্ষণগুলো হচ্ছে:

১. চরম ক্লান্তি বা অবসন্নতা।

২. শ্বাস নিতে কষ্ট বা হাঁপিয়ে ওঠা, হৃৎপিণ্ডের ঘন ঘন স্পন্দন বা বুক ধড়ফড় করা, বুকে ব্যথা বা টানটান ভাব।

৩. স্মৃতি শক্তি বা মনঃসংযোগের সমস্যা। যাকে বলা হয় ‘ব্রেন ফগ’ বা বোধশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া।

৪. স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতিতে পরিবর্তন।

৫. হাড়ের জোড়ায় ব্যথা।

তবে, এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত বৃহত্তম জরিপটি চালিয়েছে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল)। তারা লং কোভিডে আক্রান্ত লোকদের ১০টি প্রত্যঙ্গে আঘাত হানে এরকম ২০০টি লক্ষণ চিহ্নিত করেছেন।

লং কোভিডের চিকিৎসা কী
ডা: সাজ্জাদ হোসেন বলছেন হার্ট, লিভার কিংবা কিডনির ক্ষেত্রে নিয়মিত চিকিৎসা পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হয়। তবে পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়ে গেলে অনেক সময় জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই সবাইকে আগেই সচেতন হওয়া দরকার। বিশেষ করে সুস্থ হওয়ার পরেও নিয়মিত ফলোআপ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা প্রতিনিয়তই লং কোভিড থেকে মুক্ত থাকতে করণীয় বা প্রতিরোধ বিষয়ে নানা ধরণের পরামর্শ দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে:

• করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকা গ্রহণ করা

• ফুসফুসের ব্যায়াম করা

• পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ

• অক্সিজেনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে দরকার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com