রবিবার, ২৮ Jun ২০২৬, ১১:২৬ পূর্বাহ্ন
মাথার ওপর খাড়া রোদ। ধুলায় অন্ধকার চারপাশ। সড়কে আটকে আছে গাড়ির সারি। হিউম্যান হলার (লেগুনা) থেকে নেমে হাঁটার পথও খুঁজে পাচ্ছেন না হাফিজুর রহমান।
ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডে উড়ালসেতুর নিচে ছায়ায় দাঁড়িয়ে স্বস্তি খুঁজছিলেন শফিকুল ইসলাম। গরমে ঘেমে বাস থেকে নেমে ছায়ায় দাঁড়িয়েও যেন নিস্তার পাচ্ছে না তিনি। ঘামের শরীরে ধুলা এসে বিরক্তি আরো কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে। শফিকুলকে বাড্ডা পর্যন্ত যেতে হবে। বংশাল থেকে বাসে উঠে আসন খালি না পেয়ে দাঁড়িয়ে এতটা পথ এসেছেন। ৫০ মিনিট বাসে দাঁড়িয়ে থেকে এখন ক্লান্ত তিনি। তাই আসন খালি না পাওয়া পর্যন্ত আর বাসে উঠছেন না তিনি।
হাফিজুর-শফিকুলের মতো ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যানজটে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। তাদের ভোগান্তির মাত্রা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে মাত্রাতিরিক্ত গরম আর সড়কের ধুলা। মানুষের এমন দুর্ভোগে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি। এসবের পেছনের হিসাব পাওয়া গেলেও যানজটের কারণে মানসিক যে ক্ষতি হয় সে হিসাব যেন কেউ রাখে না।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যানজট আমাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানা ক্ষতির কারণ, যা আমরা অনেক সময় বুঝতেও পারি না। যে লোকটা সকালে বাসা থেকে পরিষ্কার শার্ট পরে রাস্তায় বের হলো, অফিসে যেতেই তাঁর শার্ট যানজটে বসে গরমে ঘেমে ধুলায় নষ্ট হয়ে গেল। এতে তাঁর মেজাজ খারাপ হয়। মেজাজ খারাপের হয়তো কোনো অর্থনৈতিক ক্ষতি নেই; কিন্তু সামাজিক ক্ষতি রয়েছে। ’
শামছুল হক বলেন, ‘যানজটে শুধু কর্মঘণ্টা নষ্ট বা আর্থিক ক্ষতিই হচ্ছে না, এতে জীবনযাত্রার মানের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। যানজটের ফলে যে সামাজিক ও মানসিক ক্ষতি হচ্ছে, সেটার হিসাব কিন্তু আমরা করছি না। ’
খানাখন্দ, ভাঙা সড়ক, নির্মাণকাজের জন্য রাস্তা ছোট হয়ে আসা, করোনা-পরবর্তী সময়ে সব প্রতিষ্ঠান খুলে যাওয়া, সড়কে অতিরিক্ত ছোট যান বেড়ে যাওয়া যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে ঢাকার আজিমপুর, মিরপুর, ফার্মগেট, পল্টন, গুলিস্তান, রামপুরা, মগবাজার, বংশাল, শান্তিনগর, বিমানবন্দর সড়ক, মহাখালীসহ বেশ কিছু এলাকার প্রধান সড়ক ঘুরে যানজটের প্রায় একই চিত্র দেখা যায়।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মো. তুরাগ। থাকেন বাড্ডা এলাকায়। অফিসের কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিনই তাঁকে আগারগাঁও যেতে হয়। তুরাগের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আগে বাসা থেকে আগারগাঁও যেতে মোটরসাইকেলে ৩০-৩৫ মিনিট সময় লাগত। সেখানে আজ (গতকাল) এক ঘণ্টা ৩৫ মিনিটে এসেছি। ’
তুরাগের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশ থেকে আরেক মোটরসাইকেল চালক বলে ওঠেন, ‘আগে শুধু অফিস টাইমে এমন লম্বা যানজট তৈরি হতো। এখন এখন সকাল ৯টায় যেমন যানজট থাকে, রাত ১১টায়ও তেমনই থাকে। ’
দিগুণ সময়েও গন্তব্যে পৌঁছানো যাচ্ছে না বলে জানান আনোয়ার মিয়া। মালিবাগে ব্যবসা করেন তিনি। দোকানের পণ্য কিনতে গিয়েছিলেন চকবাজারে। আনোয়ার বলেন, ‘জান শেষ। চিপাচাপা গলি থেকে শুরু করে মেইন রাস্তা, সবখানেই যানজট। চকবাজারে যাইতে-আইতে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা লাগছে। ’
হুট করে এমন যানজট বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘রাজধানীর যানজট আগেও এমনই ছিল। ঢাকা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। পুরোদমে অফিস খোলার সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে যাওয়ায় যানজট এমন তীব্রতা পেয়েছে। তবে ছোট যানের নিবন্ধন বন্ধ করা গেলে যানজট কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।