রবিবার, ২৮ Jun ২০২৬, ০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন
ঠিকানাবিহীন “মান্তা” সম্প্রদায়, যাদের জীবনচক্র নৌকাকে কেন্দ্র করে আর জীবিকা মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল, সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের কল্যাণে তারা পেলেন স্থায়ী ঠিকানা। শতবছরেরও বেশি সময় ধরে পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভাসমান জীবনযাপন করে আসছে এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর লোকেরা। নৌকায় জন্ম এবং নৌকায়ই মৃত্যু তাদের। এটাই ছিল তাদের নিয়তি।
যুগ যুগ ধরে তাদের এই ব্যতিক্রমধর্মী জীবনযাত্রা থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে একটি স্থায়ী ঠিকানা পাওয়া ছিল তাদের আজন্ম স্বপ্ন। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে ভূমিহীনদের ঘর প্রদান পূরণ করেছে তাদের সেই স্বপ্ন। এখন তারা জায়গাসহ ঘরের মালিক, যা ছিল তাদের স্বপ্নের অতীত।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সকলের জন্য আবাসন নিশ্চিত করার স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে “মান্তা” সম্প্রদায়ের ২৯টি পরিবারকে আবাসন প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। বঙ্গবন্ধু কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আশ্রয়ণ প্রকল্প চালু করেন।
রাঙ্গাবালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাশফাকুর রহমান বলেন, “সরকার প্রাথমিকভাবে ২৯টি মান্তা পরিবারকে পুনর্বাসন করেছে। প্রথমে তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (কার্ড) এবং পরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ঘর দেওয়া হয়।”
সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী ইসলাম ধর্মাবলম্বী মান্তারা ঐতিহ্যগতভাবে নৌকার মানুষ। তবে তাদের অনেকেই কয়েক দশক আগে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে নৌকার জীবন গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।
সত্তরোর্ধ আমির আলী সরদার বলেন, “আমার দাদা ভাঙনের কারণে ভাসমান জীবনযাপন শুরু করেন। ৭০ বছর আগে একটি নৌকায় আমার জন্ম হয়েছিল।” তিনি বলেন , প্রমত্তা কালাইয়া নদীতে তার দাদার বসত বাড়ি বিলীন হয়ে যায়।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের একজন আমির আলী সরদার নৌকায় বিয়ে করেন এবং তার তিন সন্তানও নৌকায় জন্মগ্রহণ করে এবং বেড়ে ওঠে। একটি নৌকায় তার জীবনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে আবেগে তার কণ্ঠ ভারি হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, তার পরিবার কয়েক দফা জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হয় এবং তাদের ছোট নৌকাটি বেশ ক’বার উল্টে যায়।
তিনি বলেন, “পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে বাচ্চাদের নিয়ে নৌকায় থাকা বেশ কষ্টকর । একটু বেখেয়াল হলেই শিশুরা নদীতে পড়ে ডুবে যেত।”
সর্দার এখন কংক্রিটের তৈরি দুই কক্ষের একটি টিনের চালার ঘরে বসবাস করেন। দুই শতক জমিতে নির্মিত একটি রান্নাঘর, একটি টয়লেট এবং একটি বারান্দাবিশিষ্ট বাসার আইনী মালিক তিনি।
‘মুজিব বর্ষ’ উপলক্ষে পুরো দেশকে শতকরা ১০০ ভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনার একটি পৃথক সরকারি কর্মসূচির আওতায় ২৯টি মান্তা বাড়িও বিদ্যুত লাইনের সাথে সংযুক্ত রয়েছে।
সরদার বলেন, “আমাদের পানি থেকে তুলে আনার জন্য আমরা আমাদের মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ। এটা আমাদের স্বপ্নের বাইরে ছিল।”
আরেকজন মান্তা সম্প্রদায়ের সদস্য কাঞ্চন সরদার (৭০) বলেন, তাদেরকে ” সমাজচূত করা হয়েছে,এমনকি মসজিদেও যেতে দেওয়া হয়নি।
জুলেখা বেগম (৩৫), পাখি আক্তার (২৫), মিনারা বেগম (৪৫) এবং রোকেয়া বেগম (৩৫) যারা জন্মের পর থেকে একই রকম ভাসমান জীবনযাপন করে আসছিলেন, তাদেরও চরের জমিতে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
জুলেখা বেগম বলেন, “আমার বাবা, দাদা এবং আমি নৌকায় জন্মেছি। আমাদেরও বিয়েও নৌকায় হয়েছিল। আমার দাদা ও বাবা নৌকায় মারা যান।”
তিনি বলেন, যেহেতু মান্তাদের মৃতদেহ দাফনের জন্য কোনো কবরস্থান নেই, ফলে তার দাদা ও বাবাকে অন্যের জমিতে কবর দেওয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে জমির ব্যবস্থা করা ছিল খুবই কঠিন কাজ।
মিনারা নৌকায় তার তিন সন্তান, দুই মেয়ে ও এক ছেলের জন্ম দেন। তিনি বলেন, নৌকায় বাচ্চাদের লালনপালন করা খুব কঠিন, কারণ জলের জন্য তাদের জীবন খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি আরো বলেন, “আমরা আমাদের বাচ্চাদের দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতাম, যাতে তারা ডুবে না যায়।”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের ২০ জুন আমির এবং অন্য প্রাপকদের কাছে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘরগুলি হস্তান্তর করেন, একই সাথে তাদের দুই শতক জমির মালিকানা দলিলও সরবরাহ করেন।
স্থানীয় ইউএনও বলেন, “প্রকল্পের তৃতীয় ধাপের আওতায় চর মন্তাজে আরও ৩১টি পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন , সরকার তাদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছে। তারা ইতিমধ্যেই বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন ও শিক্ষার আওতায় এসেছে।