সোমবার, ২৯ Jun ২০২৬, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন
যানজট, জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা রাস্তা, সরু রাস্তা, মাদকের বিস্তার, অপরিকল্পিত বহুতল ভবন ও নাজুক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা—এই সাত সমস্যায় রয়েছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) বাসিন্দারা। সিটি করপোরেশন হওয়ার পরও নগরবাসী এসব সমস্যা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। উল্টো ক্রমাগত বাড়ছে সমস্যা। সিটি নির্বাচনে এবার কোন মেয়র পদপ্রার্থীকে ভোট দিলে এসব সমস্যার সমাধান হবে, শেষ সময়ে এসে সে হিসাব কষছেন ভোটাররা।
গত শনিবার ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপিপন্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকের নিজাম উদ্দিন কায়সার। গতকাল রবিবার ইশতেহার ঘোষণা করেন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু। আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা না করলেও আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী আরফানুল হক রিফাত ১১ দফা প্রতিশ্রুতির ঘোষণা দিয়েছেন। গত ৩০ মে তাঁর ঘোষিত ১১ দফার লিফলেটকেই তিনি ইশতেহার বলে দাবি করছেন। মেয়র পদে হেভিওয়েট তিন প্রার্থীই নগরীর প্রধান সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। করেছেন আরো অনেক উন্নয়নের অঙ্গীকার।
ভোটার ও নাগরিক প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রতিবছর নির্বাচন এলেই প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি দেন। এবার উন্নয়নের ফুলঝুরি নয়, যার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে—এমন প্রার্থীকে বেছে নেওয়ার কথা বলছেন ভোটাররা।
মেয়র পদপ্রার্থী আরফানুল হক রিফাত তাঁর ১১ দফায় সিটি করপোরেশনকে ঘুষমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। কুমিল্লার দীর্ঘদিনের সমস্যা জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসন করা হবে বলে জানান তিনি। আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা না করলেও তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ১১ দফার যে লিফলেট বা প্রচারপত্র বিলি করছি, ধরে নিন সেটাই আমার ইশতেহার। আমি মেয়র হলে এগুলো বাস্তবায়ন করব। আনুষ্ঠানিকভাবে আর কোনো ইশতেহার ঘোষণা করার পরিকল্পনা নেই। ’
গতকাল নানুয়ারদীঘির পারের নিজ বাসভবনে ইশহেতার ঘোষণা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু বলেন, ‘গত নির্বাচনে আমি নগরীর জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনসহ মোট ২৭ দফা ইশতেহার দিয়েছিলাম। ওই ইশতেহারের ৭০ শতাংশ কাজ করতে সক্ষম হয়েছি। এবার নির্বাচিত হলে বাকি ৩০ শতাংশ কাজ শেষ করে ভোটের মাঠ থেকে বিদায় নেব। ’
এবার ১৮ দফা ইশতেহারে তিনি নগরীর অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা ও যানজট দূর করা, সড়কবাতি লাগানো, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের কথা বলেছেন।
গত শনিবার নিজাম উদ্দিন কায়সার তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে আইসিটি ক্লাব স্থাপন, তথ্য-প্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং, সুশিক্ষায় স্মার্ট স্কুল, ২৪ ঘণ্টা অনলাইন স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি নগরীর যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসন, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের আশ্বাস দেন। কায়সার বলেন, ‘জলাবদ্ধতা দূরীকরণে খাল ও ড্রেনের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ করা হবে। যানজট নিরসনে আন্ডারপাস নির্মাণসহ ভিন্ন ভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। নগরীর চারদিকে বৃত্তাকার সড়ক করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। পার্কিং ঠেকাতে ভবনের অনুমোদনের বিষয়ে সিটি করপোরেশন সচেষ্ট থাকবে। রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করা হবে। ’
গত শুক্রবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত হাতপাখার প্রার্থী মাওলানা রাশেদুল ইসলাম রহমতপুরী প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। তিনিও নগরীকে যানজট, জলাবদ্ধতা ও দুর্নীতি মুক্ত করার কথা তুলে ধরেন।
নগরীর হাউজিং এলাকার বাসিন্দা তাবারক হোসাইন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় হাত বাড়ালে মাদক মেলে। কোথাও কোথাও প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে। এসব যেন দেখার কেউ নেই। আর এই এলাকার অনেক সড়ক বেহাল রয়েছে। যিনি মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন এবং আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান করবেন—এমন ব্যক্তিকে আমরা এবার মেয়র নির্বাচিত করতে চাই। ’
নগরীর কান্দিরপাড় এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন আকাশ বলেন, ‘নগরীতে যানজটের কারণে মানুষ এখন দিশাহারা। আর জলাবদ্ধতা এখন মানুষের গলার কাঁটা। মানুষ এখন কাগজের ইশতেহার আর প্রতিশ্রুতি দেখতে চায় না, দ্রুত সমস্যার সমাধান চায়। সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে—এমন ব্যক্তিকেই নির্বাচিত করবেন ভোটাররা। ’
‘২৭ ভাগের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসির নিচে’
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে কুসিক প্রার্থীদের তথ্য উপস্থাপন এবং অবাধ নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মহানগর ও জেলা শাখা। সেখানে বলা হয়েছে, কুসিক নির্বাচনের প্রার্থীদের ২৭ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসির নিচে। ১৬ শতাংশ এসএসসি, ২১ শতাংশ এইচএসসি, ২৪ শতাংশ স্নাতক ও ১০ শতাংশ স্নাতকোত্তর। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সুজন জেলা কমিটির সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান। জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক রেজবাউল হক রানার সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলী আহসান টিটু, লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মহানগর কমিটির সভাপতি আনিসুর রহমান আকন্দ।
প্রচারণা শেষ হচ্ছে আজ, শেষ মুহূর্তেও হেভিওয়েট প্রার্থীদের অভিযোগের শেষ নেই
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিরামহীন ১৮ দিনের প্রচারণা শেষ হচ্ছে আজ সোমবার মধ্যরাতে। শেষ সময়ে এসে প্রার্থীদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় সরগরম নির্বাচনের ভোটের মাঠ। পাশাপাশি হেভিওয়েট তিন মেয়র প্রার্থীর অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে ভোটের মাঠ এখন উত্তপ্ত। গত কয়েক দিনের মতো গতকালও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রচার-প্রচারণায় অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে ব্যস্ত ছিলেন হেভিওয়েট তিন মেয়র প্রার্থী। যেন অভিযোগের শেষ নেই তাঁদের।
গতকাল সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নগরীর টাউন হলে ভোটার শিক্ষণ প্রদর্শনী করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে। এ সময় ভোটারদের ইভিএমে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি শেখানো হয়। আজ সোমবার নির্বাচনের ১০৫টি কেন্দ্রে মগ ভোটিং অনুষ্ঠিত হবে।
নৌকার প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত গতকাল দিনভর নগরীর ৫, ১৭ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ, পথসভা ও উঠান বৈঠক করেছেন।
এ সময় রিফাত বলেন, ‘গত ১৬ বছর সাক্কু পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। তিনি সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। নগরবাসী তাদের প্রত্যাশিত সেবা পায়নি। বিশেষ করে যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ, যা বরাদ্দ এসেছে তার বেশির ভাগ লুটপাট করেছেন। সাক্কু একজন দুর্নীতিবাজ। মানুষ এবার পরিবর্তন চায়। উন্নয়নের স্বার্থে কুমিল্লার মানুষ এবার নৌকাকে বেছে নেবে। ’
টেবিল ঘড়ি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু গতকাল দিনভর নগরীর ১১ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় গণসংযোগ করেছেন। এসব এলাকায় কয়েকটি উঠান বৈঠক করেছেন তিনি।
এ সময় সাক্কু বলেন, ‘কুমিল্লার মানুষ সব বোঝে। অপপ্রচার চালিয়ে তাদের বোকা বানানো যাবে না। মানুষ আমার সঙ্গে আছে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে মানুষ আমার পাশে থাকবে। আমি মানুষের পাশে আছি। কুমিল্লা সিটির যানজট ও জলাবদ্ধতা পরিপূর্ণ নিরসনে যেসব পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা স্থায়ীভাবে বাস্তবায়ন করতে আরো তিন বছর সময় দরকার। আমি দুইবারের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে কুমিল্লার আধুনিকায়নে ভূমিকা রেখেছি। সিটির ৭০ শতাংশ কাজ শেষ, বাকি ৩০ শতাংশ কাজ শেষ করার জন্য আরেকবার সুযোগ চাই। ’
আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকের নিজাম উদ্দিন কায়সার গতকাল দিনভর নগরীর ৩, ৫, ১৮ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও পথসভা করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘প্রতিপক্ষের লোকজন ভোটের দিন ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাতে পারে। প্রশাসন আমাকে সহযোগিতা করার দরকার নেই। তারা নিরপেক্ষ থাকলেই চলবে। কুমিল্লার মানুষ দুর্নীতিবাজ ও মাদক কারবারিদের বয়কট করেছে। চারদিকে ঘোড়ার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ’
কুসিক নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার শাহেদুন্নবী চৌধুরী বলেন, ‘সোমবার মধ্যরাতে প্রচার-প্রচারণা শেষ হচ্ছে। এরই মধ্যে আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। আশা করছি, কুমিল্লায় একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ’