রবিবার, ০৫ Jul ২০২৬, ০৭:৫৬ অপরাহ্ন
মার্চ ৬, ২০২০। সিলেটের বাতাসে শীত তখনো মিলিয়ে যায়নি। ঘাসের শিশিরের সঙ্গে সেদিন কি মিশেছিল অশ্রুবিন্দুও? সেদিন বাংলাদেশ দলের অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন মাশরাফী বিন মর্তুজা। কাগজে কলমে যদিও নেতৃত্বের শিরস্ত্রাণ নামিয়ে রাখা, আসলে তো জাতীয় দলের জার্সিটাই খুলে ফেলা। মাশরাফী জানতেন, চোটজর্জর শরীরটাকে বয়ে নিতে পারার মতো আধডজন অস্ত্রোপচার সহ্য করা পা দুটিতে নেই।
ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতেও সবশেষ ম্যাচটা খেলেছিলেন সিলেটে, চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের বিপক্ষে মিনিস্টার ঢাকার হয়ে।
হযরত শাহজালাল (র.) পুণ্যভূমিতেই ফের ক্রিকেটে ফিরছেন মাশরাফী। সামনের বিপিএলে সিলেট স্ট্রাইকার্স দলের নেতৃত্ব দেবেন তিনি। বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক তারকাকেও এরই মধ্যে সই করিয়েছে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। সব মিলিয়ে নতুন দল ও সিলেট ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন মালিকানা নিয়ে বেশ আশাবাদী চারবার বিপিএল জয়ী অধিনায়ক।
সিলেট স্ট্রাইকার্স সূত্রে জানা গেছে, দল গোছানোর কাজ প্রায় শেষ। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সিলেটি সারওয়ার চৌধুরীর নেতৃত্বে ফিউচার স্পোর্টস নামের একটি প্রতিষ্ঠান কিনেছে সিলেট ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা, যা সিলেটবাসীকে দিচ্ছে স্বস্তি। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট যদিও আবেগের জায়গা নয়, তবুও অতীতে সিলেট দলের যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্সে মানববন্ধন পর্যন্ত করা সিলেটের বাসিন্দারা এবার মাশরাফীর নেতৃত্ব আর সিলেটি মালিকানায় খুঁজে পাচ্ছে ভরসা। কোচিং স্টাফেও রাজিন সালেহ, নাজমুল হোসেনদের মতো সিলেটের কৃতী সাবেক ক্রিকেটারদের অন্তর্ভুক্ত করায় বেড়েছে আস্থার জায়গা।
সাবেক অধিনায়ক এবং জাতীয় দলের সাবেক ফিল্ডিং কোচ রাজিন জানালেন, বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের সঙ্গেই কথাবার্তা হচ্ছে তাদের এবং তাদের কয়েকজনকে সই করিয়েছেন। তার কাছ থেকেই জানা গেল, পাকিস্তানের বাঁ হাতি পেসার মোহাম্মদ আমির খেলবেন সিলেট স্ট্রাইকার্সের হয়ে। কিছুদিন আগেই শেষ হওয়া ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে আমির জ্যামাইকার হয়ে ১২ ম্যাচে নিয়েছেন ১৬ উইকেট, ওভারপিছু গড়ে রান দিয়েছেন সাতের কম আর প্রতি প্রায় ১৫ ডেলিভারিতে তার একটি শিকার।
দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ-২০ এবং আরব আমিরাতের আইএলটি-২০ এর জন্য ভালো খেলোয়াড় পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর জন্য। সিলেট স্ট্রাইকার নামিদামি খেলোয়াড়ের পেছনে না ছুটে চাইছে কার্যকর ক্রিকেটারদের নিয়ে লড়তে। থিসারা পেরেরা এমনই এক ক্রিকেটার। বিপিএলে পরিচিত মুখ এই শ্রীলঙ্কার অলরাউন্ডার। বছর খানেক হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নেই থিসারা, তবে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন লিজেন্ডস লিগ ক্রিকেটে। তাকেও দলে টেনেছে সিলেট স্ট্রাইকার্স। সঙ্গে কামিন্দু মেন্ডিস, সব্যসাচী এই বোলার হয়ে উঠতে পারেন সিলেটের এক্স ফ্যাক্টর। অফস্পিনার অলরাউন্ডার ধনঞ্জয়া ডি সিলভাও আছেন স্ট্রাইকার্সের নজরে।
তারকার পেছনে না ছুটে কার্যকর বিদেশিদের সঙ্গে প্লেয়ার্স ড্রাফটে স্থানীয় ক্রিকেটারদের নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়াই লক্ষ্য স্ট্রাইকার্সের। যেহেতু তিন মৌসুমের জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা তাদের হাতে, দেখেশুনেই দল গঠনের লক্ষ্য তাদের। সেই সঙ্গে সিলেটের মানুষের সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজির একটা সম্পর্ক স্থাপন করাটাও অন্যতম উদ্দেশ্য। বিপিএলের শুরু থেকেই সিলেট ফ্র্যাঞ্চাইজি নিতে অনীহা ছিল অনেকের। অন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি না পেয়ে সিলেট ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়েছেন এমনটা হয়েছে একাধিকবার। তবে এবারে সিলেটের মানুষ সিলেটের ফ্র্যাঞ্চাইজি চাওয়াতে গতবারের মালিক প্রগতি গ্রিন অটো রাইস মিলকে বিসিবি দিয়েছে ঢাকা, আর ফিউচার স্পোর্টসকে দেওয়া হয়েছে সিলেটে।
অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফীর আছে দারুণ গ্রহণযোগ্যতা ও দর্শকপ্রিয়তা। ২০০৮ সালে আইপিএলের প্রথম আসরে সবচেয়ে কম খরচে দল গড়েও বাজিমাত করেছিল শেন ওয়ার্নের রাজস্থান রয়্যালস। স্পিন জাদুকর ছিলেন কোচ ও খেলোয়াড়ের ভূমিকায়। মাশরাফীর ম্যাজিকে ভাগ্য খুলতে পারে সিলেটেরও। এখন পর্যন্ত বিপিএলে সিলেট কেবল ব্যর্থতার মুখই দেখেছে। লাভ হয়নি ডেভিড ওয়ার্নারের মতো মহাতারকার উপস্থিতি আর প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আশীর্বাদেও। মাশরাফীর ছোঁয়ায় বদলে যেতে পারে সিলেট ফ্র্যাঞ্চাইজির ভাগ্য। মাঠের ফল যাই হোক অন্তত মাশরাফীর টানে সিলেটবাসী অকুণ্ঠ সমর্থন দেবেন সিলেট স্ট্রাইকার্সকে। সঙ্গে রাজিন-নাজমুলরা তো থাকছেনই।
বিপিএলের প্রথম আসরে সিলেট রয়্যালস দলের টানা হারের পর সিলেটবাসী করেছিল মানববন্ধন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট বিভাগ থেকে বিসিবির বর্তমান পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলও। সিলেট রয়্যালসের পারফরম্যান্সে ক্ষুব্ধ হয়ে দলের নাম থেকে সিলেট শব্দটা ছেঁটে ফেলার দাবিও উঠেছিল। সেই থেকে সিলেট ফ্র্যাঞ্চাইজির করুণ দশা চলছেই। মাশরাফীর ছোঁয়ায় যদি দৃশ্যটা বদলায় তাহলে নতুন শুরুটা হবে সিলেট ও মাশরাফী দুইয়েরই।