শুক্রবার, ২৬ Jun ২০২৬, ০৫:১৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

অস্বাভাবিক বেড়েছে চাল-ডাল-তেল-চিনির দাম

মতিঝিলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মোহাম্মদ আলী। পরিবার নিয়ে থাকেন কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায়। কুড়িল থেকে বাসে গুলিস্তানে নেমে রিকশা নিয়ে যেতে হয় অফিসে। রাস্তার যানজট, ধুলাবালি ও বাস ভাড়া নিয়ে কন্ডাক্টরের সঙ্গে বাগবিতন্ডা শেষে অফিসে পৌঁছে দেখেন উপরে ওঠার লিফট বন্ধ। উপায় না দেখে সিঁড়ি বেয়ে আটতলায় উঠে ঢোকেন অফিসে। লোডশেডিংয়ের কারণে গরমের মধ্যেই কম আলোতে কাজ করতে হয় অফিসে। অফিস শেষে বাসায় গিয়েও একই ভোগান্তি। যখন একটু বিশ্রাম করবেন, ঠিক তখনই শুরু হয় লোডশেডিং। অফিস ও যাতায়াতের সময় মিলিয়ে তিনি খুব বেশি সময় থাকেন না বাসায়। যেটুকু সময় বাসায় থাকেন লোডশেডিংয়ের কারণে পুরোটাই হাঁসফাঁস অবস্থা। এ দুর্দশা তার নিত্যদিনের।

কুড়িল থেকে মতিঝিলের দূরত্ব প্রায় ১৬ কিলোমিটার। সময়মতো অফিসে পৌঁছানোর জন্য মোহাম্মদ আলীকে দেড়ঘণ্টার বেশি সময় নিয়ে বাসা থেকে বের হতে হয়। যানজটের কারণে প্রতিদিন তার আসা-যাওয়া নষ্ট হচ্ছে প্রায় তিন কর্মঘণ্টা। আবার রয়েছে গ্যাসসংকট। ফলে তিন বেলা সময়মতো খাবারও তৈরি হচ্ছে না। বার্ষিক পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এলেও বাচ্চাদের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে।

আগে কুড়িল থেকে মতিঝিলের বাস ভাড়া ছিল ২৫ টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর থেকে নেওয়া হয় ৪০ টাকা। জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় বেড়েছে রিকশার ভাড়াও। গুলিস্তান থেকে মতিঝিলের শাপলা চত্বর যেতে রিকশা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৫০ টাকা। আগে ৩০ টাকা আসা-যাওয়া করতেন তিনি।

মোহাম্মদ আলীর দুই সন্তানের একজন পঞ্চম শ্রেণিতে, আরেকজন একাদশ শ্রেণিতে পড়েন। স্ত্রী গৃহিণী। তার একার আয়েই চলে সংসার ও সন্তানদের পড়ালেখা। মহামারী করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে মোহাম্মদ আলীর সংসারে। জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক দাম বাড়লেও বেতন বাড়েনি। বেড়েছে সংসারের খরচ।

বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সব পণ্যের অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন বেসরকারি অফিসের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী মোহাম্মদ আলী। বছরের অধিকাংশ সময় তাকে ধার করে চলতে হচ্ছে। জীবনযাত্রার ভোগান্তির এই চিত্র শুধু মোহাম্মদ আলীর একার নয়, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের নিম্ন আয়ের কিংবা মধ্যম আয়ের মানুষেরও।

মহামারী করোনার পর মানুষের অনেক সব ধরনের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যেই শুরু হয় ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন; যা আরও উসকে দিয়েছে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধিকে। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর হওয়ার কারণে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ২৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮, আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে। অবশ্য সেপ্টেম্বরে তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ১ শতাংশে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিডিপি) গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের খরচ কী পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যেমন মাছ-মাংস না খেয়েও ঢাকা শহরের চার সদস্যের এক পরিবারকে এখন খাবার কিনতে মাসে গড়ে ৯ হাজার ৫৯ টাকা খরচ করতে হয়। মাছ-মাংস খেলে ওই পরিবারের খাবারে খরচ হয় ২২ হাজার ৪২১ টাকা। এটি চলতি অক্টোবর মাসের হিসাব। গত পৌনে চার বছরে খাবার কেনায় ওই সব পরিবারের খাবার খরচ ২৭ থেকে ৩৮ শতাংশ বেড়েছে।

সিপিডির হিসাবে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা শহরের একটি পরিবার মাছ-মাংস খেলে খাবারে খরচ হতো ১৭ হাজার ৫৩০ টাকা। আর মাছ-মাংস না খেলে এ খরচ ছিল ৬ হাজার ৫৪১ টাকা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) সংবাদ সম্মেলনে মূল্যস্ফীতির চাপ বোঝাতে এ হিসাব দিয়েছে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা, লবণ, মাছ, মাংসসহ ১৯টি প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য কেনার গড় খরচ ধরে হিসাবটি করা হয়েছে। সংসারের এসব খরচের বাইরে রয়েছে, বাসায় আত্মীয়স্বজন আসলে ভালো খাবারের আয়োজন খরচ। তবে বন্ধ হয়ে গেছে বেড়াতে যাওয়া ও দাওয়াত খাওয়া।

দাম বেড়েছে মোহাম্মদ আলীর স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া দুই সন্তানের শিক্ষা উপকরণেরও। খাতা, কলম, স্কুলব্যাগ, গাড়ি ভাড়াও বেড়েছে। আগে সন্তানদের পড়ালেখার খরচ (প্রাইভেট টিউশনি বাদে) হতো গড়ে ৬ হাজার টাকা। বর্তমানে খরচের পরিমাণ ১০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এসবের বাইরে স্কুল ড্রেস রয়েছে।

সদরঘাটগামী ভিক্টর পরিবহনের বাসে আলাপকালে মোহাম্মদ আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, গত কয়েক মাস ধরে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে সংসার খরচের লাগাম টানা হয়েছে। আগে প্রতিদিন সকালের নাস্তায় রুটির সঙ্গে ডিম, সবজি থাকলেও এখন মাঝে মাঝে ডিম বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ ৯০ টাকা ডজনের ডিমের দাম এখন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। ডিমের দামের টাকা ব্যয় হচ্ছে আটার বাড়তি দামে। আগে দুই কেজি আটার প্যাকেট ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় কেনা গেলেও এখন ১১০ থেকে ১২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাসা থেকে খাবার নিয়ে যাওয়ার কারণে দুপুরে তার কিছুটা সাশ্রয় হয়। কমিয়ে দিয়েছেন মাছ, মাংস কেনাও। সংসারের নিয়মিত খরচের বাইরেও রয়েছে মোহাম্মদ আলীর সংসারের সাবান, ডিটারজেন্ট, টুথপেস্ট, টিস্যু পেপার, পোশাক কেনার খরচ। তবে বেতন বাড়েনি এক পয়সাও।

জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় মোহাম্মদ আলীর মতো কষ্টে আছেন সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর নির্ভরশীলরা। নির্দিষ্ট আয় দিয়ে সংসার চালাতে কষ্টের শেষ নেই তাদের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন শেষে আমানতের সুদহার কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ, যেখানে মার্চেও এর পরিমাণ ছিল ৪ শতাংশের ওপর। পাশাপাশি এসময় ঋণের সুদহার ৭ দশমিক ০৯ শতাংশে নেমেছে। মার্চ মাসেও ঋণের গড় সুদহার ছিল ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। যার কারণে সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

অস্বাভাবিক বেড়েছে চাল, ডাল, তেল ও চিনি দাম : চলতি বছরের শুরু থেকে নভেম্বর পর্যন্ত কয়েক দফায় চাল, ডাল, আটা, তেল ও চিনি দাম বেড়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে বিক্রি হওয়া কেজিপ্রতি ২৮ টাকার আটা গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৫৬-৫৮ টাকা করে। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রতি কেজি চিনি ৫৫ টাকায় বিক্রি হলেও অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। ফেব্রুয়ারিতে মসুর ডালের কেজি ৯০ টাকা ছিল। আগস্ট মাসে দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। চার মাস আগেও জাতভেদে (বুট, খেসারি, হেলন) ডালের কেজি প্রায় ৭০ টাকায় বিক্রি হতো। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকায়। এ ছাড়াও ফেব্রুয়ারিতে মোটা চালের কেজি ছিল ৪৮ টাকায়। এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৬ টাকায়। সরু চালের কেজি ছিল ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে ৭৬ থেকে ৯৮ টাকায়। বোতলজাত ভোজ্যতেলের লিটার ছিল ১৬৮ টাকা। মাঝে ২০০ টাকার বেশি হলেও বর্তমানে ১৭৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব পড়েছে জ্বালানির দামের: চলতি বছরের ৫ আগস্ট রাত ১২টা থেকে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ওই দিন থেকে লিটারপ্রতি অকটেন ১৩৫, পেট্রল ১৩০, ডিজেল ও কেরোসিন ১১৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিজেলের দাম লিটারে ৩৪, অকটেন ৪৬ আর পেট্রলের দাম লিটারে ৪৪ টাকা বাড়ানো হয়েছে। দুদিন পর ৭ আগস্ট গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হয় ১৬ থেকে ২২ শতাংশ। নৌপথে পণ্য পরিবহনের ভাড়া ১৫ থেকে ২২ শতাংশ বাড়িয়েছেন লাইটার জাহাজমালিকরা। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে সব পণ্যের দাম।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত: বিশ্বে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাস বা এলএনজির দাম বাড়ায় বাংলাদেশে আমদানি কমেছে। উচ্চমূল্যের কারণে বাংলাদেশে গত আগস্ট মাস থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি না করে চাহিদা অনুযায়ী টেন্ডারের মাধ্যমে স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কেনা বন্ধ আছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি কেনা অব্যাহত আছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট ৬২ শতাংশের মতো পূরণ করা হয় গ্যাসের মাধ্যমে। এর মধ্যে স্থানীয় আবিষ্কৃত গ্যাসের মজুদের মাধ্যমে পূরণ হয় ৫০ শতাংশের বেশি। আর এলএনজির মাধ্যমে পূরণ হয় সাড়ে ১১ শতাংশ। বর্তমানে তীব্র গ্যাসসংকটে ভুগছে বৃহৎ শিল্পের কারখানাগুলো, ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। ফলে উৎপাদনমুখী শিল্পের ৬৩ শতাংশ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানির ৫৬ শতাংশই ব্যবহার করে বৃহৎ শিল্পগুলো।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com