বুধবার, ২৪ Jun ২০২৬, ০৩:২১ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

বিদেশি কর্মীর তথ্য গোপন করে পাচার ও রাজস্ব ফাঁকি

এ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লক্ষাধিক বিদেশি কর্মী কাজ করছে। নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি কর্মীর মধ্যে সমঝোতা থাকায় এদের অনেকে অবৈধভাবে বসবাস করলেও সরকারি খাতায় নাম উঠছে না। অনেকে আবার পর্যটন ভিসায় এসেও তথ্য গোপন করে কাজ করছে। এদের অনেকের বেতন আট দশ লাখ টাকার বেশি। অভিযোগ আছে, কর ফাঁকি দিতে বিদেশি কর্মীদের বেশিরভাগের বেতন ব্যাংকিং চ্যানেলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পাঠানো হচ্ছে। তবে হুন্ডিতে বিদেশে পরিশোধ করছে বেশি। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনেও বিদেশি কর্মীদের তথ্য গোপন করে অর্থ পাচার ও রাজস্ব ফাঁকির তথ্য উঠে এসেছে।

দেশে বৈধ-অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশি কর্মী ও তাদের নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠানের সন্ধানে জোরেসোরে কাজ শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিদেশি কর্মীদের নিয়ে ডাটা ব্যাংক হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিদেশি কর্মীদের প্রকৃত সংখ্যা ও বেতনের পরিমাণ জানতে এরই মধ্যে এনবিআরের কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধিক টাস্কফোর্স কাজ করছে। গোপন গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে বিনা নোটিশে টাস্কফোর্সের সদস্যরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বিদেশি কর্মীর বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে। টাস্কফোর্সের সদস্যরা অভিযানে দেখছে কত জন বিদেশি কর্মী, কত দিন থেকে, কত বেতনে কাজ করছে। এদের কাজে অনুমতি পত্র ও ভিসা আছে কিনা। বেতন ব্যাংকিং চ্যানেলে দেয়া হচ্ছে কিনা তা তাও খতিয়ে দেখছে।

বিদেশি কর্মী এবং নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে হিসাব অনুযায়ী পাওনা রাজস্ব আদায়ে কঠোর হয়েছে এনবিআর কর্মকর্তারা। নিয়োগ দিয়েও বিদেশি কর্মীর তথ্য গোপন করেছে এমন প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরী শেষে আরো বিস্তারিত তদন্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এনবিআরের ডেটা ব্যাংকে বিদেশি কর্মীর দেশ, কর্মরত প্রতিষ্ঠানের নাম, কাজের ধরন, আয় এবং পাওনা রাজস্ব, ভিসার ধরন ও মেয়াদ, কাজের অনুমতির মেয়াদসহ বিভিন্ন তথ্য রাখা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বিদেশি কর্মীর তথ্য গোপন করে আর বিদেশি কর্মীর তথ্য দিয়ে- এভাবে বিদেশি কর্মী নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান দুই ধরনের হিসেব রাখে। তদন্ত করতে আসলে বিদেশি কর্মীর তথ্য গোপন করে হিসেব উপস্থাপন করে থাকে। প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের বিদেশে প্রশিক্ষণ খাতে বা বিদেশে সেমিনার করতে বা অন্য কোন জরুরি খাতে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রকৃত খরচের চেয়ে বেশি পরিমাণ বিদেশে পাঠিয়েও অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশে কর্মীর বেতন দিয়ে থাকে। তবে হন্ডিতে বিদেশি কর্মীর বেতন বেশি পাঠানো হয়েছে।

সম্প্রতি এনবিআরের টাস্কফোর্সের সদস্যরা তৈরী পোশাকখাতের প্রতিষ্ঠান আহনাফ প্যাকেজিং লিমিটেডে বিনা নোটিশে উপস্থিত হয়ে কত জন বিদেশি কর্মী, কত বেতনে, কত দিন থেকে, কাজের অনুমতি নিয়ে কাজ করছে কিনা যাচাই করে দেখে। আহনাফ প্যাকেজিং কর্তৃপক্ষ মাত্র ৩ জন বিদেশি কর্মী কাজ করছে এবং এদের প্রতি জনের বেতন এক লাখ ৫০ হাজার টাকা করে এমন তথ্য জানায়। এনবিআর কর্মকর্তারা তদন্তে দেখে প্রতিষ্ঠানটিতে ১১ জন বিদেশি কর্মী এক বছরের চুক্তিতে কাজ করছে। এসব কর্মীদের এক জনের বেতন এক লাখ, তিন জনের বেতন এক লাখ ৫০ হাজার, পাঁচ জনের বেতন ২লাখ ৫০ হাজার এবং ২ জনের বেতন ৭ লাখ টাকা। সবচেয়ে বেশি বেতনের দুই জনের কাজের অনুমতি (ওয়ার্কপারমিট) নেই। জেরার মুখে আহনাফ প্যাকেজিং জানায়, যাদের হিসেব জানানো হয়নি এরা বিনা বেতনে পরামর্শ দিতে এসেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সমঝোতায় বিদেশি কর্মীদের প্রকৃত পাওনা বিদেশে হুন্ডিতে পাঠানো হয়েছে। এ অপকর্ম করায় সরকার একটি টাকাও কর পাইনি। বিস্তারিত তদন্ত এবং তথ্য প্রমাণ করা হচ্ছে।

জুতা-স্যান্ডেল উৎপাদনকারী দেশের আরেক প্রতিষ্ঠান অন্যান্য সু লিমিটেড পাঁচ জন বিদেশি কর্মী দুই বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছেন। টাস্কফোর্সকে জানানো হয়েছে দুই জন বিদেশি কর্মীর এক জন এক লাখ ১০ হাজার টাকা এবং আরেক জন এক লাখ ৭০ হাজার টাকা বেতনে কাজ করছে। এদের আয়ের ওপর হিসেব কষে কর পরিশোধ করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের সদস্যরা প্রতিষ্ঠানটির নথিপত্র তল্লাশি করে দেখে যে পাঁচ জনের দুই জনের বেতন ঠিক থাকলেও বাকি তিন জনের বেতন তিন লাখ টাকা করে। কর্মীদের বেতন অন্য খাতের খরচ হিসেবে ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশে পরিশোধ করা হয়েছে। এভাবে অর্থপাচার ও কর ফাঁকি দেয়া হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, যাদের তথ্য এনবিআরকে জানানো হয়নি তারা বিনা বেতনে বিশেষজ্ঞ অতিথি হিসেবে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কিভাবে গতিশীল করা যায় মাঝে মাঝে তার কাজ দেখেন। কাজ শেষে তাদের শুভেচ্ছা হিসেবে কিছু উপহার দেয়া হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলতি মাসে ২০টির বেশি নামীদামি প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানেই বিদেশি কর্মীদের ও তাদের আয়ের তথ্য গোপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ঠিক কত জন বিদেশি কর্মী কাজ করছে তার তথ্য নিয়েও রয়েছে ভিন্ন মত। এর আগে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বাংলাদেশে কত বিদেশি নাগরিক কাজ করেন তার হিসেব জানিয়ে বলেছিলেন, এ দেশে ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশি নাগরিক কাজ করেন, তাঁদের অর্ধেকই ভারতীয়। ভারতীয়দের সংখ্যা ৩৫ হাজার ৩৮৬ জন এবং চীনা ১৩ হাজার ২৬৮ জন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘বাংলাদেশে বিদেশিদের কর্মসংস্থান : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, বৈধ ও অবৈধ দুই ভাবেই বাংলাদেশে বসবাস করে বিদেশি কর্মীরা কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি এক বছর আট মাস সময়কালে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীদের সাক্ষাৎকার এবং আইনি নথি-নীতিমালা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য, গবেষণা প্রতিবেদন ও গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসেব দিয়েছে বলে দাবি করেছে টিআইবি’র গবেষণায় আরো উল্লেখ আছে, বৈধ ও অবৈধ মোট বিদেশি কর্মীর সংখ্যা কমপক্ষে আড়াই লাখ। বৈধ বিদেশি কর্মী প্রায় ৯০ হাজার। বাকিটা অবৈধ।

গত কয়েক করবর্ষে এনবিআরে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন প্রতি করবর্ষে গড়ে প্রায় ১৫ হাজার বিদেশি কর্মী। রিটার্নে দেয়া তথ্যানুসারে এদের বার্ষিক আয় প্রতি বছর গড়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি। এতে মোট কর পাওয়া গিয়েছে প্রায় দুইশত ৭০ কোটি টাকা। তথ্য জানিয়ে-না জানিয়ে, বৈধ- অবৈধভাবে এক লাখ ৫০ হাজার বিদেশি নাগরিক এদেশে কাজ করতে পারে এমন হিসেব সামনে রেখে বিদেশি কর্মীর সন্ধানে নেমেছে এনবিআর।

এনবিআর সদস্য মইনুল খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এনবিআর বিদেশি কর্মীর তথ্য হাল নগাদে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে লক্ষাধিক বিদেশি কর্মী কাজ করছে। এদের অনেকের বেতন এক লাখ টাকা থেকে দশ লাখ টাকা বা তারও বেশি বলে জানা যায়। এসব তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এনবিআরের সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে বিদেশি কর্মীদের চিহ্নিত করা তত সহজ হচ্ছে। এনবিআরের সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে এটা আশার কথা।

পর্যটন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে ৮ লাখ থেকে ১২ লাখ পর্যটক ভিসা নিয়ে দেশে আসে। খোঁজ নিয়ে জান যায়, পর্যটক ভিসায় কাজ করা নিষিদ্ধ হলেও এই ভিসায় বিদেশিরা অবৈধভাবে দেশের বিভিন্ন খাতে কাজ করছে। পর্যটকের অন্তত ৫০ শতাংশ ভিসা কাজের উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয়। এসব ভিসার সর্বোচ্চ মেয়াদ ৩ মাস হওয়ায় তারা তিন মাস পরপর দেশে গিয়ে আবার ভিসা নিয়ে ফিরে আসে।

এ হিসেবে পর্যটক ভিসায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার বিদেশি কাজ করেন। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের হিসাবে কর্মোপযোগী ভিসার সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। আর বিডা, বেপজা ও এনজিও ব্যুরো- তিন সংস্থার দেওয়া কর্মানুমতির সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। সরকারি প্রকল্পে কর্মরত বিদেশিদের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ আছে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে যারা কাজ করেন তাদের অনেকেই ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করছেন। তারাও সঠিক বেতন কত সেটা জানায় না।

টিআইবি’র গবেষণায় হিসেব কষে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করা বিদেশি কর্মীদের উপার্জিত ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এক বছরে বিদেশে পাঠানো হয়। এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

কোন দেশ থেকে বেশি আসছেঃ

প্রায় ৪৪টি দেশ থেকে আসা বিদেশিরা বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে কর্মরত আছে। সবচেয়ে বেশি ভারতের। এছাড়া চীন, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, নরওয়ে ও নাইজেরিয়াসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকরাও কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞদের পরার্মশঃ

জার্মানিতে কর্মরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশি কর্মীরা এবং নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একজোট হয়ে তথ্য গোপন করে অর্থপাচার করছে এবং রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এক সময়ে বড় মাপের প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিলেও এক মাঝারি মাপের প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ দিচ্ছে। তাই বিদেশি কর্মীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

এসব প্রতিষ্ঠান ধরা পড়লে অনেক সময় সমাজের প্রভাবশালীদের দিয়ে তদবির করে বা তদন্তকারিদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে পার পেয়ে যায়। দেশের অর্থ দেশে রাখতে এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারলে এ ধরনের অপকর্ম কমে যেত।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার, বিদেশি কর্মী এবং তাদের নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠান তিন পক্ষকেই স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। ওয়ার্ক পারমিট না থাকলেও কাজ দেয়া যাবে না। বিদেশিরা আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে বা মিথ্যা তথ্য দিলে ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করতে হবে। একই ব্যক্তিকে তিন মাস এবং একই বছরে দুই বারের বেশি পর্যটন ভিসা দেয়া যাবে না। বিদেশি কর্মীদের তথ্য সংরক্ষণকারি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com