বৃহস্পতিবার, ২৫ Jun ২০২৬, ০১:২৬ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট

এরিক মারিয়া রেমার্ক যখন যুদ্ধে যেতে বাধ্য হন তখন তার বয়স ১৮ বছর, সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণ। ওই সময়টাতে রেমার্কের মতোই স্কুল কলেজ পড়ুয়া হাজার হাজার তরুণদের অল্প কয়েক সপ্তাহের ট্রেনিংয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল। যুদ্ধে অনভিজ্ঞ, প্রয়োজনীয় ট্রেনিং না পাওয়া এইসব তরুণরা মারাও পরেছে কাতারে কাতারে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে রেমার্কের লেখা বিখ্যাত উপন্যাস ‘অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ প্রকাশিত হয় ১৯২৮ সালে। ২০২২-এ মুক্তি পাওয়া এডওয়ার্ড বার্জারের একই নামের ছবিটি রেমার্কের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত তৃতীয় চলচ্চিত্র, পূর্বের দুটি ১৯৩০ এবং ১৯৭৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল।

যুদ্ধের প্রথম বোমাটা পড়ে হৃদয়ের মাঝখানে

১৯১৭ সাল, যুদ্ধ বিধ্বস্ত জার্মানি। স্কুল শিক্ষকের উপর্যুপরি উৎসাহ এবং তাগদায় পল বোমাররা নয় বন্ধু যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, ২ নম্বর কোম্পানির অধীনে। তখন পরিস্থিতি এমন যে স্বেচ্ছায় না হলেও নানা সামাজিক, রাজনৈতিক চাপে ছাত্র, কৃষক, মজুরসহ নানা পেশার লোকজন বাধ্য হচ্ছেন আর্মিতে যোগ দিতে। পল এবং তার বন্ধুরা, যাদের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে, দেশপ্রেমে টগবগ করছে যেন। কাইজার, ইশ্বর আর তাদের পিতৃভূমির মর্যাদা রক্ষায় তারা জীবন বাজি রেখে লড়তে প্রতিজ্ঞ- মানে ওভাবেই তাদের মোটিভেট করা হয়েছে যুদ্ধে যোগ দিতে।

কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে পৌঁছালে প্রথমেই তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়। যুদ্ধকে তারা যেমনটা রোমান্টিক ভেবেছিল বাস্তবে মোটেও তা নয়। তারা প্রথমবারের মতো যুদ্ধের বিভৎসতা ও ভয়াবহতার মুখোমুখি হয়। চারপাশে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ, অবিরাম গোলাবর্ষণ। আর জমছে ছিন্ন-ভিন্ন লাশের সারি। এর মধ্যেই চলছে যুদ্ধ, খাওয়া, বিশ্রাম। যুদ্ধের প্রথম বোমাটা আদতে হৃদয়কে এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফেলে, প্রথমেই যা কিছু মানবীয় তাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হয়—হয় মারো নয় মর, টিকে থাকার এই একমাত্র উপায়—হয়ে উঠতে হয় স্রেফ পশু। কিন্তু এর মাঝেও পলদের মানবিক সত্ত্বা প্রায়শই জেগে ওঠে। অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট

যুদ্ধ ময়দানে ফরাসি সৈনিকের সাথে পল বোমারের এনকাউন্টারের ঘটনাটা বিবেচনা করা যাক। বোমা, গুলিবর্ষণ থেকে বাঁচতে একটি গর্তে আশ্রয় নেয় পল, সেখানে একজন আহত ফরাসি সৈনিক বাঁচার জন্য আকুতি করছে। বোমারের কাছে চোখের সামনে শত্রুর এই আকুতি অসহ্য বোধ হয়, তাকে মারার জন্য ছুটে যায়, যদিও পল আসলে জানে না কেন সে শত্রু, কেনই বা তাকে মারতে হবে। এক মুহুর্তের জন্য পলের মতিভ্রম হয়।

খানিক আগে মারতে থাকা ফরাসি সৈন্যটিকে এবার বাঁচাতে চেষ্টা করে। পকেট হাতড়ে বের করে তার স্ত্রীর ছবি। ক্ষণিকের দূর্বলতায় পল প্রতিজ্ঞাও করে যদি বেঁচে থাকে তো বাকি জীবন ওই ফরাসি সৈনিকের স্ত্রী সন্তানের ভরণপোষণ করবে। পরমুহূর্তেই পল অবশ্য বুঝতে পারে এই প্রতিজ্ঞা অর্থহীন। যুদ্ধে কোনও প্রকার মানবীয় দুর্বলতার সুযোগ নেই, একটি মুহূর্তের অসতর্কতা তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে, যুদ্ধে বিরুদ্ধ পক্ষে যে থাকে তার একমাত্র পরিচয় শত্রু। যুদ্ধ অনেকটা নির্মলেন্দু গুণ যেমনটা বলেছেন ‘শত্রু শত্রু খেলা’; এই খেলা স্রেফ প্রাণঘাতী।

প্লাবনের ঢেউয়ের মতো আসছে মৃত্যু

জার্মানি পূর্ব দিকে অবস্থিত রাশিয়া এবং পশ্চিমে অবস্থিত ফ্রান্সের সাথে একই সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফ্রান্সের জার্মান সীমান্তে রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরোধ দূর্গ। তা এড়াতে সরাসরি আক্রমণ না করে বেলজিয়ামের মধ্য দিয়ে আক্রমণ করে ফ্রান্স দখলের শ্লিফেন প্ল্যান ব্যর্থ হলে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, বেলজিয়ামের যৌথ আক্রমণের মুখে জার্মানিকে বাধ্য হয়ে পিছু হঠতে হয়। প্রায় ১০০ কিলোমিটার পিছু হটে তারা রাইন নদীর পাড়ে ঘাঁটি করে।

এরপর জার্মানি যুদ্ধে একটি অদ্ভুত কৌশল নেয়। সুইজারল্যান্ডের আল্পাস থেকে ইংলিশ চ্যানেল পর্যন্ত প্রায় ৪০০ মাইল দীর্ঘ পরিখা খোঁড়া হয়। জার্মান সমরবিদরা পরিকল্পনা করেছিল ৯৫০ ঘণ্টার মধ্যে ফ্রান্স দখল করবে, সে যুদ্ধ স্থায়ী হয় ৪ বছরেরও বেশি। জার্মানির দেখাদেখি ফ্রান্সও ট্রেঞ্চ খনন করে। এই ট্রেঞ্চ যুদ্ধই বিখ্যাত ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট নামে, ক্রমে সেটা মূলত স্থির যুদ্ধে পরিণত হয়। দু’পক্ষের গোলা, কামান, গ্যাস, বিমান হামলায় ক্রমাগত লাশের স্তূপ জমতে থাকে। ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে উভয়পক্ষের নিহত হয় প্রায় ৪০ লাখ সৈন্য।

পল বোমার ট্রেনিং শেষে ইউনিফর্ম নিতে গেলে দেখে তাতে অন্য একজনের নামে ট্যাগ লাগানো। সেটা কর্তৃপক্ষকে জানালে ট্যাগটা ছিড়ে তাকে পুনরায় ফেরত দেয়। পল তখনো জানে না, এই ইউনিফর্ম অন্য আরেকজন মৃত সৈনিকের, যা ধুয়ে তাদের আবার পরতে দেওয়া হয়েছে। তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে প্রয়োজনীয় পোষাক, সরঞ্জাম, রসদ এমনকি খাদ্য ছাড়াই, শুধুমাত্র জেনারেল এবং রাজনীতিবিদদের নির্বোধ ইগো সন্তুষ্টির জন্য যেখানে একজন সৈনিকের জীবনের ন্যূনতম মূল্য নেই।

অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট
পলদের পাঠানো হয় ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে, যেখানে বছরের পর বছর ধরে অদ্ভুত ট্রেঞ্চ যুদ্ধ চলছে। একটা দৃশ্যে দেখা যায় তারা ফ্রান্সের ট্রেঞ্চের একটা অংশ দখল করলে সেখানে ভালো খাবার পেয়ে যুদ্ধ ফেলে খাবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরতে। একের পর এক পলের বন্ধুরা মারা পরতে থাকে, কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে, কেউ আহত হয়ে হাসপাতালে প্রায় বিনা চিকিৎসায় কাতরাতে কাতরাতে। শেষকালে অতর্কিত হামলায় মারা পরে পলও, ততক্ষণে ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট পুরোপুরি শান্ত—চারদিকে কেবল ধ্বংস, চারপাশে কেবল লাশ।

উপন্যাস আর চলচ্চিত্রের ফর্ম ভিন্ন, রূপান্তরের বিষয়টা নির্ভর করে মূল টেক্সটকে পরিচালক কীভাবে ডিকোড করছেন এর উপর। রেমার্কের উপন্যাস আর এডওয়ার্ড বার্জারের সিনেমার মধ্যে অমিল রয়েছে এন্তার। পরিচালক নানা ঘটনা ও উপদান যোগ বিয়োগ করেছেন। বোমারের ঘরে ফেরা, পরিবারের সাথে কাটানো সময়, ক্যাম্পে বন্দি রাশানদের মর্মস্পর্শী বিবরণের পুরোটাই বাদ দেওয়া হয়েছে।

উত্তম পুরুষে বর্ণিত রেমার্কের উপন্যাসে কেবল যুদ্ধের বর্ণনাই নয়, বরং যুদ্ধ এই তরুণ সৈন্যদের মনোদৈহিক যে ক্ষত তৈরি করেছে, তাদের অন্তর্গত পীড়ন, যুদ্ধপরবর্তী এই সৈনিকরা পরিবর্তিত বাস্তবতায় কীভাবে খাপ খাবে সেই অনিশ্চয়তাটুকুর মর্মস্পর্শী বিবরণও আছে। সেদিক থেকে বার্জারের ছবিটির ন্যারেটিভ অনেকটা সরল, তিনি মূলত যুদ্ধের বীভৎসতা, ধ্বংসোম্মত্তার দিকটাতে ফোকাস করেছেন। ছবিটিতে তিনি নতুন কিছু উপাদানও যোগ করেছেন, যেমন যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক রাজনৈতিক তৎপরতা, জেনারেলদের হামবড়া অবিমৃষ্যকারীতা ইত্যাদি। অবশ্য বিশেষত জেনারেলদের রূপায়নে উনি খুব বেশি পরিমিতি দেখাতে পারেননি, এর চিত্রায়ন অনেকটাই গতানুগতিক।

তা সত্ত্বেও নিঃসন্দেহে রেমার্কের উপন্যাসের যুদ্ধবিরোধী মূল সুর অনুসরণ করেছেন বার্জার। হিটলার অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট জার্মানিতে নিষিদ্ধ করেন, রেমার্ক প্রাণ বাঁচাতে সুইজারল্যান্ডে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আইরনি এই, প্রায় শত বছর পর একজন জার্মান বংশোদ্ভূত সুইস পরিচালক এটির চলচ্চিত্রায়ন করলেন। যুদ্ধ কোনও রোমান্টিক নায়োকোচিত বিষয় নয়, নায়ক- ভিলেন এই বাইনারির বাইরে এসে অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট দেখায় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এবং বলে মানুষ মাত্রই কেন যুদ্ধবিরোধী হওয়া উচিত।

এবার অস্কারে বার্জার শ্রেষ্ঠ পরিচালক, ছবিটি শ্রেষ্ঠ ছবিসহ ৭টি পুরষ্কার জেতে। যে মুহূর্তে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে এবং পৃথিবী সম্ভবত আরও বড় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে—এই পরিস্থিতিতে অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের অস্কারে জয়জয়কার বিশেষ দ্যোতনাবহ।

লেখক : চলচ্চিত্র কর্মী

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com