রবিবার, ২১ Jun ২০২৬, ০৫:৩৭ অপরাহ্ন
দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ উদ্বোধনের বাকি আছে এক মাস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ নভেম্বর রেলপথটি উদ্বোধন করবেন। এ লক্ষ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে রেললাইন। তবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে মেয়াদোত্তীর্ণ কালুরঘাট সেতুর মেরামতকাজ চলমান থাকায় শুরুতেই কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চলাচল নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে খোদ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। নদীর অভ্যন্তরে সেতুর ১৯টি স্প্যানের নিচের মাটি সরে যাওয়ায় ভারী ট্রেন চলাচল নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দিয়েছে।
যদিও রেলের প্রকৌশল বিভাগ জানিয়েছে, সেতু মেরামতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৪৪ কোটি টাকার চুক্তি হলেও বর্তমানে কাজের পরিধি বেড়েছে। প্রায় শতবর্ষী ও মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুর ১৯টি স্প্যানের নিচের মাটি সরে যাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলতে হবে। তবে শীত মৌসুমে নদীর স্রোত কমে এলেই নতুন সমীক্ষা করেই জিও ব্যাগ ফেলা হবে। এক্ষেত্রে নদী শাসনসহ সংস্কারে প্রাথমিক পরিকল্পনার চেয়ে ব্যয় বাড়বে বলে মনে করছে তারা।
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নভেম্বরে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। তার আগেই কালুরঘাট সেতু প্রথম পর্যায়ের সংস্কারকাজ করে রেলওয়েকে বুঝিয়ে দেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেতু সংস্কারকাজ শেষ হতে বিলম্ব হওয়ায় শুরুতে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন সার্ভিস সীমিত রাখা হলেও পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের পর সারা দেশ থেকে কক্সবাজারে ট্রেন সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’ নতুন সেতু নির্মাণ বিলম্বিত হওয়ায় কালুরঘাট সেতু সংস্কারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবরের শেষার্ধে উদ্বোধনের কথা ছিল দোহাজারী-কক্সবাজার রেল প্রকল্প। তবে কালুরঘাট সেতুর মেরামতকাজের কারণে উদ্বোধন পিছিয়ে যায়। ১২ নভেম্বর প্রকল্পটি উদ্বোধনের ঘোষণা দিয়েছেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। এর পর থেকেই নড়েচড়ে বসে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ কালুরঘাট সেতুর মেরামতকাজ পরিদর্শনে এসে রেলপথ সচিবসহ রেলওয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সেতুটি আপাতত ট্রেন চলাচলের উপযোগী করতে নির্দেশনা দেয়। যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অক্টোবরের শেষ নাগাদ সেতুর ওপরের অংশ ট্রেন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। তাই কালুরঘাট সেতু মেরামত করে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করতে আমরা কাজ করছি। চলতি মাসের মধ্যেই সেতুটি অন্তত ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে রেলওয়েকে বুঝিয়ে দেয়া হবে। তবে মূল মেরামতকাজ শেষ করতে আরো সময় লাগবে। এজন্য আমরা প্রতিদিন ২০০ শ্রমিক ও প্রকৌশলীকে দিয়ে ওভারটাইমের মাধ্যমে সংস্কারকাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
রেলওয়ে ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, কালুরঘাট পুরনো সেতুর পরিবর্তে নতুন সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি বিলম্বিত হওয়ায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একদল শিক্ষককে পরামর্শক নিয়োগ করে রেলওয়ে। বুয়েটের পরামর্শে নতুন নির্মাণ পর্যন্ত বিদ্যমান সেতু দিয়ে ভারি ট্রেন চলাচলের জন্য অন্তত ৬০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব দেয়া হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করা হলে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ১৮ জুন সর্বনিম্ন দরদাতা হিসাবে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডকে যোগ্য দরদাতা নির্বাচিত করে চুক্তি স্বাক্ষর করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ। চুক্তি অনুযায়ী সেতুটি মেরামতে আট মাস সময় পাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যদিও সেতু মেরামতকাজ শুরু করতে অন্তত দেড় মাস সময়ক্ষেপণ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সেতুটি দিয়ে ট্রেন ছাড়াও সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। প্রথম পর্যায়ে তিন মাসের মধ্যে সেতুটি ট্রেন চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার চুক্তি ছিল। কিন্তু সেতুর ১৯টি স্প্যানের নদীর তলদেশের মাটি সরে যাওয়ায় জিও ব্যাগের মাধ্যমে বালি ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে। শুরুতে ২০-২৫ হাজার জিও ব্যাগ ফেলার কথা থাকলেও বর্তমানে অন্তত ৬০ হাজার ব্যাগ বালি দিতে হবে বলে জানিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে সেতু দিয়ে নিরাপদ ট্রেন চলাচলে ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াও লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্প উদ্বোধনের আগে রেল রুটটির ট্রায়াল রান করবে রেলওয়ে। ১৫ অক্টোবর ট্রায়াল রানের জন্য এরই মধ্যে ছয়টি কোরিয়ান নন-এসি কোচ ও ২২০০ সিরিজের (২২০৪) একটি ইঞ্জিন পটিয়া রেলওয়ে স্টেশনে নেয়া হয়েছে। স্বল্প ওজনের এ ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন উদ্বোধন সম্ভব না হওয়ায় কালুরঘাট সেতু দিয়ে ভারী ইঞ্জিন ও কোচ নিয়ে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে চায় রেলওয়ে। তবে প্রথম পর্যায়ের মেরামত শেষে সেতুটি ট্রেন চলাচলের জন্য বুঝিয়ে দেয়া সত্ত্বেও সর্বশেষ সংযোজিত ইঞ্জিন পুরনো সেতু দিয়ে চলাচল নিয়ে সন্দিহান রেলওয়ে। এক্ষেত্রে ৭০-৭২ টন ওজনের ২ হাজার ৯০০ সিরিজের ইঞ্জিন দিয়েই আলোচিত দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পটি উদ্বোধন হতে পারে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে কর্মকর্তারা।