রবিবার, ২৮ Jun ২০২৬, ০৯:১৪ অপরাহ্ন
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাসকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, তিনি এদের কাউকে জিততে দেবেন না। বৃহস্পতিবার ওভাল অফিস থেকে জাতির উদ্দেশে টেলিভিশন ভাষণে বাইডেন আরও বলেছেন, হামাস ও পুতিন তাদের প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক দেশকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। তবে ভাষণে বাইডেন বলেছেন, আমেরিকার নাগরিকরা যদি তার প্রস্তাবিত সহায়তার পক্ষে সমর্থন দেন, তাহলে তা হবে দেশটির পরবর্তী প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্য একটি ‘স্মার্ট’ বিনিয়োগ।
বাইডেন মার্কিন কংগ্রেসে ইউক্রেন ও ইসরাইলের জন্য সহায়তা হিসেবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের তহবিল চাইবেন। তার মতে, মার্কিন মিত্রদের পরিত্যাগ করাটা ‘ঠিক’ হবে না। একই সঙ্গে তিনি ইসরাইলি নেতাদের ৯/১১ হামলার পর মার্কিন নেতাদের করা ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ‘রাগে অন্ধ’ না হয়ে যাওয়ার আহবান জানান। ইসরাইলে ঝটিকা সফর এবং ত্রাণ সরবরাহ গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়ার বিষয়ে মিসরের সঙ্গে একটি চুক্তির পর দেশে ফিরে এই ভাষণ দেন তিনি।
গাজা এখনো অবরুদ্ধ। ইসরাইল গাজায় পানি, বিদ্যুৎ, খাবার ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে চলা ইসরাইল-গাজা সংঘাতের সবচেয়ে উত্তেজনাকর ঘটনাটি ঘটে গত ৭ অক্টোবর। সেদিন হামাস ইসরাইলে হামলা চালিয়ে এক হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করে। এরপর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত চার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার ভাষণে ইউক্রেন ও ইসরাইল চলমান সংঘাতের মধ্যে একটি সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। তিনি কংগ্রেসকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়ে দুই দেশের সহায়তায় তহবিল পাসের আহবান জানান। বাইডেন কী পরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত তহবিল হিসেবে চাইছেন, তা উল্লেখ না করলেও ধারণা করা হচ্ছে, এর পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার।
বৃহস্পতিবারের ভাষণে বাইডেন বলেন, ‘ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে যে সন্ত্রাসীদের অবশ্যই তাদের কর্মকাণ্ডের ফল ভোগ করতে হয়। ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের গণতন্ত্র ধ্বংসে তৎপর গোষ্ঠী হামাসও তার পরিণাম ভোগ করছে।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘হামাস কেবল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীই নয়; তারা ইসরাইল, এমনকি আমেরিকার নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। আমাদের মিত্র ও অংশীদারদের মধ্যে যারা সব সময় আমেরিকা ও তার নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় সামনের সারিতে সক্রিয় থেকেছে, এখন সময় এসেছে তাদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার। এটি কেবল সহায়তা নয়, বরং আমেরিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্মার্ট বিনিয়োগ। কারণ এই যুদ্ধ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে।’
বাইডেন বলেন, ‘হামাস ও পুতিন ভিন্ন ধরনের হুমকি, কিন্তু তাদের মধ্যে একটি মিল রয়েছে; তারা দু’জনই প্রতিবেশী একটি গণতন্ত্রকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। আমরা যদি পুতিনের ক্ষমতা ও ইউক্রেনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষুধাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে তিনি ইউক্রেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, হামাস দুনিয়ায় ‘শয়তানের কর্মকাণ্ড’ উন্মোচিত করেছে এবং তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘জিম্মি আমেরিকার নাগরিকদের নিরাপত্তা ছাড়া আর কোনো কিছুই আমার কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে না।’ তিনি তার ভাষণে বলেন, ‘ইসরাইল ও ইউক্রেনের জয় নিশ্চিত করাটা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি তার ভাষণে সবশেষে বর্ণনা করেছেন, ইসরাইল ও ইউক্রেনকে সহায়তা হিসেবে শত বিলিয়ন ডলার দেওয়াটা আমেরিকার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, ইউক্রেন ও ইসরাইলকে সহায়তা আমেরিকার ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বক্তব্যের জেরে ওয়াশিংটনের কঠোর সমালোচনা করেছে রাশিয়া। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা শুক্রবার মেসেজিং অ্যাপ ‘টেলিগ্রামে’ এই সমালোচনা করেন। বাইডেনের মন্তব্যের বিষয়ে মারিয়া বলেন, বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বাইডেনের মন্তব্য প্রমাণ করে, আমেরিকা আদর্শিক কারণে লড়াইয়ে জড়ায় না। তারা ছায়াযুদ্ধ (প্রক্সি ওয়ার) থেকে লাভবান হয়। মারিয়া আরও বলেন, বাইডেনের মন্তব্যে নৈতিক মানদণ্ডের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ পেয়েছে।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, মার্কিন প্রশাসন স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের কথা বলে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, এর পেছনে রয়েছে শুধুই হিসাব। ওয়াশিংটন মূল্যবোধের কথা বলে সব সময় বিশ্বকে বোকা বানিয়েছে। অথচ তারা কখনো এই মূল্যবোধ ধারণ করেনি। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওভাল অফিসের ভাষণের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্য। এর মধ্যে ওহাইওর সিনেটর জেডি ভ্যান্স, যিনি ইউক্রেনে আরও বেশি ত্রাণ সহায়তা পাঠানোর বিরোধী, তিনি ভাষণের সমালোচনা করেন এবং একে ‘জঘন্য’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি তার ‘এক্সে’ (সাবেক টুইটার) বলেন, ‘তিনি (বাইডেন) তার বিপর্যয়কর ইউক্রেন নীতি আমেরিকানদের কাছে বিক্রি করতে ইসরাইলের মৃত শিশুদের ব্যবহার করছেন। তারা একই দেশ নয়, তাদের সমস্যাও এক রকম নয় এবং রাজনৈতিক স্বার্থে ইসরাইলকে ব্যবহার করাটা অন্যায়।’
সূত্র : বিবিসি