বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০২:৫৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

দায়িত্বশীল নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে বিএনপির

আন্দালনে গা বাঁচিয়ে চলার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না বিএনপির অধিকাংশ নেতা। ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু হলেও এর উত্তাপ নেই বেশির ভাগ জেলায়। শীর্ষ স্থানীয় নেতা থেকে তৃণমূলের হাজার হাজার কর্মী কারাগারে গেলেও দলের ৮২ সাংগঠনিক ইউনিটে ৩১ জেলায় শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। ওই সব জেলার সভাপতি-সম্পাদক নিরাপদে থাকায় সমন্বয়হীনতার জন্য আসামি হচ্ছেন কর্মীরা।

এমনও নেতা আছেন, যাদের সঙ্গে দলের কারও যোগাযোগ নেই। তবে অনেক জেলায় শীর্ষ নেতাদের নামে ডজন ডজন মামলাও আছে। আন্দোলনে মিডিয়ায় বক্তব্য উপস্থাপনে ও সমন্বয়ে সরব উপস্থিতি রয়েছে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর।

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারা দেশে তৃণমূল নেতাকর্মীরা সাধ্যমতো রাজপথে থাকার চেষ্টা করলেও খোঁজ নেই দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকের। এর সঙ্গে বিগত নির্বাচনে দলের ৬ শতাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও রয়েছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সঙ্গত কারণে বিএনপিতে আছে দুশ্চিন্তা। তবে সারা দেশের আন্দোলনে নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী জানান, তাদের দলের প্রত্যেক নেতাকর্মী নিজেদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে দেশের গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, দুই মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলন অনেকটা চুপসে গেছে। দলের সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনা হলেও আরও বেশকিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। কারাগারের বাইরে থাকা নেতাদের মধ্যে শীর্ষ কয়েকজন আছেন, তারা কোথায় আছেন তা জানেন না শীর্ষ নেতারাও। ফলে বিদেশে থাকা মহানগরের সাবেক এক নেতা, হাইকমান্ডের সবচেয়ে আস্থাভাজনদের একজন হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্য সারির এক নেতা ও একটি অঙ্গদলের শীর্ষ নেতা ঢাকার আন্দোলনের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। সমন্বয়ের ভার্চুয়াল সভাগুলোতে পর্যন্ত বর্তমান পদে থাকা মহানগরের শীর্ষ নেতাদের ঠিকভাবে পাওয়া যায় না। কেউ কেউ আছেন ভার্চুয়াল সভায় নিজের বক্তব্য দিয়ে নেটওয়ার্কের সমস্যা দেখিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যান।

অন্যদিকে জেলা পর্যায়ের নেতারাও জানান, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই বেশির ভাগ জেলায় নেতারা মোবাইল বন্ধ করে আত্মগোপনে গেছেন। সেটা এমন পর্যায়ে রয়েছে যে, কোনো নেতাকর্মীই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না, তাদের কোনো নির্দেশনা, সহযোগিতাও পাচ্ছেন না।

বিএনপি নেতারা জানান, গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ঢাকা মহানগরে। এর পরে রয়েছে ময়মনসিংহ, যশোর ও সিরাজগঞ্জ জেলা। দলের সাংগঠনিক ইউনিটের সাত নেতা আগে থেকেই কারাগারে আছেন। ২৮ অক্টোবরের পর গ্রেপ্তার হয়েছেন আরও ১৪ জন। বরিশালের তিন ইউনিট, পিরোজপুর, ভোলা, ঝালকাঠি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, রাজশাহীর দুই ইউনিট, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, শরীয়তপুর, মেহেরপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, নেত্রকোনা, বান্দরবান, রাঙামাটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনিসংহ উত্তর, চাঁদপুরসহ অনেক জেলাতেই কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি স্থানীয় বিএনপি। ৩১টি জেলার দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলাই হয়নি।

নেতাকর্মীরা জানান, এসব জেলা কমিটির নেতারা শুধু নিজেদের কমিটিই বাগিয়ে নেননি বিগত দিনে দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠনেও শতভাগ হস্তক্ষেপ করেছেন। এখন তাদের নিয়ন্ত্রিত কমিটিরও দেখা নেই। তৃণমূল অনেক নেতাকর্মী স্বউদ্যোগে আন্দোলন করছেন। কিন্তু তাদের সেই স্বতঃষ্ফ‚র্ত আন্দোলনে কোনো ধরনের সহযোগিতাও করছেন না জেলার নেতারা। ফলে মহাসংকটে পড়েছেন অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা। সারা দেশে বিএনপির সাংগঠনিক ইউনিট ৮২টি। এর মধ্যে ১০টি বিভাগে রয়েছে ১১ মহানগর কমিটি। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, বরিশালে দু’টি করে (উত্তর ও দক্ষিণ) জেলা কমিটি রয়েছে। বাকিগুলো জেলা কমিটির অন্তর্গত। ২৮ অক্টোবরের পর থেকে কেন্দ্রীয় এবং জেলা পর্যায়ের বেশির ভাগ দায়িত্বশীল নেতা আত্মগোপনে গেছেন। তাদের অনেককেই খুঁজে পাচ্ছেন না জেলার নেতাকর্মীরা। এর মধ্যেও দেশব্যাপী হরতাল, অবরোধ কর্মসূচি সফল করতে ভ‚মিকা পালন করছে তৃণমূল। মূল্যও দিতে হচ্ছে তাদের। সবাই বাড়িঘর ছাড়া। জেলার শীর্ষ নেতাদের ব্যর্থতায় অনেক সাংগঠনিক ইউনিটে কার্যকর কোনো আন্দোলনই গড়ে তুলতে পারেননি কর্মীরা।

বিএনপি সূত্র জানায়, আন্দোলনে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, ফরিদপুর, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। জেলা নেতাদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের অনেকে লাপাত্তা।

সারা দেশের সাংগঠনিক অবস্থার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা বিভাগের ১০টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে মানিকগঞ্জে ২৮ অক্টোবরের পর চারটি মামলা হয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি আফরোজা খান রিতা ও সাধারণ সম্পাদক এস এ কবির জিন্নাহর বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি হাসানুজ্জামিল শাহীনের বিরুদ্ধে একটি ও সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবালের বিরুদ্ধে চারটি মামলা আছে। মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক আবদুল হাই দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। তাই তার ছোট ভাই যুগ্ম আহবায়ক মহিউদ্দিন আহম্মেদ দায়িত্ব পালন করছেন। তার নামে আগে ৯টি মামলা আছে। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব কামরুজ্জামান রতনের বিরুদ্ধে আগে সাতটি মামলা আছে। শীর্ষ দুই নেতার অবর্তমানে আন্দোলনে নিরুত্তাপ এ জেলা। নরসিংদীর আহবায়ক খায়রুল কবীর খোকনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই ৫৫টির বেশি মামলা রয়েছে। ২৮ অক্টোবরের আগে থেকেই তিনি কারাগারে। তার অবর্তমানে সাবেক এমপি সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুলকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও আন্দোলনের কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়নি। ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৮ অক্টোবরের পর শুধু ঢাকা মহানগরে পাঁচটি মামলা হয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তরের আহবায়ক আমান উল্লাহ আমান ২৮ অক্টোবরের আগে থেকেই কারাগারে। সদস্য সচিব আমিনুল হকের বিরুদ্ধে আগে থেকে ১৩টি মামলা থাকলেও ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আরও ৯টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন। দক্ষিণের আহবায়ক আবদুস সালামের বিরুদ্ধে ৫১টি মামলা রয়েছে। ২৮ অক্টোবরের পর আরও ছয়টি মামলা যুক্ত হয়েছে। সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনুর বিরুদ্ধে আড়াই শতাধিক মামলা রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনের বিরুদ্ধেও ১২৭ মামলা রয়েছে মামলা। বর্তমানে তিনিও আছেন কারাগারে। ২৮ অক্টোবরের আগে থেকেই তিনি কারাগারে আছেন। গাজীপুর জেলা ও মহানগর নেতারা ২৮ অক্টোবরের পর থেকেই পলাতক। নেতাকর্মীর সঙ্গেও তাদের কোনো যোগাযোগ নেই, কোনো আন্দোলনও নেই সেখানে।

সম্প্রতি জেলা ও মহানগর নেতাদের নামে প্রায় ১৭টি মামলা হয়েছে। নেতাকর্মীরা এলাকা ছাড়া। নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মুহম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক খোকন এবং মহানগর বিএনপির আহবায়ক শাখাওয়াৎ হোসেন ও সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুর বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে। ২৮ অক্টোবরের পর জেলা ও মহানগরে আটটি মামলায়ও তাদের আসামি করা হয়েছে। ২৮ অক্টোবরের পর টিপুকে রাজপথ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রংপুর বিভাগে ১০ সাংগঠনিক ইউনিটে ২৮ অক্টোবরের পরে গ্রেপ্তারের উল্লেখযোগ্য ঘটনা তিনটি। এগুলো হচ্ছে দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলাল, গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুন্নবী টিটুল, রংপুর মহানগর বিএনপির আহবায়ক সামসুজ্জামান সামুর গ্রেপ্তারে ঘটনা। রাজশাহী বিভাগে ৯টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, বগুড়া জেলার সভাপতি রেজাউল করিম বাদশার বিরুদ্ধে ২৮ অক্টোবরের পর চারটি ও সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর তালুকদার হেনার বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা হয়েছে। মামলার রেকর্ড রয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলায় ২৮ অক্টোবরের পর এখানে ১৬টির বেশি মামলা হয়েছে। পাবনা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মাসুদ খন্দকারের বিরুদ্ধে এর আগে কোনো মামলা না থাকলেও ২৮ অক্টোবরের পর একটি মামলায় তাকে আটক করা হয়। খুলনা বিভাগে ১১টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সভাপতি মেহেদী আহমেদ রুমীর নামে আগের সাতটি এবং সাধারণ সম্পাদক সোহরাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে আটটি মামলা আছে। ২৮ অক্টোবরের পর নাশকতার মামলায় দু’জনই এখন কারাগারে। এছাড়া বরিশাল, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক জেলা কমিটির অনেক শীর্ষ নেতাই আন্দোলনে সক্রিয় হতে পারেননি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com