বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০১:১৯ পূর্বাহ্ন
সারা দেশে আজ ও আগামীকাল ফের অবরোধ পালন করবে বিএনপি। ষষ্ঠ দফার এ অবরোধ চলবে শুক্রবার ভোর ৬টা পর্যন্ত। গত সোমবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ ঘোষণা দেন। সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সড়ক, রেল, নৌপথে সর্বাত্মক এ কর্মসূচি দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে আজ রংপুরে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করবে স্থানীয় বিএনপি। নাশকতার মামলায় দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ পাঁচ নেতাকর্মীকে জেল-জরিমানার প্রতিবাদে এ কর্মসূচি ডাকা হয়েছে।
বিএনপির ডাকা ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ সফল করার আহ্বান জানিয়ে গতকাল বিকালে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করেছেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘দেশের জনগণ, দলের নেতাকর্মী, সমমনা জোট ও দলের নেতাকর্মীরা অংশ নিয়ে অবরোধ কর্মসূচিকে সার্থক করবেন ও সাফল্যমণ্ডিত করবেন। এ অবরোধ কর্মসূচি আমাদের দেশের গণতন্ত্র ও দেশের মানুষের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়ার বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ।’
অবরোধ শুরুর আগে গতকাল রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় একটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে ঘটা এ ঘটনায় একজন আহত হয়েছেন। খবর পেয়ে পোস্তগোলা ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে বলে জানান বাহিনীটির ডিউটি অফিসার রাফি আল ফারুক। তবে আহত ব্যক্তির নাম-পরিচয় জানাতে পারেননি তিনি।
ঢাকায় ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশের দিন পুলিশের সঙ্গে নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের পর এখন পর্যন্ত ২২ কর্মদিবসের মধ্যে ১৯ দিনই হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে ২৯ অক্টোবর এবং ১৯ ও ২০ নভেম্বর হরতাল এবং বাকি ১৬ দিন অবরোধ ডেকেছে দলটি। তবে এসব কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বা পিকেটিং সেভাবে চোখে পড়ছে না। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোই বরং রাস্তায় নেমে মিছিল-সমাবেশ করছে। এসব কর্মসূচিতে বিশেষ করে বাসে চোরাগোপ্তা হামলা চলছে শুরু থেকেই। প্রায় প্রতিদিনই বাসে আগুন দেয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে জানানো হয়েছে, বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর ২৮ অক্টোবর ডাকা মহাসমাবেশের দিন থেকে গত সোমবার পর্যন্ত সারা দেশে ২৪ দিনে অন্তত ১৯৭টি যানবাহন ও স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। সে হিসাবে দেশে প্রতিদিন প্রায় সাতটি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গড়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচটি করে বাসে আগুন দেয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসীম জানান, ২৮ অক্টোবর থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত দেয়া আগুনে মোট ১৮৫টি যানবাহন ও ১৫টি স্থাপনা পুড়েছে। যানবাহনের মধ্যে বাস ১১৮টি, ট্রাক ২৬টি, কাভার্ড ভ্যান ১৩টি, মোটরসাইকেল আটটি, প্রাইভেট কার দুটি, মাইক্রোবাস তিনটি, পিকআপ তিনটি, সিএনজি তিনটি, ট্রেন দুটি, নছিমন একটি, লেগুনা তিনটি, ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহী গাড়ি একটি, পুলিশের গাড়ি একটি, অ্যাম্বুলেন্স একটি, বিএনপির দলীয় কার্যালয় পাঁচটি, আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় একটি, পুলিশ বক্স একটি, কাউন্সিলর অফিস একটি, বিদ্যুৎ অফিস দুটি, বাস কাউন্টার একটি, শোরুম দুটিসহ আরো দুটি স্থাপনা পুড়েছে। আর এসব আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৩৪১টি ইউনিট ও ১ হাজার ৮৮৮ জনবল কাজ করেছে।
তালহা বিন জসীম আরো জানান, এ সময়ে সব মিলিয়ে মোট ৩৪ জেলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর উপজেলার হিসাবে দেশের ৬০টি উপজেলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় আগুনের ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মধ্যে মিরপুর এলাকায় সবচেয়ে বেশি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা সিটিতে ৯৫টি, ঢাকা বিভাগে ৩৭টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ২২টি, রাজশাহী বিভাগে ২৪টি, বরিশাল বিভাগে সাতটি, রংপুর বিভাগে সাতটি, খুলনা বিভাগে দুটি, ময়মনসিংহ বিভাগে দুটি এবং সিলেট বিভাগে একটি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
রাজধানীর মিরপুরের কালশী এলাকায় ১৮ নভেম্বর একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সরাসরি জড়িত দাবি করে চারজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। সোমবার রাতে র্যাব-৪-এর একটি আভিযানিক দল মিরপুরে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে বলে বাহিনীটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। গ্রেফতাররা হলেন আল মোহাম্মদ চান (২৭), মো. সাগর (২৫), মো. আল আমিন ওরফে রুবেল (২৯) ও মো. খোরশেদ আলম (৩৪)। তারা সবাই যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে র্যাবের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
এ বিষয়ে গতকাল কারওরান বাজারে নিজেদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গ্রেফতারকৃতরা বিরোধী একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী। দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনায় তারা রাজধানীর মিরপুর ও পল্লবীর আশপাশের এলাকায় বাসে অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা করে। গ্রেফতার আল মোহাম্মদ চান যানবাহনে আগুন দেয়ার জন্য তার বন্ধুর মোটরসাইকেল থেকে ২৫০ এমএল পরিমাণ পেট্রল বের করে টাইগার এনার্জি ড্রিংকের বোতলে করে ওইদিন সন্ধ্যায় আল আমিনের কাছে দেন। পরে তারা রাত ১১টার দিকে কালশী সড়কে মসজিদের পাশে পার্ক করা বসুমতি পরিবহনের একটি বাসের জানালা খুলে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এসব ঘটনার ভিডিও করে তারা শীর্ষ নেতাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। বিনিময়ে এর জন্য প্রত্যেকে ১০ হাজার টাকা করে পান।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অবশ্য অভিযোগ করেছেন, সারা দেশে অগ্নিসন্ত্রাস ও নাশকতার ঘটনাগুলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগই ঘটাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশজুড়ে ভীতির রাজত্ব কায়েমের অশুভ উদ্দেশ্যে প্রতিদিন নৈরাজ্যে লিপ্ত হচ্ছে আওয়ামী লীগের দুষ্কৃতকারী কর্মীরা। তারা গণপরিবহনে অব্যাহতভাবে অগ্নিসংযোগ করছে আর নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অধিকাংশ ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে বা পুলিশ চেকপোস্টের কাছাকাছি ঘটছে।’
রিজভী আরো বলেন, ‘অগ্নিসংযোগের ঘটনা প্রতিরোধে কিংবা প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা প্রমাণ করে যে দেশজুড়ে চলমান নাশকতায় ক্ষমতাসীন অপশক্তি জড়িত। প্রকৃতপক্ষে আমাদের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী ও তাদের আজ্ঞাবাহী পুলিশ সদস্যরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারিত বেশ কয়েকটি ভিডিও ফুটেজে চালক বা তাদের সহকারীদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে কীভাবে পুলিশ বা ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা বাসে আগুন দেয়ার জন্য দায়ী।’