শনিবার, ০৪ Jul ২০২৬, ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন
অর্থনিতি ডেস্ক, নগরকন্ঠ.কম : খেলাপি ঋণ কমানো, অবলোপনকৃত ঋণ আদায় ও লোকসানি শাখা কমানোসহ সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেঁধে দেয়া লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে ১৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সব কটিই।
২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে চালু হওয়া কর্মসম্পাদন নীতিমালার আলোকে খেলাপি ঋণ আদায়ে বিভিন্ন সূচকের উন্নয়নে সরকারকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ সমস্যার গোড়ায় হাত দিতে না পারা।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুষ্ঠু নীতিমালা ও সরকারের শীর্ষমহলের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া খেলাপি ঋণ আদায় ও নতুন করে খেলাপি হওয়ার পথ বন্ধ করা, অর্থসংক্রান্ত রিট নিষ্পত্তি ও অর্থঋণ আদালতের মামলা নিষ্পত্তি দ্রুততর করা সম্ভব নয়।
বস্তুত, ঋণখেলাপি হওয়ার মূল কারণ সরকারের বিভিন্ন মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও রাজনৈতিক প্রভাব। এর বাইরে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে খেলাপি হওয়া এবং খেলাপি হয়েও পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এ কারণে খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকাটাই বেশি জরুরি। কিন্তু সেটি না করে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়ায় সেটি পূরণ না হওয়াই স্বাভাবিক। বাস্তবেও ঘটেছে তাই।
১৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্ধবার্ষিক কর্মসূচি মূল্যায়ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিদায়ী অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকায় নামানোর কথা ছিল, কিন্তু সেটি রয়ে গেছে ১৪ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকায়।
রূপালী ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৭০০ কোটি, কিন্তু সেটি থেকে যায় ৪ হাজার ২২৬ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ৬০০ কোটি, কিন্তু ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ থেকে যায় ৬ হাজার কোটি টাকায়। একই অবস্থা বিরাজ করছে বিডিবিএল ও সোনালী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও।
শুধু খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি তা নয়, একই সঙ্গে শ্রেণিকৃত ঋণ কমানো, অবলোপনকৃত ঋণ আদায় ও লোকসানি শাখা কমানোর ক্ষেত্রেও ব্যর্থতা রয়েছে সবার।
এ অবস্থায় খেলাপি ঋণ পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য কঠোর নীতিমালা, ভিন্ন কমিশন ও ট্রাইব্যুনাল গঠন, সর্বোপরি শীর্ষমহলের সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, ঋণখেলাপি, জালিয়াতি ও ব্যাংক লুটেরাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠিন কোনো চাপ প্রয়োগ করতে পারেনি সরকার। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকও বলার মতো কোনো উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত পরিচালনা পর্ষদ সদস্য ও শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও বলার মতো কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে খেলাপিরা নিজেদের ঋণ আদায়ে আন্তরিক ও ইতিবাচক কেন হতে যাবে, যেখানে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের সুযোগ তাদের রয়েছে।
আমরা মনে করি, খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়ার পাশাপাশি কঠোর আইন ও ঋণ পরিশোধ না করলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির তৈরি করা দরকার। অন্যথায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না।
সরকার অধীনস্থ সংস্থাগুলোর সঙ্গে কর্মসম্পাদন চুক্তির যে নিয়ম করেছে, সেটি ইতিবাচক। এখন কী কারণে চুক্তি মোতাবেক কাজ করা গেল না, সেটির জবাবদিহি করাতে হবে। তাহলে উঠে আসা সমস্যার সমাধান কোন পথে সম্ভব, তা পর্যালোচনা সাপেক্ষে পাওয়া যাবে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে খেলাপিদের ওপর চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি ঋণ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, আদায়ে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সমন্বিত, কঠোর ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপের মাধ্যমে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারলে সংকটের সমাধান সম্ভব হবে না।
নগরকন্ঠ.কম/এআর