শনিবার, ০৪ Jul ২০২৬, ০৩:৫২ পূর্বাহ্ন

গোয়েন্দা প্রতিবেদন: অস্থিরতার আশঙ্কা পোশাক খাতে

অর্থনীতি ডেস্ক, নগরকন্ঠ.কম : ক্ষুদ্র ও মাঝারি গার্মেন্ট কারখানার জন্য করোনাভাইরাসের ধকল কাটিয়ে টিকে থাকা কষ্টসাধ্য হবে। এ কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে বিপুল পরিমাণ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। যারা গার্মেন্ট খাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পোশাক খাত নিয়ে সম্প্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো দেয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআই’র সহসভাপতি ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘পরিস্থিতির ওপর সবকিছু নির্ভর করবে। মালিকরা শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে যতক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব কারখানা চালিয়ে যাবে। তবে সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গার্মেন্ট শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে সবাইকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। শ্রমিকদেরও পরিস্থিতি অনুধাবন করতে হবে। কারণ কোনো মালিকই চায় না তার কারখানা বন্ধ থাকুক।’

বিকেএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘সাধারণ শ্রমিকরা অতীতে কখনই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না বলে বিশ্বাস। কারণ কোনো সাধারণ শ্রমিক যে কারখানায় কাজ করে সে তার কারখানা কখনই ভাংচুর করতে পারে না। কারণ ওই কারখানা তার রুটি-রুজির সংস্থান করে। তথাকথিত কিছু শ্রমিক ইউনিয়ন আছে, যারা সংকটময় পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের উস্কানি দেয়। দেশের শিল্প ধ্বংস করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়। এরা মূলত বিদেশের এজেন্ট হয়ে কাজ করে। অতীতে একাধিকবার তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধরনের শ্রমিক সংগঠন নামধারীদের ব্যাপারে সরকার ও মালিকদের সতর্ক থাকতে হবে।’

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, পোশাক তৈরির অধিকাংশ কাঁচামাল আনা হয় চীন থেকে। চীনে করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের গার্মেন্ট কারখানাগুলোয় অচল অবস্থা তৈরিসহ ক্ষতির মুখে পড়বে। ইতোমধ্যে পোশাক কারখানাগুলোতে কাপড়ের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসে অনেক কারখানা রফতানিতে বড় ধাক্কা খাবে। আরও অর্ডার বাতিলের আশঙ্কা রয়েছে। অপরদিকে বিশ্ববাজারের পরিস্থিতিও ভালো নয়। পাকিস্তান, তুরস্ক ও প্রতিবেশী ভারত পোশাক পণ্যের দাম কমিয়ে দেয়ায় বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, যা পোশাক শিল্পের জন্য উদ্বেগজনক।

এতে আরও বলা হয়, ব্যাংক ঋণ ও আর্থিক সংকটের কারণে গত বছর প্রায় অর্ধশতাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষিতে অপেক্ষাকৃত বৃহৎ কারখানাগুলো টিকে থাকতে না পারায় অর্ডারের অভাবে একের পর এক ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় গার্মেন্ট শিল্পের যন্ত্রপাতি, ফ্যাব্রিক্স, সুতা, বোতাম, রং, কেমিক্যাল আমদানি বন্ধ থাকায় গার্মেন্ট শিল্প অচিরেই বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন বা বেকার হয়ে পড়বে। এসব বেকার শ্রমিক গার্মেন্ট খাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া তাদের নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

অপ্রীতিকর পরিস্থিতির আশঙ্কা করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে ব্যর্থ গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে ওইসব কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে কারখানা ভাংচুর, রাস্তা অবরোধ, অন্য কারখানায় হামলা চালিয়ে ক্ষতিসাধন ও উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টিসহ আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় ২টি সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। প্রথমত, শ্রমিক অসন্তোষ রোধে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। দ্বিতীয়ত, বৃহৎ কারখানাগুলোর সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি গার্মেন্ট কারখানাগুলো অর্ডার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দরকষাকষি করে যাতে টিকে থাকতে পারে সে ব্যাপারে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বাণিজ্য ও শ্রম মন্ত্রণালয় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে বিকেএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম যুগান্তরকে আরও বলেন, ‘করোনাভাইরাস শুধু পোশাক শিল্পের জন্য নয়, সবক্ষেত্রেই মহাদুর্যোগ। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া মালিকদের একার পক্ষে এ দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। শ্রমিকরাও দুর্যোগের বিষয়টি অনুধাবন করছে।’

ক্রয়াদেশ বাতিলের পরিমাণ বাড়ছেই : এদিকে করোনাভাইরাসের প্রভাবে প্রতিদিনই অর্ডার বাতিল করছে বিদেশি ক্রেতারা। মূলত গ্যাপ, নাইকি, প্রাইমার্ক, ইন্ডিটেক্সের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন দেশে তাদের বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ায় অর্ডার বাতিল করছে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো। বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত ৩৪৭টি কারখানায় ক্রেতারা ৯২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের অর্ডার বাতিল করেছে। গত শনিবার ২৬৪ কারখানা ৬০ কোটি ৭৮ লাখ টাকার অর্ডার হারায়।

গার্মেন্ট মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউরোপ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। ইউরোপে করোনাভাইরাস হানা দেয়ায় সেখানকার ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিচ্ছে না। এমনকি যেসব অর্ডার আগে দেয়া ছিল, সেগুলোও বাতিল অথবা কাঁটছাট করে কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। অর্ডার না থাকলে গার্মেন্টস খোলা রাখা অনেক মালিকের পক্ষ সম্ভব নয়। কারণ কাজ থাকুক আর নাই থাকুক, কারখানা খোলা রাখলে মালিকদের গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির বিল ও শ্রমিকদের মজুরি দিতে হবে। আর শ্রমিকদের বসিয়ে বেতন দেয়ার মতো সক্ষমতা অনেক মালিকের নেই। আবার একক সিদ্ধান্তে কোনো মালিক কারখানা বন্ধ করে দিলে শ্রমিকদের রাস্তায় নামার ভয় রয়েছে। সব মিলিয়ে মালিকরা উভয় সংকটের মধ্যে পড়েছে।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com