শুক্রবার, ০৩ Jul ২০২৬, ১০:১৫ অপরাহ্ন

তিস্তা চরে মরিচের বাম্পার ফলন

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তার চরাঞ্চলে এবারো মরিচের বাম্পার ফলন হয়েছে। মরিচের ব্যাংক বলে পরিচিত এই চরাঞ্চলের কৃষকরা আশায় বুক বেঁধেছিল আসন্ন রমজানের আগে ভালো দাম পাবেন।

কিন্তু সে আশায় গুঁড়েবালি। করোনাভাইরাস বিস্তারের কারণে পরিবহন ও ক্রেতা না থাকায় মরিচের দাম মিলছে না। ফলে ক্ষেতেই পচে নষ্ট হচ্ছে মরিচ। এতে দিন বদলের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হচ্ছে চরাঞ্চলের অভাবি পরিবারগুলোর।

চলতি মৌসুমে তিস্তায় জেগে ওঠা ৪২০ হেক্টর চরে (এক হাজার আট একর) মরিচের চাষ হয়েছে।

খোদ কৃষি বিভাগ জানায়, ১৭টি চরগ্রাম এখন মরিচের ব্যাংক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এসব চর হলো নাজিরদহ, কাউনিয়ার চর, প্রাণনাথ চর, আরাজি হরিশ্বর, চর গণাই, হরিশ্বর চর, পঞ্চরভাঙ্গা, ঢুষমারা চর, বিশ্বনাথ চর, হয়বত খাঁ চর, আযম খাঁ চর, পল্লীমারী, জিগাবাড়ি, চরচতুরা, গোপীডাঙ্গা, রাজিব ও গদাই। শীত মৌসুমে তিস্তার বুকে জেগে ওঠে চর। বছর ঘুরে এসব চরে তখন পা পড়ে মানুষের।

কিছুদিনের মধ্যে চরগুলো ছোট ছোট সবুজ গাছে ভরে যায়। থোকায় থোকায় মরিচ ধরে। প্রতিবছর এভাবে মরিচ চাষ হয় তিস্তার চরে। এখানকার কাঁচা মরিচ ঢাকা, যশোর, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।

সরেজমিনে চরগ্রামের পথে মরিচ ক্ষেতে সবুজের সমারোহ নজর কাড়ে। যেখানে চোখ যায় মনে হয় সবুজ গালিচা বিছানো হয়েছে তিস্তার বালুচরে। ছোট ছোট গাছে ঝুমঝুম করছে মরিচ। নারী-পুরুষ সবাই মিলে ক্ষেতের পরিচর্যাসহ মরিচ তুলতে ব্যস্ত থাকলেও করোনার কারণে মৌসুমের শুরুতে এবছর কাঙ্খিত দাম না পাওয়ায় তাদের হাসি যেন ম্লান হয়ে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেতে চাষিরা মরিচ না তোলায় তা ক্ষেতেই পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

ঢুষমারা চরের মরিচচাষি করিম মিয়া জানান, এ বছর ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এক বিঘা জমিতে ফরিদপুরী জাতের মরিচ চাষ করেন তিনি। ফলনও ভালো হয়েছে। প্রথমদিকে তিনি প্রতিমণ মরিচ এক হাজার ৮০০ টাকা (প্রতি কেজি ৪৫ টাকা) দরে বিক্রি করছেন। বর্তমানে মরিচের মণ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকায়। তাতে প্রতিকেজির দাম পড়ছে মাত্র ৫ টাকা।

একই ধরনের কথা জানালেন, নাজিরদহ চরের মরিচচাষি শাহজাহান ও গফুর মণ্ডল। ক্ষোভের সঙ্গে তাঁরা জানান, এ বছর তাঁদের সর্বনাশ হয়েছে। মরিচ তোলা শুরু হলেও করোনার কারণে লকডাউনসহ পরিবহন না থাকায় বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা আসতে পারছেন না। নিজেরাও পারছেন না বিভিন্ন এলাকায় মরিচ সরবরাহ করতে।

প্রাণনাথ চরের কোরবান আলী জানান, এখানকার উৎপাদিত মরিচ স্থানীয় হাটবাজারে চাহিদা মিটিয়ে জেলা শহর থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত রপ্তানি হতো। লাভবান হতেন চাষিরা। কিন্তু এবছর উৎপাদন খরচই উঠবে না।

স্থানীয় চাষিরা জানান, রংপুর অঞ্চলে মরিচ সংরক্ষণের জন্য সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রান্তিক চাষিদের বাধ্য হয়ে কমদামে মরিচ বিক্রি করতে হচ্ছে। ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে রংপুর অঞ্চলে মরিচসহ সবজি সংরক্ষণে হিমাগার স্থাপনের দাবি জানান তাঁরা।

মরিচ চাষকে ঘিরে কাউনিয়া উপজেলার তপিকলহাটে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বাজার। সপ্তাহে তিন দিন শনি, সোম ও বৃহস্পতিবার এই হাট বসে। ভায়ার হাট, টেপামধুপুর হাট, খানসামা হাট এবং মীরবাগ হাটেও পাইকারি মরিচ বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকাররা এসব বাজার থেকে মরিচ কিনে ট্রাকযোগে নিয়ে যান। কিন্তু করোনার কারণে লকডাউন থাকায় এসব হাটবাজার বর্তমানে অনেকটাই ফাঁকা। স্থানীয় পাইকাররা কিছু কিছু মরিচ কিনলেও তাঁরা দাম দিচ্ছেন পানির দামে।

তপিকলহাটে মরিচ বিক্রি করতে আসা বিশ্বনাথ চরের জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘৪৫ টাকা কেজি মরিচের দাম এ্যালা ৫ টাকা কয়। না ব্যাচে কি করমো বাহে, ক্ষেতোত যে মরিচ পচি যাওচে।’

চাষিরা জানান, কয়েকদিন ধরে এই অঞ্চলে রোদ না থাকায় পাকা মরিচ শুকানোও যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তারা কম দামেই বিক্রি করছেন। ওই হাটের মরিচ ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, এখানকার মরিচ ক্ষেত থেকে ফড়িয়া এবং আড়তদারের হাত বদল হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। কিন্তু বর্তমানে করোনার কারণে প্রশাসনের নির্দেশনায় মোকামে কম সময় দোকানে বেচাকেনা ও পরিবহন সংকটে মরিচের চাহিদা কমে যাওয়ায় দামও কমে গেছে।

কাউনিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তিস্তার পলিমাটিতে চলতি মৌসুমে মরিচের বাম্পার ফলন হয়েছে। আশ্বিন মাস থেকে শুরু করে কার্তিকের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মরিচের গাছ রোপণ করে ১২০ থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে মরিচের ফলন পাওয়া যায়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল আলম বলেন, প্রথমদিকে হেক্টরপ্রতি মরিচের উৎপাদন হচ্ছে এক দশমিক আট মেট্রিকটন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর তিস্তার চরে বেশি মরিচ চাষ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এলাকার সবাই এখন মরিচ চাষ করছেন। মরিচ চাষ করে কয়েক বছরে অভাবী এই চরাঞ্চলের অনেকেরই দিন বদলে গেছে। কিন্তু এ বছর করোনায় পরিবহন সংকটে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মরিচ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com