বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:০৪ অপরাহ্ন

ব্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বেশি মুনাফা দেখানোর প্রবণতায়

কভিড-১৯-এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরকার নীতিসহায়তা দিলেও মালিকদের বেশি লাভ দেখানো ব্যাংকারদের প্রবণতায় ব্যাংকিংয়ের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলেন, এতে সরকারের দেওয়া প্রণোদনা সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। ফলে প্রকৃত সেবা থেকে উভয় পক্ষ বঞ্চিত হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে শেরাটন হোটেলে ‘মহামারিকালীন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সিএমএসএমই খাতে দ্রুততার সঙ্গে প্রণোদনা প্যাকেজের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি; এসএমই খাতে মেয়াদি ঋণের সময় বাড়ানো প্রয়োজন’ শীর্ষক মতবিনিময়সভায় এসব কথা বলেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) এই সভার আয়োজন করে।

আলোচনাসভায় ব্যাংকাররা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক যে প্রবৃদ্ধি এসেছে তা প্রায় ব্যাংকনির্ভর। ফলে ব্যাংকের প্রতি প্রত্যাশাও বেড়েছে। তাই ব্যাংকের প্রতি নির্ভরতা কাটিয়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে একটা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক এবং ভোক্তার নিজস্ব শক্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে এফবিসিসিআই পরিচালক ও ম্যাক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘ব্যাংক দুর্বল ভোক্তাদের সুবিধা দিলে ওই ব্যাংকই শক্তিশালী হয়। শুধু মালিকদের লাভ দেখানো ব্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য হলে উভয় পক্ষই প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।’

বিশ্বের বড় খ্যাতিমান ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘লাভ নয়, করোনায় টিকে থাকাই হলো শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় সবাইকে একসঙ্গে টিকে থাকতে হবে। দুই-চার বছর আগে ব্যাংকের যে লাভ হয়েছে তা নিয়ে আপতত সন্তুষ্ট থাকা গেলে ভোক্তা এবং ব্যাংক উভয়ে বেঁচে যাবে। এ ছাড়া ব্যাংকের পরিচালনা ব্যয় কমিয়ে আনলে সবাই উপকৃত হবে।’ কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ বলেন, ‘কৃষকদের কৃষিঋণ দিতে সরকার চলতি অর্থবছরে ২৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত কৃষক ওই ঋণ পায় না। এ ছাড়া ৮ শতাংশ হারে সুদ নির্ধারিত হলেও বিভিন্ন মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছাতে ওই ঋণের সুদের হার গিয়ে দাঁড়ায় ২৪ শতাংশ।’

কৃষকদের জন্য সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘এর মধ্যে ৭৩ শতাংশ ঋণ বিতরণ হয়েছে। এখানেও প্রকৃত কৃষকরা এই ঋণ পায়নি।’ কনট্রাক্ট ফার্মিংয়ের নামে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ নিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

কভিডে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি খাত বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে উল্লেখ করে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা নীতিসহায়তা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো অনেক কাজ করছে। তবে এর পরিধি বাড়াতে হবে।’ এ জন্য মাইক্রো ক্রেডিট একটি কর্তৃপক্ষ করা যেতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘মহামারিকালীন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সিএমএসএমই খাতে দ্রুততার সঙ্গে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন জরুরি।’ এ ছাড়া এসএমই খাতে মেয়াদি ঋণের সময় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘রপ্তানি ও বৃহৎ খাতে প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়ন সন্তোষজনক হলেও সিএমএসএমই খাতে বাস্তবায়ন হার মাত্র ৭৭ শতাংশ।’ এমন অবস্থায় কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তিনি প্রণোদনা ঋণ দ্রুত ছাড় দেওয়ার আহবান জানিয়েছেন ব্যাংকারদের। এ সময় তিনি অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন।

মতবিনিময়সভায় অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান আলী রেজা ইফতেখার জানান, প্রণোদনা ঋণের ৮০ শতাংশ ছাড় হয়েছে। এই হার আরো বাড়লে ভালো হতো। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। এ জন্য দেশে বন্ড মার্কেট সংস্কৃতি গড়ে তোলা উচিত।’ এ ছাড়া সিএমএসএমই খাতে প্রণোদনা ঋণ বিতরণে এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে একযোগে কাজ করার আশ্বাস দেন তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com