বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:৫৯ অপরাহ্ন

স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে কভিড হাসপাতাল

দেশে করোনা সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে। শেষ এক সপ্তাহে (৬-১২ সেপ্টেম্বর) তার আগের সপ্তাহের (৩০ আগস্ট-৫ সেপ্টেম্বর) তুলনায় ২৪ শতাংশ রোগী কমেছে। মৃত্যু কমেছে ৩৩ শতাংশ। এ সময় সুস্থ হয়ে রোগীদের হাসপাতাল ছাড়ার সংখ্যাও বেড়েছে ২২ শতাংশ। এমনকি শনাক্ত হার কমতে কমতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৬ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। ছয় মাসের মধ্যেই এটিই সর্বনিম্ন শনাক্ত হার। আর তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ৩৫ জনে নেমে এসেছে মৃত্যু।

সংক্রমণ কমে আসায় দেশের কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল এবং বিভিন্ন হাসপাতালের কভিড ইউনিটে রোগী ভর্তির সংখ্যাও কমেছে। রাজধানীসহ সারা দেশের কভিড শয্যা, আইসিইউ ও এইচডিইউ বেড ফাঁকা হতে শুরু করেছে। হাসপাতালে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে সাধারণ রোগীদের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার দেশের ১৩৬টি সরকারি ও বেসরকারি কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের ৮১ শতাংশ সাধারণ বেডেই কোনো রোগী ছিল না। এসব হাসপাতালের ৬২ শতাংশ আইসিইউ ও ৬৯ শতাংশ এইচডিইউ বেড খালি ছিল। অর্থাৎ ১৫ হাজার ৬৬৮ বেডের মধ্যে খালি ছিল ১২ হাজার ৭১৮ বেড। ১ হাজার ৩০৪টি আইসিইউ ও ৮৩৯টি এইচডিইউ বেডের মধ্যে আইসিইউ খালি ছিল ৮০৯টি ও এইচডিইউ খালি ছিল ৫৮৩টি। একইভাবে রাজধানীর ১৭টি সরকারি কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের ৭১ শতাংশ সাধারণ বেড, ৫২ শতাংশ আইসিইউ বেড ও ৬১ শতাংশ এইচডিইউ বেড খালি ছিল।

এমন অবস্থায় দেশের কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল ও অন্যান্য হাসপাতালের কভিড ইউনিটে কভিড রোগীদের পাশাপাশি নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা দিতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত সপ্তাহে এ ব্যাপারে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে। এর আগের সপ্তাহে এ ব্যাপারে মৌখিক নির্দেশ দেয় অধিদপ্তর।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল-ক্লিনিক) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু এখন করোনা সংক্রমণ কমে এসেছে, তাই কভিড হাসপাতালগুলোকে কভিডের পাশাপাশি নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা চালু করার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কভিড হাসপাতাল বা কভিড ইউনিট এখনই একেবারে তুলে দিচ্ছি না।’

এ কর্মকর্তা বলেন, ‘এ ব্যাপারে আগেই বিভিন্ন সরকারি সাধারণ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোকে মৌখিকভাবে নির্দেশ দেওয়া ছিল। গত সপ্তাহে চিঠি দিয়েছি। নির্দেশনা অনুযায়ী, অনেক হাসপাতালে কভিডের পাশাপাশি নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল ও হাসপাতালের কভিড ইউনিটে ইতিমধ্যেই সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেছে কিছু হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে সাধারণ রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। কিছু হাসপাতাল আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এতদিন বন্ধ থাকা বিভিন্ন বিভাগের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু করবে।

এ ব্যাপারে ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া বলেন, ‘রাজধানীর মহাখালীতে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতাল সবচেয়ে বড়। তারা নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা দেবে। ফ্লোর ও ব্লক অনুযায়ী চিকিৎসাব্যবস্থা করবে। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কভিড ফিল্ড হাসপাতাল আপাতত কভিড রোগীদের জন্যই থাকবে। তারা মূল হাসপাতালের কভিড রোগীদের ফিল্ড হাসপাতালে এনে ওই হাসপাতালকে কভিডমুক্ত করবে। সেখানে নন-কভিড রোগীরা চিকিৎসা নেবে। ঢাকার বাইরেও একই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলো কভিডের পাশাপাশি নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেছে।’

খুলছে ঢাকা মেডিকেলের বন্ধ থাকা বিভাগ : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কভিড রোগীদের চাপ কমেছে। এখানে সাড়ে আটশোর মতো কভিড রোগী ছিল। সেখানে এখন ভর্তি আছে সাড়ে চারশোর মতো। অর্থাৎ অর্ধেক রোগী কমে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, আমরা সীমিত আকারে নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছি। খুব দ্রুত আমরা নন-কভিড সেবা চালু করব। কভিডের চিকিৎসা অক্ষুণœ রেখে, তাদের যেন কোনো অসুবিধা না হয়, সেটা সামনে রেখে নন-কভিড রোগীরা যেন আরও বেশি চিকিৎসা পায়, সে উদ্যোগ নিচ্ছি। এখানে নন-কভিড চিকিৎসা চালু ছিল ও আছে। যেসব বিভাগ বা ব্যবস্থা তুলে দিলে কভিড রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হবে না, সেগুলো আগে তুলে দিচ্ছি। তারপর আমরা দেখব কভিড কী পর্যায়ে যায়। যদি দেখি কভিড আরও কমে যাচ্ছে, তাহলে ধীরে ধীরে কভিডের জায়গাগুলোতে পুরোদমে নন-কভিড চিকিৎসা চালু করব।’

এই পরিচালক বলেন, ‘এতদিন কভিডের কারণে যে চিকিৎসাগুলো বন্ধ ছিল, সেগুলো খুলে দেব। কভিড বিল্ডিংয়ের ভেতরে হওয়ায় এতদিন অনেক ধরনের চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়নি। যেমন ইন্টারনাল মেডিসিন, কার্ডিয়াক ক্যাথ ল্যাব, স্টেন্টিং, রিং পরানো এগুলো এখন বন্ধ। এসব বিভাগে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অলস পড়ে আছে। ব্যাপক কভিডের কারণে এতদিন ওই কাজগুলো করতে পারিনি। এখন আমরা সেগুলো চালু করছি।’

আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যেই এতদিন বন্ধ থাকা চিকিৎসাসেবা পুনরায় চালু হবে বলে জানিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নাজমুল হক বলেন, ‘এখন এক সপ্তাহের মধ্যেই শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট চালু করব। সেখানে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। সেটার বহির্বিভাগ ইতিমধ্যেই চালু করেছি। একটা ফ্লোরে বার্ন রোগী ভর্তি ও তাদের অস্ত্রোপচার শুরু করব। একইভাবে আমাদের কার্ডিয়াক ইউনিট, কার্ডিয়াক সার্জারি ইউনিট চালু করব। মেডিসিনের যেসব বিভাগ আছে, সেগুলোর বহির্বিভাগ চালু করব। সেখানে ইনডোরে রোগী ভর্তিও শুরু করব।’

বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের ফিল্ড হাসপাতাল থাকছে : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কভিড ফিল্ড হাসপাতালে কভিড রোগীরাই চিকিৎসা পাবে। তবে মূল হাসপাতালের কভিড রোগীদের ধীরে ধীরে ফিল্ড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে এবং মূল হাসপাতালের কভিড ইউনিটে নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কভিড রোগীদের চাপ ৫০ শতাংশের মতো কমেছে। এ হাসপাতালে কভিডের শুরু থেকেই কভিড ও নন-কভিড রোগীদের সমানভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এ হাসপাতালে করোনা রোগীর জন্য বেড ৩০০। বর্তমানে করোনা রোগী দেড়শর ওপরে আছে। এর মধ্যে এখানকার ফিল্ড হাসপাতালে আছে ৫০-এর ওপরে। এখন কভিড বেড ফাঁকা হচ্ছে। আমরা পরিকল্পনা করেছি, ফিল্ড হাসপাতালে আরও কিছুদিন কভিড রোগীদের চিকিৎসা করব। আর মূল হাসপাতালে যেসব কভিড রোগী আছে, তাদের ফিল্ড হাসপাতালে নিয়ে আসব। ওই ফাঁকা বেডে নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা বাড়িয়ে দেব।’

নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা শুরু সোহরাওয়ার্দীতে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকেই কভিড রোগীদের পাশাপাশি নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা পুরোদমে শুরু করেছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

এই হাসপাতালের পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতালে কভিড রোগীদের চাপ অনেক কমে গেছে। কভিড রোগীদের জন্য বেড ছিল ৫০০। এখন সেখানে রোগী আছে মাত্র ১২৫ জন। অথচ রোগী ৪০০ পার হয়ে গিয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যেই আমাদের নির্দেশ দিয়েছে কভিড রোগীদের পাশাপাশি সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা বাড়াতে। আমরা ১১ সেপ্টেম্বর থেকে নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা শুরুও করেছি। রোগীরাও আসছে। গত দুদিনে পাঁচশোর বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। আমরা এখন কভিড বেড কমিয়ে দুইশোতে নিয়ে এসেছি। বাকি বেডগুলো নন-কভিড রোগীদের ভর্তি করছি।’

তিনি বলেন, ‘জুলাই-আগস্টে, এক মাসের মতো এই হাসপাতাল পুরোটা কভিড ডেডিকেটেড ছিল। যখন করোনা রোগী খুব বেড়ে গেল, তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নির্দেশ দিল পুরোটা কভিড হাসপাতাল করতে। তখন অন্য কোনো রোগী ভর্তি করা হতো না। আবার আগের মতো চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সব ধরনের সেবা পাচ্ছে রোগীরা।’

কভিড ও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে চায় ডিএনসিসি হাসপাতাল : দেশের সবচেয়ে বড় ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতাল কভিড রোগীদের পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে চায়। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ চাইছে, এটা কভিড হাসপাতাল হিসেবেই থাক। অন্য হাসপাতালগুলোতে কভিড বেড তুলে দিয়ে সেখানে পুরোদমে নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা শুরু হোক। পরে কভিড শেষ হলে এ হাসপাতালকে জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে রাখতে চায় তারা। এসব ব্যাপারে একটি প্রস্তাবনাও ঠিক করেছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কভিড হাসপাতাল ডিএনসিসিতে প্রায় ৬০ শতাংশের মতো কভিড রোগী কমেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব সরকারি ও বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে যাদের রোগী কমে গেছে, তাদের নন-কভিড বেড চালু করার জন্য একটা নির্দেশনা দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে আমরাও একটা পরিকল্পনা করছি।’

তিনি বলেন, ‘শুধু কভিড রোগীর চিকিৎসার জন্যই এ হাসপাতাল করা হয়েছে। কিন্তু এখন যেহেতু কভিড রোগী কমে যাচ্ছে, সেজন্য সাধারণ রোগীদের কীভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে আমরা কিছুদিন আগে একটা প্রস্তাবনা দিয়েছি। সেখানে বলা হয়েছে, অনুমতি পেলে এখানে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করব।’

এ কর্মকর্তা বলেন, ‘যতদিন কভিড না যাচ্ছে, ততদিন এ হাসপাতাল কভিড রোগীদের জন্য এক্সক্লুসিভ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। মানুষ কভিডের জন্য অন্য কোনো হাসপাতালে ছোটাছুটি না করে এখানেই আসবে। ওদিকে যেসব হাসপাতালে অনেক বিভাগের সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে না, সেখানে যেন চিকিৎসা পায়, সেজন্য ওইসব হাসপাতালকে পুরো কভিডমুক্ত করে অন্য রোগের চিকিৎসা চালু করা যেতে পারে।’

টিবি হাসপাতালে কভিড বেড থাকছে : ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে যেমন ৭০-৮০ জন কভিড রোগী ভর্তি থাকত, এখন থাকে ২০ জন রোগী। অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ বেড ফাঁকা হয়েছে। এটি একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। এখানে আগে থেকেই কভিডের পাশাপাশি নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এখন করোনা সংক্রমণ কমছে। আবার বাড়তেও পারে। সে কারণে কভিডের জন্য যে আলাদা চারটি আইসিইউ, আলাদা বেড, সেগুলো কভিডের জন্যই রাখা হবে। আর নন-কভিডের জন্য যে বেড আছে, সেগুলোও ফাঁকা থাকে। সুতরাং এই মুহূর্তে কভিড বেড নন-কভিড করার দরকার নেই। অন্যান্য হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের যে চাপ, এখানে সেরকম নেই। এখানে যে বেড, তাতে দুই ধরনের রোগীই রাখা যায়।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com