বুধবার, ২৪ Jun ২০২৬, ০৮:০৮ পূর্বাহ্ন
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (সাফটা) আওতায় চলতি বছরের ১২ মে বাংলাদেশে মুক্তি পায় শাহরুখ খান ও দীপিকা পাড়ুকোন অভিনীত বহুল আলোচিত সিনেমা ‘পাঠান’।
অ্যাকশন কাট এন্টারটেইনমেন্টের আয়োজনে ৪১টি প্রেক্ষাগৃহে একযোগে মুক্তি পায় স্পাই থ্রিলার ঘরানার এই সিনেমাটি। এর আগে ২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি ঢাকার সিনেমা হলে সালমান খানের সিনেমা ‘ওয়ান্টেড’ মুক্তির পর হিন্দি সিনেমার প্রদর্শন বন্ধে কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে রাজপথে নেমেছিলেন শিল্পী ও নির্মাতারা। সেই আন্দোলনের পর দেশের সিনেমা হলে আর কোনো হিন্দি ছবি মুক্তি পায়নি। তবে পাঠান সিনেমার মুক্তিকে কেন্দ্র করে শিল্পী ও নির্মাতারা তাদের সেই ইস্পাত-কঠিন ঐক্য আর ধরে রাখতে পারেননি। দেশের সিনেমা তীব্রভাবে দর্শকখরায় ভুগতে থাকলে তারাও ভারতীয় সিনেমা মুক্তির বিষয়ে দোদুল্যমান হয়ে পড়েন। এভাবে চলতে থাকলে প্রেক্ষাগৃহের মালিকরা বাঁচবে কীভাবে এমন প্রশ্নে পরে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন শিল্পী সমাজও।
তবে শিল্পীরাসহ নির্মাতাদের অনেকেই এটা ভালো চোখে দেখেননি। এখনও ভালো চোখে দেখছেন না।
অতি উৎসাহের বশে ‘পাঠান’ সিনেমাটিকে ঘিরে বাংলাদেশে প্রথম বারের মতো বেশকিছু বক্স অফিসও খোলা হয়েছিল। মুক্তির বাংলাদেশে এই বলিউড সিনেমার মুক্তি নিয়েও কম প্যারায় ভুগতে হয়নি। বারবার মুক্তির তারিখ পেছানোসহ অনেক ঘাটের জল ঘোলা করা হয়েছিল এ নিয়ে। অবশেষে সিনেমাটি মুক্তি দিয়ে ভারতীয় সিনেমা বাংলাদেশে প্রদর্শনীর পক্ষের মানুষ যেন বিজয়ের হাসি হাসলেন।
কিন্তু কথায় বলে ‘যত গর্জে ততো বর্ষে না’। কথা ছিল, সাপটা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে বছরে ৬টি সার্কভুক্ত দেশের সিনেমার প্রদর্শনী চলবে। সেই হিসেবে প্রতি দুই মাস অন্তর একটি সিনেমা মুক্তি পাওয়ার কথা। এদিকে চার মাস পেরিয়ে গেছে দ্বিতীয় সিনেমার প্রদর্শনীর ব্যাপারে কোনো হদিস নেই। তবে কি প্রেক্ষাগৃহের মালিকরা এক ‘পাঠান’ সিনেমার প্রদর্শনীতেই কাবু হয়ে পড়েছেন?
অনেক শোরগোল করে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল পাঠান সিনেমা। প্রদর্শকরা ভেবেছিলেন এক রেকর্ডগড়া ব্যবসা করবেন। ইতিহাস সৃষ্টি করবেন বাংলাদেশেও ‘পাঠান’ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। অবশেষে সেই আশায় যেন গুড়ে বালি! নয়তো যেখানে প্রতি দু’মাস অন্তর একটি দক্ষিণ এশীয় সিনেমা মুক্তি দেওয়ার কথা সেখানে চার মাস পেরিয়ে গেল এখনও কেন তাদের দ্বিতীয় সিনেমাটির দেখা নেই? তাহলে বছরে ৬ সিনেমা মুক্তি দেওয়ার কোটা পূরণ হবে কী করে? এখন তো দেখা যাচ্ছে তারা বছরে ৬টি তো দূরের কথা দুটি সিনেমাও মুক্তি দিতে পারবেন কিনা এ নিয়েও ঘোরতর সংশয় জেগে উঠেছে!
এদিকে ‘পাঠান’ সিনেমার পর দ্বিতীয় সিনেমার মুক্তির তালিকায় অনেকদিন ধরেই বলিউডের আরেক তারকা সালমান খানের ‘কিসি কা ভাই কিসি কি জান’ সিনেমাটি। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সেন্সরের ছাড়পত্রও পেয়েছে সিনেমাটি। এবার এটা আগামী শুক্রবার ২৫ আগস্ট মুক্তির তারিখ ঘোষণায় এসেছে। বাংলাদেশে ছবিটি আমদানি করছে এনইউ আহম্মদ ট্রেডার্স। তবে এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি এই সিনেমাটি প্রদর্শনে কতটি প্রেক্ষাগৃহে বুকিং পাচ্ছে। এখনও জানা যায়নি হিন্দি সিনেমা মুক্তি দেওয়া নিয়ে আদাজল খেয়ে নামা প্রেক্ষাগৃহের সেই মালিকরাও বা কতটা আগ্রহী এই সিনেমা নিয়ে।
তবে হল ‘বুকিং যেমন’ই পাক, যেখানে বলিউডে ইতিহাস সৃষ্টি করা ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়া ‘পাঠান’ দেখার জন্য বাংলাদেশের দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়েনি সেখানে ‘কিসি কা ভাই কিসি কি জান’ কেমন করে সেটাই এখন দেখার বিষয়। এর মধ্য দিয়েই বোঝা যাবে বাংলাদেশের মূল ধারার মানুষ আসলে কোন ধরনের সিনেমার দর্শক।
তবে এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ঢাকাই সিনেমার পরিচালক এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাবেক সভাপতি বলেন, ‘ভারত থেকে যেসব সিনেমা আনা হচ্ছে সেগুলো কি বাংলা ছবি? হিন্দি ছবি বাংলাদেশের দর্শক দেখবে কেন? এর আগেও এ দেশে অনেক ভালো ভালো হিন্দি সিনেমা চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু এ দেশের দর্শক সেসব হিন্দি সিনেমা দেখেনি।’
অন্যদিকে ঢাকাই সিনেমার অভিনেতা বাপ্পী চৌধুরী বলেন, ‘বাঙালিরা বাংলা সিনেমাই পছন্দ করে। হিন্দি সিনেমা নয়।’
শিল্পী ও নির্মাতারা তাদের অস্তিত্বের কারণেই হিন্দি সিনেমার শুভ কামনা করবেন না- সেটাই স্বাভাবিক। আর এ কারণে ঢাকাই সিনেমার নির্মাতা ও শিল্পীরা এক সময় হিন্দি সিনেমার প্রতিরোধে কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে রাস্তায় নেমেছিলেন মূলত তাদের নিজেদের পেটে লাথি পড়ার আশঙ্কা থেকেই। তেমন আশঙ্কা দেখা দিলে যে কোনো সংশ্লিষ্টরা করবেনই। তবে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে দেশপ্রেমটা প্রবল সেটা বোঝা গেছে এ দেশে যখনই হিন্দি সিনেমা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে দর্শক তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু শহুরে দর্শকই এই সিনেমাগুলো দেখছে। ‘পাঠান’ সিনেমাতেও তা-ই দেখা গেছে।
ঢাকার সিনেপ্লেক্স বা প্রেক্ষাগৃহগুলোতে অগ্রিম টিকিট বিক্রি হলেও ঢাকার বাইরে তেমন একটা অগ্রিম টিকিট বিক্রি হতে দেখা যায়নি। এমনকি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রেক্ষাগৃহ যশোরের মণিহার সিনেমা হলেও শুরুর দু’একদিনের জন্য অল্প কিছু ছাড়া অগ্রিম টিকিট বিক্রি হতে দেখা যায়নি। তাতেই বোঝা গেছে দেশের বৃহত্তর মানুষের কাছে হিন্দি সিনেমার প্রতি আগ্রহ কম।
তবে প্রেক্ষাগৃহের মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সিনেমাগুলো তাদের দেশে যখন মুক্তি পায় তখনই যদি একযোগে বাংলাদেশে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় তাহলে এ দেশের সেসব সিনেমার দর্শক প্রচুর হবে।