মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ০৮:২২ অপরাহ্ন
রূপগঞ্জ প্রতিনিধি : ঈদের আনন্দ, হিন্দুদের পূজা পার্বন আর বিভিন্ন মেলায় দেখা যেত বায়োস্কপ। এগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। ছোট্ট শিশু থেকে আরম্ভ করে বুড়োরাও দেখতো একটা বক্সের মধ্যে সুন্দর করে পোস্টার সাজানো বায়োস্কপ’। এ কথা বলছিলেন উপজেলার খামারপাড়া এলাকার বৃদ্ধজন আউয়াল আলী। গ্রামাঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ সিনেমা হলের ছবি নামে পরিচিত। গাঁয়ের ছেলে-বুড়োরা ছুটত তার পেছন পেছন। আবার কেউ কেউ তাকে ছবিওয়ালাও বলত। হাতে থাকতো তার একটা ডুগডুগি। বাজাতে বাজাতে গ্রাম্য মেঠো পথ ধরে হাঁটতো। দল বেঁধে সবাই একখানে জড়ো হতো গাঁয়ের শিশু-কিশোর ও কুলবধূরা। তারপর শুরু হতো সিনেমা। তার আগে অবশ্যই টিকিট কিনে নিতে হতো। বক্সের চারখানা ফুটোয় আট জোড়া চোখ লাগিয়ে সেই স্বপ্নের সিনেমা দেখতো গাঁও-গেরামের মানুষ।
সে সবই এখন সুুদূর অতীত। কারো মনে পড়ে, কারো পড়ে না। এখন আর দেখা যায় না সেই ছবিওয়ালাকে। কালেরগর্ভে কোথায় যে হারিয়ে গেল তারা, তা বর্তমান প্রজন্মের কেউ জানে না। চাকরিজীবী আলিমুল্লা মিয়া বলেন, আমি নিজে দেখেছি ওই বাইস্কোপ। দুপুরে বাড়ির উঠানে বক্সটা নিয়ে বসত। বাড়ির সবাই পর্যায়ক্রমে দেখতাম। মজাই লাগতো। সেই ছবিওয়ালা আজ আর নেই। আস্তে আস্তে সব বিলীন হয়ে যাবে আমাদের অতীতের সব ঐতিহ্য। আমরা এখন আকাশ সংস্কৃতির ঘেরাটোপে বন্দি। ওই দেখা যায়, কেমন মজা/তাকদি না দিন জাবেদের ঘোড়া চইল্যা গেল/ইলিয়াছ কাঞ্চন আইস্যা গেল/ চম্পাকে নিয়ে চইল্যা গেল। আরে আরে কেমন মজা/ দেখেন তবে তক্কা মদিনা/তার পরেতে মধুবালা/এক্কাগাড়িতে উত্তম কুমার আর সুচিত্রা সেন। এরকম সুরের ধারা বর্ণনা দিয়ে গ্রাম্য জনপদে বাইস্কোপ দেখাতেন বায়োস্কপওয়ালারা।
রূপগঞ্জে এখন আর এমন মজার বাইস্কোপ দেখা যায় না। ছোট্টবেলায় হাট-বাজারে, মেলায় দেখা যেতো বাইস্কোপ। আধুনিক বিজ্ঞানের মডার্ণ সময়ে সেলুলয়েডের রঙিন যুগে এখন আর চোখেই পড়ে না এ মজার বায়োস্কপ। এখন শুধুই স্মৃতি। হাটবাজার মেলা ছাড়াও বায়োস্কপওয়ালারা মাথায় করে গ্রামে গ্রামে, বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বাইস্কোপের বাক্সটা নিয়ে মানুষকে ছবি দেখাত। তার হাতে থাকতো বাজনা বাজানোর জন্যে একটা বিশেষ ধরনের বাদ্যযন্ত্র। যে কারো বাড়িতে পৌঁছেই সেই বাজনা বাজিয়ে আওয়াজ দিত। বলতে শোনা যেত বাইস্কোপ দেখবেন গো বাইস্কোপ। তখন আশপাশের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা মা-দের কাছে কাকুতি মিনতি করতো ওই বাইস্কোপ দেখার জন্যে। মায়েরা তখন বিরক্ত হয়ে ধানের গোলা থেকে বা চালের মটকা থেকে এক সের ধান বা চাল দিতেন।
আর পাবি না কিন্তু এও বলে দিত। ছেলে মেয়েরাও রাজি হয়ে বলতো হ মা আর নিমু না, আর দেখুম না। এই বলেই ধান নিয়ে ছুটে যেতো বায়োস্কপওয়ালার কাছে। বায়োস্কপওয়ালা তার ব্যাগের মতো থলেতে ধান ঢেলে রেখে দিত। ধান নিতে দেরি, আর বায়োস্কপের কাছে হাঁটু গেড়ে বসতে দেরি হতো না। পর্দা ওঠলো বাইস্কোপের, মুখের মাঝে দুই হাত দিয়ে চুপি দিয়ে দেখতে থাকতো বাইস্কোপ। বায়োস্কপওয়ালা এক হাতে বায়োস্কপের রিল ঘুরাতে থাকতো আর বলতে থাকতো কি যাচ্ছে আর সামনে কি আসছে। বলতে শোনা যেতো কি সুন্দর দেখা গেল আলোমতি আইস্যা গেল, কি সুন্দর দেখা গেল প্রেমকুমার আইস্যা গেল ইত্যাদি। বর্তমান সেলুলয়েডের রঙিন ফিতা, অনলাইন আর ইন্টানেটের যুগে এখন আর সেই মনোরম বাইস্কোপ দেখাই যায় না। ছোট্টবেলার সেই বায়োস্কপ এখন শুধুই স্মৃতি। মাত্র দশ পয়সা দিয়ে অথবা এক হেড় বা এক পট ধান বা চাল দিয়ে দেখা যেতো এই বায়োস্কপ।